রাজস্ব আহরণ খাতের সংস্কার

আগামী অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা চলতিবারের চেয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কী কৌশল নিতে যাচ্ছে তা নিয়েই মূলত এনবিআর প্রধান কার্যালয়ে সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও হয়। সংগত কারণে আইএমএফের দেওয়া রাজস্ব সংস্কারের কতটা আগামী অর্থবছরের রাজস্ব বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে সে প্রসঙ্গটি উঠে আসে আলোচনায়। 

সংস্কারের অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব বাজেট প্রস্তাবে বেশ কিছু খাত বা পণ্য থেকে ভ্যাট অব্যাহতি তুল নেওয়া হবে, বিদ্যমান কর অবকাশ সুবিধার আওতা কমানো হবে। এ ছাড়া সঠিক হিসেবে রাজস্ব আদায় করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, নতুন আয়কর আইনের প্রয়োগ, অর্থ পাচার রোধে করণীয় নির্ধারণ, মিথ্যা ঘোষণা বন্ধে বন্দরে স্ক্যানার ব্যবহার নিশ্চিত করা, এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। বৈঠকে স্বচ্ছতার সঙ্গে ভ্যাট আদায়ে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) সরবরাহের অগ্রগতি, রাজস্ব জালের বিস্তার এবং নতুন ২০ লাখ করদাতা সংগ্রহ করার বিষয়েও কথা হয়। ঋণ অনুমোদনের আগেই সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, শর্ত মানা না হলে ঋণের কিস্তি ছাড় স্থগিত করা হবে। ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের আগেই আইএমএফ দেখতে চায় তাদের দেওয়া সংস্কারের কতটা পূরণ করেছে এবং বাকিটা পূরণে পরিকল্পনা কী। শর্ত বাস্তবায়নের হালনাগাদ পরিস্থিতি জানার তাগিদ এবার একটু বেশি করে দিচ্ছে আইএমএফ। ১৯৭২ সালে আইএমএফের সদস্য হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ এ যাবত বারোবার সংস্থাটির বিশেষ ঋণ (সংস্কার কর্মসূচি মূলক) গ্রহণ করেছে। নিকট অতীতে ২০১০ সালে ইসিএফ লোন গ্রহণ ও শর্ত পরিপালনে বাংলাদেশের প্রয়াস ও আন্তরিকতা থাকলেও কার্যকর ফলাফল তেমন দৃশ্যগোচর হয়নি বলে আইএমএফ এবার বেশ সতর্কতার সঙ্গে অগ্রগতি পর্যালোচনার ওপর জোর দেবে বা দিচ্ছে। মনে পড়ে ১৯৯০ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ের কথা। বাংলাদেশের রিজার্ভ তখন ৯৯০ মিলিয়ন ডলার, সে সময় মাসিক আমদানির পরিমাণ ৪ মিলিয়নের একটু ওপরে, সে হিসাবে তিন মাসের আমদানি বিল দাঁড়ায় ১৩ মিলিয়নের মতো। ৯৯০ মিলিয়ন ডলার রিজার্ভ অপর্যাপ্ত বিধায় বেশ কিছুদিন ধরে বহির্বাণিজ্যে ক্রেডিট ওর্দিনেস বেশ কমে যায়, এলসি খোলা যাচ্ছিল না। তদানীন্তন সরকারের তখন মাগরিবের ওয়াক্ত চলছে। ফরেন রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য হন্য হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি আমরা। বাইরের থেকে সংস্কারের এক গাদা প্রেসক্রিপশন, সরকার যা বলে আমরা এটা করব সেটা মানব তার কোনোটাই বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। হঠাৎ একটা সুযোগ এলো জাপান বাংলাদেশকে ৪০০ মিলিয়নের এনার্জি সেক্টরে ক্রেডিট দেবে, তবে বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ লাগবে। বিশ্বব্যাংক অনেক দিন ধরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সংস্কার আনতে বলছে। ২ জুন ১৯৯০ ইআরডি থেকে আমরা বললাম সব করব আগে আমাদের টাকাটা দিন। অপরপক্ষ থেকে বলা হলো, তোমাদের মুখের কথায় কাজ হবে না, ঠিক আছে ১২ জুন অর্থমন্ত্রী (জেনারেল মুনএম) বাজেট বক্তৃতায় অন্তত দেশবাসীর সামনে বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার (সিস্টেম লস কমানো, কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, বিদ্যুতে ভর্তুকি হ্রাস ইত্যাদি) সম্পর্কে কর্মপরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলে বক্তৃতার কপি দেখে ৪০০ মিলিয়ন ক্রেডিট ছাড়ে সম্মতি মিলবে। হলোও তাই। ১৬ জুন ব্যাংক অব টোকিও থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার হয়। সরকারের খতম তারাবি হয় কয়েক মাসের মধ্যে।

