ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধা জোরদার, অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি এ অঞ্চলের স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য ‘সামুদ্রিক কূটনীতি’ জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ অঞ্চলের সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ছয়টি অগ্রাধিকার প্রস্তাবও উত্থাপন করেন তিনি।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে আবারও বিশ্ব সম্প্রদায়ের সক্রিয় সমর্থন চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সমস্যাকে বৈশ্বিক সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে তাদের বোঝা টানা আর সম্ভব হচ্ছে না।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে দুদিনব্যাপী ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলন (ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্স-আইওসি) উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন এ সম্মেলনের আয়োজন করছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভারত মহাসাগর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং এ অঞ্চলের সব দেশের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ। আমি এ ষষ্ঠ ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে ছয়টি অগ্রাধিকারের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করতে চাই। আমরা সম্প্রতি ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক প্রণয়ন করেছি।’
মরিশাসের প্রেসিডেন্ট ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ২৫টি দেশের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিদল সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। এ ছাড়া ডি-৮, সার্ক ও বিমসটেকের প্রতিনিধিসহ প্রায় ১৫০ জন বিদেশি অতিথি সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। সম্মেলনে মিয়ানমারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
উদ্বোধনী অধিবেশনে মরিশাসের প্রেসিডেন্ট পৃথ্বীরাজ সিং রূপন, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফয়সাল নাসেম, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এবং সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মন্ত্রী ও পররাষ্ট্রবিষয়ক সেকেন্ড মন্ত্রী ড. মালিকি ওসমান বক্তব্য রাখেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তৃতা করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী ভারত মহাসাগরে সহনশীল ভবিষ্যতের জন্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তোলার জন্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধা জোরদার করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে তাদের উন্নয়নের জন্য “সামুদ্রিক কূটনীতি” গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এ অঞ্চলের অনেক দেশের জলবায়ুঝুঁকি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কমাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।’
শেখ হাসিনা সমুদ্রে জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়াদান, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমসহ ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌ-চলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতার অনুশীলনকে সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী এই অঞ্চলে ‘শান্তি সংস্কৃতি’ এবং জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ন জোরদারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেক নারীদের বিষয়ে যথাযথ মনোযোগ দেওয়া উচিত।
সরকারপ্রধান বলেন, ‘অনেক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের ১১ লাখের বেশি নাগরিককে সাময়িক আশ্রয় দিয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি এ অঞ্চলে একটি বড় মানবিক বিপর্যয় ঠেকিয়েছে। এখন আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ ও টেকসই উপায়ে তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের সক্রিয় সমর্থন চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে বহু শতাব্দী ধরে সামুদ্রিক কার্যকলাপের কেন্দ্রস্থল এবং এটি অনেক আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। বাংলাদেশ ভারতীয় মহাসাগর রিম অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রতল কর্র্তৃপক্ষের কাউন্সিলেরও বর্তমান সভাপতি। বাংলাদেশ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের পুরনো ও অপ্রচলিত চ্যালেঞ্জে বিশ্বাস করে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এ অঞ্চলে শান্তির জন্য আমাদের ভূমিকা পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছি এবং একটি সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অন্যসব দেশও একই কাজ করবে বলে আশা করি।’ তিনি বলেন, বিশ্ব বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ এবং তেল পরিবহনের ৬০ শতাংশ এ অঞ্চলের মহাসাগর ও সমুদ্রপথে পরিচালিত হয় এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রকৃত ব্যয় গত ১৫ বছরে তিনগুণ বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এশিয়া-প্যাসিফিক ও আফ্রিকান অঞ্চলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কৌশলগত প্রভাব রয়েছে। এ অঞ্চলে বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জিডিপির ৬০ শতাংশ রয়েছে। এ অঞ্চলের অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অঞ্চলটি অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তাই ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে।
তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছিলেন। সম্মেলনের থিম, ‘শান্তি, অংশীদারত্ব ও সমৃদ্ধি : একটি সহনশীল স্থিতিস্থাপক ভবিষ্যতের দিকে’ খুবই উপযুক্ত ও সময়োপযোগী। কভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতি এবং চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ফলে নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে এ থিমটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, এগুলো বিশ্বের সব দেশের জন্য অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বৈশ্বিক মন্দা, খাদ্য, জ্বালানি এবং সার সংকটের ফলে বিশ্বের সব মানুষের জীবনযাত্রার অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলও জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে, এ অঞ্চলের দেশগুলোকে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে এবং একটি উজ্জ্বল অঞ্চলের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
গত এক দশকে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশে নেমে এসেছে এবং আমাদের মাথাপিছু আয় এক দশকের মধ্যে তিনগুণ বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) ক্যাটাগরি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব মানদণ্ড পূরণ করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য সহায়ক শক্ত ভৌত অবকাঠামোসহ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে চাইছে। গত বছর আমরা নিজস্ব-অর্থায়নে নির্মিত ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’ উদ্বোধন করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি আমরা রাজধানীতে প্রথম মেট্রোরেল পরিষেবা উদ্বোধন করেছি। আমরা শিগগিরই চট্টগ্রামে নদীর তলদেশে ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল সম্পূর্ণ করব; যা দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের প্রথম টানেল।
তিনি বলেন, ‘আমাদের আকাক্সক্ষা হলো ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক, উন্নত দেশ, “সোনার বাংলা”তে রূপান্তর করা এবং ২১০০ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও জলবায়ু সহনশীল বদ্বীপ গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য আমাদের কৌশলের মধ্যে রয়েছে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার এবং সবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা।’
অসুস্থতার জন্য যোগ দিতে পারেননি ড. মোমেন : অসুস্থতার কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে সরাসরি যোগ দিতে পারেননি। তিনি ভার্চুয়ালি এ সম্মেলনে যোগ দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ড. মোমেন সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন।
বাংলাদেশের কোনো সামরিক উচ্চাভিলাষ নেই, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম সম্মেলন উদ্বোধনের আগে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের কোনো সামরিক উচ্চাভিলাষ নেই, অথবা কোনোও আঞ্চলিক শক্তিও হতে চায় না।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দর্শন হলো সবার মুখে হাসি ফোটানো। আমাদের দেশে যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলো অনেকটা মৌলিক। এখানে এখনো ১৮ শতাংশের মতো দারিদ্র্য আছে এবং এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতিরা যখন বৈঠকে বসেন, তখন তারাও এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন যে কীভাবে মানুষকে আরও ভালোভাবে রাখতে পারি। এটিই আঞ্চলিক উদ্দেশ্য।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুকের সঙ্গে বড় অর্থনৈতিক দেশগুলো যে কৌশলপত্র দিয়েছে, সেটির সঙ্গে আংশিক মিল পাওয়া যাবে।
ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে ২৫ দেশের প্রতিনিধি রয়েছেন জানিয়ে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘এ সম্মেলনে কাউকে ইচ্ছা করে বাদ দেওয়া হয়নি। মিয়ানামারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কারণ পৃথিবীর অন্য দেশগুলো ওই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই দেশটির সরকারি প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এ ছাড়া অন্য সব বড় দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’