পুতিনের ভাষ্য ‘সন্ধিক্ষণে’ বিশ্ব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। এ দিনটিকে বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপন করে রাশিয়া। প্রতিবারের মতো এবারও মস্কোর বিখ্যাত রেড স্কয়ারে আয়োজন করা হয় বিজয় দিবস প্যারেড। এতে অংশ নেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এবারের বিজয় দিবসের প্যারেডে নিরাপত্তাজনিত সংক্ষিপ্ততা থাকলেও বিপুল সেনা সমাবেশ এবং আন্তঃমহাদেশীয় পারমাণবিক অস্ত্রসহ, ট্যাংক, সাঁজোয়া যানের সমারোহ ঘটায় মস্কো। রেড স্কয়ারে জাতির উদ্দেশে পুতিন বলেন, ‘বিশ্ব আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আবারও “সত্যিকারের যুদ্ধ” শুরু হয়েছে।’

তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বিশ্বায়নবাদী পশ্চিমাদের সমালোচনা করেন এই ভাষণে। রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি জানায়, পুতিন অভিযোগ করেন যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা চান তাদের ইচ্ছা, শাসনব্যবস্থা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে। তিনি পশ্চিমাদের হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘তারা (পশ্চিম) হয়তো ভুলে গেছে নাৎসিদের পরিণতির কথা। তাদের হয়তো মনে নেই যে কারা সেই দানবদের পরাজিত করেছিল।’

তিনি রাশিয়ার অস্তিত্বের জন্য ইউক্রেন যুদ্ধ জয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘রাশিয়া একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ দেখতে চায়।’ পুরো দেশই এখন ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’-এর সঙ্গে আছে উল্লেখ করে পুতিন এতে জয়লাভের অঙ্গীকার করেন এবং বলেন, ‘ইউক্রেনে লড়াই করা সেনাদের ওপরই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।’

পুতিন তার ভাষণে, বিশ্বজুড়ে সংঘাত, অভ্যুত্থান উসকে দেওয়ার পেছনে পশ্চিমা ‘এলিটদের’ হাত রয়েছে বলে দোষারোপ করেন। রাশিয়ার ধ্বংস এবং পতন ডেকে আনা ছাড়া তাদের আর কোনো লক্ষ্য নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। পুতিন বলেন, মস্কো এসবকিছুকেই জয় করবে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ অভিযান তথা যুদ্ধ ১৫ মাসে গড়িয়েছে। চলমান এই যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার আবহে ১৯৪৫ সালে নাৎসি জার্মানিকে হারানোর বর্ষপূর্তিতে রাশিয়ার এ ‘বিজয় দিবস’ উদযাপন। কয়েক দিন আগেই ক্রেমলিনে পুতিনের বাসভবনে ইউক্রেনের তথাকথিত ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছিল রুশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এসব প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে এই দিবসের অনেক অনুষ্ঠানই কাটছাঁট করা হয়।

এই কাটছাঁটের সুযোগ নিয়ে রেড স্কয়ারের আয়োজনে রাশিয়ার দুর্বলতা খোঁজার চেষ্টা অবশ্য বাদ দেয়নি পশ্চিমা গণমাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন দাবি করে, এবার সামরিক প্রদর্শনীতে মাত্র একটি টি-৫৫ ট্যাংক হাজির হয় পুতিনের সামনে। অথচ রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন ও বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে দেখা গেছে, রেড স্কয়ারে মাত্র একটি ট্যাংক সাঁজোয়া যান বহরের নেতৃত্ব দিলেও রস্তভ-অন-দন নগরের রাস্তায় নামে রাশিয়ার কয়েক ধরনের অত্যাধুনিক ট্যাংক। এমনকি রেড স্কয়ারে দেখা যায় আন্তঃমহাদেশীয় ইয়ার্স পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রও। শুধু নিজ দেশে শক্তি দেখানো ছাড়াও যুদ্ধক্ষেত্র ইউক্রেনে সামরিক শক্তিমত্তা দেখিয়েছে মস্কো। ইউক্রেনের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে গতকাল মঙ্গলবার বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় রুশ বাহিনী। যদিও ২৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে দুটি ছাড়া সবগুলো ভূপাতিতের দাবি করেছে কিয়েভ। ইউক্রেন বিবৃতিতে জানিয়েছে, দখলদাররা ২৫টি কালিব্র ও এক্স-১০১ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে। সাগর থেকে ছুড়ে ২৩টি ক্ষেপণাস্ত্র। যার অধিকাংশই ধ্বংস করা হয়েছে। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিতসকো গতকাল বলেন, হলোসিভস্কি জেলার একটি জায়গায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বস্ত হয়েছে। কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আহতের খবরও পাওয়া যায়নি। খবর পাওয়া মাত্রই বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী সপ্তাহের শুরুতে সতর্ক করে দিয়েছিল যে, প্রত্যাশিত পাল্টা আক্রমণের আগে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে মস্কো। বিজয় দিবসের ভাষণে পুতিন বিশ্বব্যবস্থায় যে পরিবর্তনের কথা বলেছেন তার নজির অবশ্য দেখা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে এশিয়া পর্যন্ত। সম্প্রতি চীনের মধ্যস্থতায় সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে সৌদি আরব ও রুশ মিত্র ইরান। পুতিন মিত্র আসাদের সিরিয়াকে আবার কাছে টেনে নিয়েছে আরব লিগ। এ ছাড়া পশ্চিমাদের জন্য সর্বশেষ দুশ্চিন্তা হয়ে দেখা দিয়েছে ইউক্রেনের মিত্র সে্লাভাকিয়ার রাজনৈতিক পালাবদল। পদত্যাগ করেছেন সে্লাভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হেগার। ধারণা করা হচ্ছে, দেশটির ক্ষমতায় আসছে রুশঘেঁষা রাজনৈতিক দল।