এসব সংস্কারের শর্তকে নতুন এবং অভাবিত ভাবার অবকাশ নেই। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ যেসব শর্ত আরোপ করে তা স্ব স্ব দেশের অর্থনীতিতে ঘটে যাওয়া অঘটনের, অনিয়মের, অপচয়ের, অপব্যয়ের, আত্মসাতের, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাকে ঠেকানো এবং সঠিক পথে ওঠার জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। এসব শর্ত আরোপকে দেশ ও অর্থনীতির কাছে অপমানজনক মনে হতে পারে, কিন্তু এসবই কর্মফলের প্রেক্ষিতে আসে।         

রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি ও প্রশাসন পদ্ধতির উন্নয়ন সম্পর্কে এনবিআর কর্মকর্তারা আইএমএফ প্রতিনিধিদের কাছে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলে উল্লেখ করেছেন। বলা হয়েছে, এরই মধ্যে আয়কর আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে, বন্দরে স্ক্যানার বসানোর কাজ চলছে। ইএফডি কেনার কাজ চলছে। যন্ত্রটি কেনায় গতি আনতে আরও একাধিক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অব্যাহতির তালিকা ছোট করতে হিসাব কষা হচ্ছে। যা আগামী রাজস্ব বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। রাজস্ব জালের আওতা বাড়াতে এরই মধ্যে কর অঞ্চলের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনলাইনে রাজস্ব জমা দিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যা আগামী বাজেটেই বাধ্যতামূলক করা হবে। অর্থ পাচার রোধে কাউকে ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। সরকারের সব প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করে কাজ করার প্রস্তুতি নিয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সততা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে আছে কর্র্তৃপক্ষ।

এনবিআরের রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে আইএমএফ মার্চের মধ্যে সরকারকে কমপক্ষে ২ লাখ ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা কর আদায় করার শর্ত দিয়েছিল। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এনবিআর রাজস্ব আদায় করেছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মার্চে ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় হয়েছে বলে এনবিআর জানালেও এ আদায় মূল হিসাব থেকে কম এটিও আলোচনায় রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য আইএমএফ প্রতিনিধিরা রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত দশমিক ৫ শতাংশ বাড়াতে বলেছেন। আলোচনায় উঠে আসে, শুল্ক-কর অব্যাহতির কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আদায় করতে পারছে না এনবিআর। অব্যাহতিপ্রাপ্ত শুল্ক-কর আদায় করা গেলে রাজস্ব আদায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি হতো। স্বল্প করহার, কর অব্যাহতি এবং কর অবকাশ সুবিধাগুলোর কারণে দেশে কর-জিডিপির বর্তমান অনুপাত সম্ভাব্য প্রকৃত অনুপাতের তুলনায় ২.২৮ শতাংশ কম হচ্ছে বলে আলোচনা উঠে আসে। বাংলাদেশে কারা, কখন, কীভাবে কর ছাড় পায় তার সুস্পষ্ট নীতিমালা করার কথা জানিয়ে সংস্থাটির প্রতিনিধিরা বলেছে, কর ছাড়গুলো বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া হয়েছে। কখনো কখনো অর্থবছরের মাঝখানে প্রজ্ঞাপন দিয়েও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব সুবিধা দেওয়ার ফলে লাভ কতটা হয়েছে তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে আইএমএফ সুপারিশ করেছে।

