কেন অশান্ত মণিপুর?

মণিপুর ভারতের ছোট একটি প্রদেশ। রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে হাজার মাইল দূরে মিয়ানমারের সামীন্তবর্তী এই প্রদেশটিতে নানা ধর্ম ও জাতির জনগোষ্ঠী বাস করে। উত্তর-পূর্ব ভারতের যে সাতটি রাজ্যকে একসঙ্গে ‘সেভেন সিস্টার’ বলা হয় মণিপুর তার মধ্যে একটি। 

ভারতের অন্য বড় বড় রাজ্য ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অঞ্চল উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র বা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি রাজধানী দিল্লিতে আলোচিত হলেও উত্তর-পূর্বের ছোট রাজ্য মণিপুরের রাজনৈতিক আলোচনা রাজধানী দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছে কিঞ্চিৎই। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে মণিপুরের গুরুত্ব নেই বললেই চলে। মাত্র দুটি লোকসভা ও একটি রাজ্যসভার সিট রয়েছে মণিপুরে। খ্রিস্টান ও আদিবাসী অধ্যুষিত এই প্রদেশটিতে গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কোয়ালিশন সরকার গঠন করার পর কিছুটা আলোচনায় ছিল রাজ্যের রাজনীতি।

তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। জাতিগত অবিশ্বাস ও হিংসা, সেখান থেকে সংঘর্ষে অশান্ত মণিপুর। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত রাজ্যে ৫৪ জন নাগরিক নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অন্তত ২৩ হাজার মানুষ পার্শ¦বর্তী রাজ্যগুলোতে মাইগ্রেট করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজ্যের পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, ৩৫৫ ধারা রাজি করে রাজ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকার হাতে তুলে নিয়েছে। সেই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘দেখামাত্র গুলির’ নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

এই সংঘাতের সূত্রপাত মূলত জাতিগত অবিশ্বাস থেকে। মণিপুরের শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী মূলত মেইতেই, এর বাইরে কুকি, অঙ্গামি, লুসাই, নাগা ও অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাস করে মণিপুর রাজ্যে। মেইতেই জনগোষ্ঠী হিন্দুধর্মের অনুসারী হলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী মূলত খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী। মেইতেই শহরাঞ্চলে বাস করলেও আদিবাসীরা বাস করে পাহাড়ি অঞ্চলে। মণিপুরে বর্তমানে বিজেপির নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহ মেইতেই জনগোষ্ঠীর মানুষ এবং ধর্মে হিন্দু। তবে আদিবাসী জনগোষ্ঠী কুকি, অঙ্গামি, লুসাই, নাগা ও অন্যদের আস্থা অর্জনে তিনি রাজধানী ইম্ফলের বাইরে গিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক করে আলোচিত হয়েছিলেন। 

মেইতেই জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠী হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে তারা নিজেদের ‘বঞ্চিত’ বলে দাবি করছে। তারা মনে করছে রাজ্যে তাদের চেয়ে আদিবাসীরা বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। এ ছাড়া একটা পরিসংখ্যান এই আলোচনায় ঘি ঢেলে দিয়েছে। ১৯৫১ সালের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে মণিপুরে মেইতেই জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিল মোট জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশ, ২০১১ সালের পরিসংখ্যানে সে অনুপাত এসে দাঁড়িয়েছে ৪৪ শতাংশে। মেইতেই জনগোষ্ঠী মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠী হলেও তারা মূলত শহরাঞ্চলে বসবাস করে। ফলে এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রদেশের মাত্র ১০ শতাংশ ভূমিতে তারা বাস করে, বাকি ৯০ শতাংশ ভূমিতে (পাহাড়ি অঞ্চল) আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সংবিধানের ৩৭১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে শুধু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষই জায়গা জমি কিনতে পারে। আইন অনুসারে পাহাড়িরা রাজ্যজুড়ে জমি কিনতে পারলেও মেইতেইরা পাহাড়ে জমি কিনতে পারে না। মেইতেই জনগোষ্ঠীর অভিযোগ, পাহাড়িরা তাদের জমি কিনে নিচ্ছে।

মূল সহিংসতার আগে আরও কিছু ঘটনা মূলত সহিংসতাকে উস্কে দিয়েছে।  সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ পোস্ত চাষের অভিযোগে এর আগে পাহাড়ি অঞ্চলে অভিযান চালিয়েছিল সরকারের বিশেষ বাহিনী। অবশ্য কুকিরা অভিযোগ করছিল এসব অভিযানের মাধ্যমে রাজ্য সরকার মূলত পাহাড়ে মেইতেইদের ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে মেইতেইদের অভিযোগ, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের তাড়া খেয়ে এসে বহু ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ সাম্প্রতিক সময়ে মণিপুরে আশ্রয় নিয়েছে। যেভাবে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ঢুকে পড়েছে বলে একটি শোরগোল তোলা হয় অনেকটা সেরকম একটা আলোচনা চলছিল যে, পাহাড়ে মিয়ানমার থেকে ‘অনুপ্রবেশকারীরা’ ঢুকে পড়েছে।  এ ছাড়া পাহাড় থেকে কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাড়িঘরও উচ্ছেদ করেছে রাজ্য সরকার। সরকার অবশ্য বলছে এসব বাড়িঘর সরকারের ‘রিজার্ভ ফরেস্টে’র অংশ, ফলে এখানকার বাড়ি উচ্ছেদ করার আইনগত অধিকার সরকারের রয়েছে। কিছুদিন আগে অবৈধ উপায়ে জমি দখলের অভিযোগে পাহাড়ি অঞ্চলের তিনটি গির্জাও ভেঙে দেয় মণিপুরের রাজ্য সরকার। এই ঘটনায় কুকিসহ অন্যান্য খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আদিবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছিল। যেহেতু মেইতেই জনগোষ্ঠী হিন্দুধর্মের ও আদিবাসীরা খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী, ফলে ধর্মের সমীকরণ এখানে জড়িয়ে পড়ছে। 

