সবচেয়ে বেশি ভয় সেন্টমার্টিন নিয়ে

‘অঁবাজি, ৮ নম্বর সিগন্যালের হবর পাই, রাইতভর ঘুম ন যাই। আজিয়া তো আবার ১০ নম্বর সিগন্যাল। ঘরদুয়ার ফেলাই জান বাঁচাইত এডে (সেন্টমার্টিন পুলিশ ফাঁড়ি) আইসি। গত রাইত্যা ঘুম ন যাই, আইজ্যা তো ঘুম ন হইব। কী না কী অইব।’ আঞ্চলিক ভাষায় নিজের মনোভাব প্রতিবেদকের কাছে গতকাল রাত সাড়ে ৮টায় এভাবেই ব্যক্ত করেছেন সেন্টমার্টিন দক্ষিণ পাড়ার আমির হামজা। যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের খবর পেয়েই ঘুমাতে পারিনি। আজ দিয়েছে ১০ নম্বর সিগন্যাল। জীবন বাঁচাতে ঘর-বাড়ি ছেড়ে এখানে (সেন্টমার্টিন পুলিশ ফাঁড়ি) এসেছি। গত রাতে ঘুমাইনি, আজ তো ঘুম আসবেই না, কী না কী হয়ে যায়? আমির হামজার মতোই মহাবিপদ সংকেত ৮ হওয়ার পর থেকে মোখার দুশ্চিন্তায় কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্ট মার্টিনের লোকজনের খাওয়াদাওয়া, ঘুম সব উবে গেছে। সবার কপালেই এখন চিন্তার ভাঁজ।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের লোকসংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। বঙ্গোপসাগরের মধ্যে আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দ্বীপটি ঘূর্ণিঝড় মোখার আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দ্বীপের বড় একটি অংশ সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। তারা বলছেন, মোখার আঘাতে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ভূ-অবকাঠামোর বড় ক্ষতি হবে। এতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। কেউ কেউ বলছেন, মোখার আঘাতে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ভূ-অবকাঠামোর বড় ক্ষতি হবে। কমপক্ষে দ্বিতীয় বা তার ওপরের তলার ভবনে আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করা হয় তাহলে বড় প্রাণহানির শঙ্কা আছে।

মোবাইল ফোনে কথা হয় সেন্ট মার্টিনের আরজিনা নামের এক নারীর সঙ্গে। তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন বাঁচাতে হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, ঘরবাড়ি, আসবাব সব ফেলে জীবন বাঁচাতে এখানে এসেছি। শুনেছি পানির উচ্চতা হবে ১০-১২ ফুট। তাহলে তো সব ভেসে যাবে। অনেক প্রাণহানি ঘটবে। ভেবেই তো আঁতকে উঠছি। তাই খাবারদাবার ঘুম কিছুই হচ্ছে না।’

এ বিষয়ে সেন্ট মার্টিন ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারির পর থেকে সেন্ট মার্টিনের লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে আসা শুরু করেছেন। এই মুহূর্তে দ্বীপের ভলান্টিয়ার ও জরুরি কাজে নিয়োজিত দায়িত্বশীল ছাড়া সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেন্ট মার্টিনে অবস্থিত দ্বিতল কিংবা বহুতল ৩৭টি ভবনকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে এখন ৪ হাজার ৩৩ জন আশ্রয় গ্রহীতা। তাদের খাবারদাবার সব নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় মোখার খবরে দ্বীপের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে আগেভাগে পরিবার নিয়ে টেকনাফে চলে গেছেন। স্থানীয়রা বলছেন, ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হলে দ্বীপের অধিকাংশ ঘরবাড়ি বিলীন হতে পারে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ঘূর্ণিঝড়ে সেন্ট মার্টিনের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় মোখার কারণে সবচেয়ে বেশি বেগে বাতাস সেন্ট মার্টিনের ওপর দিয়ে যাবে সন্দেহ নেই। এতে ঘরবাড়ি ও গাছপালার ক্ষতি হতে পারে। তবে দ্বীপটিতে বড় জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কার গুরুত্ব দেননি তিনি। কামরুল ইসলাম বলেন, সেন্ট মার্টিন গভীর সমুদ্রে অবস্থিত। তাই সাগর থেকে আসা জলোচ্ছ্বাস এখানে বেশি উচ্চতায় উঠতে পারবে না।