রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধির মধ্যেই তৈরি পোশাক খাতে সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েক মাস ধরেই খাতটির উদ্যোক্তারা রপ্তানি আয় কমে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন। মূলত, ডলার সাশ্রয়ে আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। এতে বস্ত্রখাতসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে টান পড়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাবে কারখানার উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ হুমকির মুখে পড়বে।
এদিকে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জের কারণে কারখানার যদি বন্ধ হয় তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বড় ধাক্কা খাবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানও কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে।
পোশাক ব্যবসায়ীরা বলছেন, রপ্তানির প্রধান প্রধান অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকায় আগামীতে ওই সব অঞ্চলে রপ্তানি ব্যাপক হারে কমে গেছে। ইতিমধ্যে তার প্রভাবও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। অর্ডার কমে যাওয়ায় কমেছে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিও। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছর মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খোলার হার নেমেছে প্রায় অর্ধেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে পণ্যটির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। এসময় শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা কমেছে ৩১ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে সাড়ে ৬ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি কমেছে যথাক্রমে সাড়ে ৩১ শতাংশ ও সাড়ে ২২ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ডলার সংকটের শিল্পেই কাঁচামালের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে পোশাক উৎপাদন কমেছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা হয়েছে মাত্র ২২৯ কোটি ডলারের। যা গত অর্থবছরে ছিল ৫১৯ কোটি ২৫ লাখ ডলার। সেই হিসাবে নয় মাসে কমেছে ৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মন্দার আশঙ্কায় কেউ নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এ কারণে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। তবে কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়াকে তারাও আসন্ন সংকট হিসেবে দেখছেন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামালের আমদানি হ্রাস অর্থনীতির জন্য ভালো না। একটা সময়ে পরে রপ্তানি ও বিনিয়োগ কমবে। যার প্রভাবে কর্মসংস্থান কমবে।’
একই প্রতিবেদন বলছে, শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের। যা গত অর্থবছরের ছিল ২ হাজার ৫৪৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। এখানে কমেছে ৩১ দশমিক ১৬ শতাংশ। পাশাপাশি শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলা কমেছে ৩০ দশমিক ৯১ শতাংশ কম।
এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘করোনায় ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে না হতেই নতুন বাধা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এতে ডলারের দাম বেড়ে যায়। ফলে বেশি ঋণের প্রয়োজন হলেও ব্যাংকগুলো ঠিকমত ডলার সরবরাহ করতে পারছে না। যা শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমে গেছে। উৎপাদনের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কর্মসংস্থানও হ্রাস পাবে।’