বর্তমান সহিংসতার শুরু মূলত আদালতের একটি রায়কে নিয়ে। গত ৩ মে হাইকোর্ট একটি রায়ে মেইতেই জনগোষ্ঠীকেও ‘তপশিলি উপজাতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য রাজ্য সরকারকে সুপারিশ করে। রাজ্যে যারা ‘তপশিলি উপজাতি’ তারা নানা ধরনের বিশেষ সংরক্ষিত সুবিধা পায়। মেইতেইরা ‘তপশিলি উপজাতির’ তকমা পেয়ে গেলে তারাও পাহাড়ের জমির মালিকানা দাবি করতে ও মালিক হতে পারবে। এই রায়ের পর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রায়ের প্রতিবাদে ‘অল ট্রাইভস স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিলে সেখান থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সে সহিংসতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যে বিশেষ নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে।  

মণিপুরে যেসব আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে তার মধ্যে কুকি চিন হলো প্রধান। তাদের এই রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রতিবাদকে সরল রৈখিকভাবে দেখছে না ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। যেহেতু তাদের সঙ্গে সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের কিছু জনগোষ্ঠীর শারীরিক গঠনে মিল রয়েছে, ফলে তারা ভারতে এসে মিশে যাচ্ছে বলে একটা সতর্কতা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে রয়েছে। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে তাদের অনেকে আবার বর্তমানে শিবিরে রয়েছে। রাজ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে মিয়ানমার থেকে যেন কেউ ভারতের প্রবেশ করে পরিস্থিতি আরও জটিল করতে না পারে তা নিয়ে সীমান্তে আসাম রাইফেলস নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কঠোর করেছে। কুকি চিনকে নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আরও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে তাদের স্বাধীকারের চিন্তা তৈরি হওয়া নিয়ে। কুকি চিন নামে একটি জাতিগত কোয়ালিশন বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের একটি অংশ নিয়ে নিজেদের জন্য আলাদা রাজ্য ঘোষণা করেছিল। এই পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ করে বান্দরবানে এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কুকি চিনদের একটি অংশ আবার মিয়ানমারেও বাস করে। বাংলাদেশে যারা রাজ্য দাবি করেছিল তারা সশস্ত্র। ফলে এই অঞ্চলে একটি কুকি চিন জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে পড়ে কিনা সেটা নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্বেগ থাকতে পারে। যেহেতু তাদের কেউ কেউ সশস্ত্র। তাই এই উদ্বেগকে একেবারে হালকা করার সুযোগ নেই।

তবে মণিপুরে এমন সময়ে একটি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যখন ভারতের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনের বাকি ১ বছরের কম সময়। এর আগে পাঞ্জাবে শিখ জাতীয়তাবাদীদের আন্দোলন দমন করতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। লাদাখে চীন- ভারতের সংঘর্ষে ভারতের ভূমিকা যথাযথ ছিল না বলেও বিরোধীরা কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করছে। এ ছাড়া বিজেপির নিয়োগকৃত জম্মু কাশ্মীরের সাবেক গভর্নর সত্য মালিক কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে ২০১৯-এর ফেব্রুয়ারিতে যে ৪০ সিআরপিএফ জওয়ান নিহত হন তাতে প্রশাসনের গাফিলতি ছিল বলে দাবি করেন। এ ছাড়া সে সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তাকে ‘চুপ’ থাকতে বলা হয়েছিল বলে দাবি তার। তার এই দাবির পর কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধীরা বিজেপিতে একহাত নিয়েছে। সেখানে যুক্ত হয়েছে পাঞ্জাবের শিখ মুভমেন্ট ও মণিপুরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি। সব মিলিয়ে ভারতের বিজেপি সরকারকে বেশ কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।

মণিপুরে যখন এমন পরিস্থিতি যখন দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকে চলছে বিধানসভা নির্বাচন। এই রাজ্যটি দক্ষিণ ভারতে বিজেপিশাসিত একমাত্র রাজ্য। অন্যদিকে কংগ্রেসের বর্তমান সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাড়ি এই রাজ্যে। রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো’ এই রাজ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে বলে দাবি করছে কংগ্রেস এবং বিধানসভায় জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। অন্যদিকে দক্ষিণের একমাত্র শাসিত রাজ্য ধরে রাখতে মরিয়া বিজেপি। এই নির্বাচনের ফলাফল যা হোক তা আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনে বড় একটি প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া কাশ্মীর এটাক নিয়ে সত্য মালিকের মন্তব্য, পাঞ্জাব ও মণিপুর পরিস্থিতিও লোকসভা নির্বাচনে ফ্যাক্টর হতে পারে। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে নয়াদিল্লি শাসন করা বিজেপির জন্য আগামী লোকসভা নির্বাচন এবং নির্বাচন-পূর্ববর্তী এক বছর বেশ কঠিন সময় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

shahadatju44@gmail.com