মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির বিশ্বায়নে এখন চাইলেও কোনো দেশ একা চলতে পারে না। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্জন, অগ্রগতি, এগিয়ে চলার সঙ্গে বিশ^কে সম্পৃক্ত করা, নিজেদের আরও সমৃদ্ধ করা- বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, জ্ঞান, বিজ্ঞান, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন কাজে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহযোগিতা, সমর্থন অপরিহার্য। এই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য সফর অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রী জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করেছেন। প্রথমে জাপানের পর তিনি ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের ৫০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এরপর ব্রিটেনে রাজার অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে, শেখ হাসিনার সরকার বিশ্বে এখন ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত, সম্মানিত ও আলোচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা ভারত সফরে গিয়ে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশ ও ভারতকে ঘিরে তার সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এবং বাংলাদেশের বিশাল বাজারকে কেন্দ্র করে দেশটি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কিছু রাজ্যের সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। জাপান এই খাতে বিনিয়োগ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে কৃষি, মেট্রোরেল, শিল্প, জাহাজ পুনঃচক্রায়ন, শুল্ক, প্রতিরক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আটটি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদার। এই দেশ বর্তমানে আমাদের একক বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের বৃহত্তম উৎস, দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন অংশীদার এবং প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংক প্রাঙ্গণে আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের উন্নয়নের সাফল্য তুলে ধরেছে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য বৈশ্বিক ঋণদাতার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার জন্য উৎসাহব্যঞ্জক যাত্রায় বিশ্বব্যাংক আমাদের সঙ্গে থাকবে।
বিশ্বব্যাংক এখন বাংলাদেশে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়সাপেক্ষ ৫৩টি বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ অর্থ এ পর্যন্ত ব্যাংকের দেওয়া ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুদান ও ঋণের অংশ।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী কিছু অর্থনীতির দেশের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখন ৪৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপিসহ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং একটি উদীয়মান প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। তিনটি মানদ-েই যোগ্যতা অর্জন করে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণ লাভ করেছি। নিজস্ব অর্থায়নে আমাদের দীর্ঘতম পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি, যা এখন আঞ্চলিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। এই সরকার মেট্রোরেলও নির্মাণ করেছে, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বন্দরের অবকাঠামো উন্নত করেছে। এতে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সংযোগ বেড়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাংলাদেশ গর্বিত যে ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) দ্বারা প্রত্যায়িত বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি সবুজ পোশাক কারখানার মধ্যে ৫৩টি বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে ‘স্বল্পোন্নত’ থেকে ‘উন্নয়নশীল’ দেশে পরিণত হবে। এর জন্য, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং রপ্তানি ভিত্তি প্রসারিত করতে আমাদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।” প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, “২০২২ সালে, আমাদের দারিদ্র্য হার ১৮.৭%-এ নেমে এসেছে, চরম দারিদ্র্যের দ্রুত হ্রাস পেয়ে ৫.৬%-এ নেমে এসেছে। কভিড-১৯ মহামারী, ইউরোপে যুদ্ধ এবং জলবায়ু সংকটের কারণে সৃষ্ট বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এসব সাফল্য এসেছে।”
অবশ্য বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতির পালাবদলে এখন বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। কৌশলগত কারণে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের যতটুকু দরকার, যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের আরও বেশি দরকার। সুতরাং, এই সফরের মাধ্যমে পশ্চিমাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও উন্নত হবে।
জাপান বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। জাপানের বিনিয়োগ পরিকল্পনার মধ্যে একটি শিল্পাঞ্চল তৈরিসহ বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন ও বন্দর তৈরিতে বিনিয়োগ রয়েছে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদিত পণ্য তারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানে বাজারজাত করতে চায়, এজন্য চায় যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে। দেশের তিনটি অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে জাপান। এর মধ্যে রয়েছে মাতারবাড়ী এলাকায় নতুন একটি বাণিজ্যিক বন্দর। এই বন্দরের সঙ্গে ত্রিপুরাসহ ভারতের স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চল সংযুক্ত হবে।
জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী একটি বিনিয়োগ সম্মেলন, স্থানীয় বাংলাদেশিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানসহ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখায় কয়েকজন জাপানি বন্ধুর হাতে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার’ সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এখানে মনে রাখা দরকার- আমরা বঙ্গবন্ধুর দেখানো পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ অনুযায়ী চলব। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে জাপান সফরকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা দুই দেশই এশীয়। এশিয়াতে শান্তি, প্রগতি এবং স্থিতিশীলতার প্রশ্নে আমাদের দুই দেশের লক্ষ্যও এক। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে জাপানের মতোই আমরা সমন্বিত নিয়মশৃঙ্খলার পক্ষপাতী। ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতিগত উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে জাপানের জনগণের মতোই আমরা ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ।
লেখক : সাংবাদিক
motaherbd123@gmail.com