দেশের একেবারেই উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। ১ হাজার ৪৪০ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার আয়তনের জেলাটি দিনাজপুর থেকে আলাদা হওয়ার পর পরিচিত হয়ে উঠেছে অর্গানিক চা আর কাঞ্চনজঙ্ঘা পবর্তমালার মোহনীয় শুভ্র রূপ উপভোগ করতে পারার জন্য। জাতীয় সংসদের আসন গণনা শুরু এ জেলা দিয়েই।
পঞ্চগড়ের দুটি সংসদীয় আসনের প্রথমটি সদর, আটোয়ারী ও তেঁতুলিয়া উপজেলার ২৩ ইউনিয়ন নিয়ে। এই আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আওয়ামী লীগ নেতা মাজহারুল হক প্রধান। ২০০৮ সালেও এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি।
ওই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা কেমন সেই পর্যালোচনায় দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মতামত তুলে এনেছেন আমাদের দুই প্রতিবেদক। নানা বয়সের, মতের ও পেশার কমপক্ষে ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন তারা। তবে প্রতিবেদনে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি সংগত কারণে। নির্বাচনী এলাকার তিন ইউনিয়নের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী এমন তিনজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভোটের হিসাবে আওয়ামী লীগ এগিয়ে থাকলেও বর্তমান সংসদ সদস্যের ‘অরাজনৈতিক’ আচরণের কারণে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দলটি পিছিয়ে আছে বলা যায়। যুক্তি তুলে ধরে তারা বলেন, ক্ষমতাসীনদের দলীয় অনৈক্য বেড়েছে। দলীয় কর্মী ও সাধারণ ভোটার কারও সঙ্গেই সংযোগ নেই মাজহারুল হকের। এতে করে আওয়ামী লীগ তুলনামূলক দুর্বল হয়েছে। ছোটখাটো উন্নয়নকাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ থাকলেও এর মূলে রয়েছে সংসদ সদস্য ও তার দলবলের কমিশন-বাণিজ্য।
আওয়ামী লীগ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে কোনো কাজ না করায় আগামী নির্বাচনে শঙ্কা দেখছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন ভোটার। তার দাবি, এই আসনে সাঁওতাল, খ্রিস্টান, সনাতন ধর্মাবলম্বী মিলিয়ে ৩০ হাজার সংখ্যালঘু ভোট আছে। মাজহারুল হক মনে করেন, এসব ভোটার নৌকার বাইরে যাবে না। ফলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, সাহায্য-সহযোগিতা করা এসব এড়িয়ে চলেন তিনি।
এই ভোটার আরও বলেন, এ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী রয়েছেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বা তার ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জামিল। একাদশ সংসদ নির্বাচনে নওশাদ প্রার্থী হয়েছিলেন। দ্বাদশ সংসদেও তার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি দেখছেন তিনি। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর চেয়ে এলাকায় জমিরউদ্দিন পরিবারের যোগাযোগ একটু বেশি। তা ছাড়া জমিরউদ্দিন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে এলাকায় কিছু কাজকর্ম করেছেন, যার উপকারভোগী দরিদ্র পরিবারগুলো। এদিক থেকেও অনেক পিছিয়ে আছেন মাজহারুল হক প্রধান। এ ছাড়া পাঁচবারের সাবেক পৌর মেয়র তৌহিদুল ইসলামও এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। অন্যদিকে আওয়ামী লীগে মাজহারুল হক ছাড়াও আছেন দলের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত সম্রাট এবং প্রস্তাবিত কমিটির সহসভাপতি নাইমুজ্জামান মুক্তা।
গত ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাঁববার বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। চারবার বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। ২০১৪ সালে শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে (জাসদ) আসনটি ছেড়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল। দলটি ১৯৮৬ ও ৮৮ সালের নির্বাচনও বর্জন করেছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছে।
বিএনপি যে পাঁচবার জয় পেয়েছে তার মধ্যে চারবারই সংসদ সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন। বর্তমান সংসদ সদস্য মাজহারুল হক প্রধান এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন।
তুলনামূলক কম বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতে দুই দলের ভোট পর্যালোচনায় দেখা যায়, পঞ্চগড়-১ আসনে শক্তিশালী আওয়ামী লীগ। তবে প্রার্থীর দিক থেকে এ আসনে বর্তমানে হেভিওয়েট প্রার্থী বিএনপির।
সদর উপজেলার অমরখান ইউনিয়নের এক শিক্ষক বর্তমান সংসদ সদস্য সম্পর্কে মূল্যায়ন করে বলেন, এ আসনে ভাসমান ভোটে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়। ভাসমান এ ভোট এবার আওয়ামী লীগের ঘরে না-ও যেতে পারে। কারণ, এমপির রাজনৈতিক আচার-আচরণে পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে নৌকায় ভোট না দেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি হওয়াও অন্যতম কারণ।