কর আহরণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অবস্থান কমনওয়েলথভুক্ত অন্যান্য দেশ, যারা উত্তরাধিকার সূত্রে একই কর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পেয়েছে তাদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এর অন্যতম কারণ, অন্যসব দেশে প্রয়োজনীয় সংস্কার উদ্যোগের দ্রুত বাস্তবায়ন। যেমন ভারত ১৯৬১ সালে, মালয়েশিয়া ১৯৬৭ সালে ঔপনিবেশিক আমলের আয়কর আইনকে যুগোপযোগী করে নেয়। ইন্দোনেশিয়া কয়েক বছর পরপর তাদের রাজস্ব আহরণ আইনকে রীতিমতো ঢেলে সাজায়। একই সমতলে অবস্থানরত কমনওয়েলথ সদস্য দেশ বাংলাদেশে আয়কর আইনের আধুনিকতম সংস্করণ করা হয় ১৯৮৪ সালে, তাও অর্ডিন্যান্স আকারে। সেটাকে যুগোপযোগী করে আইন আকারে পাস ও প্রবর্তনের কসরত চলছে গত দেড় যুগ ধরে। বাংলাদেশ ও ভারতের কর ব্যবস্থা, সুবিধা, ফরম্যাট মূলত একই। তবে একটা বড় প্রশাসনিক পার্থক্য হলো, বাংলাদেশের রাজস্ব বোর্ড পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কর, এক মন্ত্রণালয় এবং একজন প্রশাসনিক চেয়ারম্যানের অধীনে। ভারতে তা নয়, সেখানে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ করের প্রশাসন আলাদা। আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকেও ভারতের কর বিভাগ বাস্তবায়নকারী হিসেবে সশাসিত। কেন্দ্রের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পলিসি প্রেসক্রিপশন ও থ্রেসহোল্ড দেওয়ার ব্যাপারে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও একটা শক্তিশালী অবস্থান যেমন আছে তেমনি রাজ্য পর্যায়ে আছে স্থানীয় কর আইন ও ব্যবস্থাপনার সমান্তরাল প্রণয়ন ও প্রয়োগের সুযোগ। 

আরেকটি হলো হিসাব সংরক্ষণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। বাংলাদেশেরও আছে, কিন্তু হিসাব পদ্ধতি, কোম্পানির আইন সব মিলিয়ে দেশগুলোতে একটা টেকসই সংস্কৃতি গড়ে উঠলেও সে সড়কে বাংলাদেশের ওঠার প্রয়াস প্রলম্বিত হচ্ছে। বাংলাদেশে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এক হাতে হয়। তাই এখানে ডিসক্রিয়েশনারি পাওয়ার প্রয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত বিষয়গুলো অনেক জটিল ও নিবর্তনমূলক হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যা ধোঁয়াশা হয়ে যায়। অন্যান্য দেশে ওই সমস্যা তেমন একটা নেই। তারা অনেকটা স্বচ্ছ, সংহত একটা আধুনিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে।

ভ্যাট আইন প্রণয়ন ও প্রবর্তনে বাংলাদেশ যথেষ্ট ধীর এবং এখনো দোটানায়। ভ্যাট মধ্যস্বত্বভোগকারীদের দখল থেকে সরকারি তহবিলে আনার আইন-কানুন কলাকৌশল দিয়ে যেন সহজে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। বাংলাদেশে আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, যে মূল্য নির্ধারণ কিংবা ট্যারিফ ঠিক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্যারিফ কমিশন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন এনবিআর শুল্ককর হার নির্ধারণ ও আরোপের সময় সেটিকে তেমন একটা আমলে নেয় না। একইভাবে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক পরিশোধসংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন জারি করতে গেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি আনতে হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের মধ্যে মতামতের রশি টানাটানিতে শুল্ক আহরণ মাঠে মারা যায়। ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়ায় শুল্কায়ন সিদ্ধান্তদানকারী টায়ার বা লেয়ার অনেক কম। অধিকাংশ দেশে ট্যারিফ কমিশন শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে সবকিছু দেখে। বাংলাদেশে গণশুনানি করে ট্যারিফ কমিশন। কিন্তু শুল্ক আরোপ করে এনবিআর। এই জটিলতা নিরসনে সংস্কারের কথা বলা হলেও তাতে খুব একটা অগ্রগতি নেই। আর শুল্ককর আরোপের কমানো-বাড়ানোর সাংবিধানিক দায়িত্ব যে মহান সংসদের সেখানে এসব নিয়ে পরীক্ষা-পর্যালোচনার সুযোগ ছাড়া কর আহরণ পদ্ধতির বাঞ্ছিত সংস্কার ও উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে না।

লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

mazid.muhammad@gmail.com