রোমাঞ্চকর! দুলতে থাকা ম্যাচের পেন্ডুলাম নিজেদের দিকে টেনে নিল বাংলাদেশ। কতবার এমন তীরে এসে তরী ডোবার হাহাকার একটা সময় বাংলাদেশকে কুরে খেত। হতাশার নীলে বিষিয়ে উঠত মন। তবে এখন যেন সেই দিন অতীত। বারবার হেরে পোড়খাওয়া মাটির ইটের মতো শক্ত বাংলাদেশ এখন শেষটা নিজেদের করে নিতে শিখেছে। সম্প্রতি খুব কাছে গিয়ে হারের হতাশা হয় না। কালও হলো না। তামিম ইকবালের মাথায় চট করে বাতি জ্বলল। সোনার হাত নিয়ে নাজমুল হোসেন শান্ত এলেন। অফফর্মের কালো চাদর সরিয়ে মাথা উঁচু করেন মোস্তাফিজুর রহমান। ইয়াসির রাব্বি, মৃত্যুঞ্জয়রা ক্যাচ ফেলেন না। আর বাংলাদেশ দলে ইয়র্কারের কারিগর হাসান মাহমুদ শেষ ওভারে দুই উইকেট নেন। তাতে হাত থেকে বের হয়ে যাওয়া ম্যাচ চলে আসে হাতের মুঠোয়। শেষ বলে ৬ রানের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারে না আয়ারল্যান্ড। ৫ রানে জিতে ২-০তে সিরিজ, তার চেয়েও বড় কথা চাপের ম্যাচ হাসিমুখে জয়ের আত্মবিশ্বাস পেয়ে যায় বাংলাদেশ। এদিন বাংলাদেশের করা ২৭৪ রান যথেষ্ট ছিল না। আয়ারল্যান্ডও জানত তা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ২৬৯-এ থামে তারা।
বাংলাদেশের দিকে ম্যাচ ঘোরে ৪২তম ওভারে। এর আগ পর্যন্ত জয়ের হিসাবের বাইরে ছিলেন তামিমরা। একাদশে দ্বিতীয় স্পিনার নেই। ওদিকে দারুণ বল করা মেহেদী হাসান মিরাজের স্পেল শেষ। উপায় না দেখে খ-কালীন স্পিনার শান্তকে টানেন তামিম। বদলিটা চমৎকার কাজে দেয়। ৪২তম ওভারের পঞ্চম বলে আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান ও উইকেটে সেট হয়ে যাওয়া হ্যারি টেক্টরকে ফিরিয়ে দেন শান্ত। ৩ চার ও ২ ছক্কায় ৪৮ বলে ৪৫ রান করেন এই ব্যাটার। অথচ ম্যাচ শেষে তামিম জানান ৪০ ওভার পর্যন্ত শান্তকে টানার কথাই ভাবেননি, ‘আমি চল্লিশ ওভার পর্যন্ত শান্তকে বল করানোর ইচ্ছে বা চিন্তা ছিল না। তবে মিরাজ যেভাবে বল করেছে সেটা আমাকে চিন্তা করিয়েছে শান্তকে বল করানোর। সে বলেছে আমি তার ওপর বিশ্বাস করিনি। কিন্তু আমার নেতৃত্বে সে বল করে টেস্টে উইকেট পেয়েছে। এখন এখানেও ভালো করল।’ সিরিজে প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরিতে ১৯৬ রান ও প্রথম উইকেট নেওয়া শান্ত হয়েছেন সিরিজসেরা।
তবুও ম্যাচ কঠিন ছিল বাংলাদেশের জন্য। কারণ তখনো আইরিশদের দুই হার্ডহিটার জর্জ ডকরেল ও লরকান টাকার ছিলেন। কিন্তু দলে ফিরে অবিশ্বাস্য ফর্ম দেখানো মোস্তাফিজুর পরপর দুই ওভারে দুজনকে ফেরান যথাক্রমে ৩ ও ৫০ রানে। ওই সময় ম্যাচে ফেরার সুবাস পেতে থাকে বাংলাদেশ। মোট ৪ উইকেট নেন মোস্তাফিজ। অভিষেকে বাজে দিন কাটানো মৃত্যুঞ্জয়ের ওভার থেকে ৪৯তম ওভারে ১৪ রান নেওয়া অ্যাডেইর তখন বাংলাদেশের শেষ কাঁটা। শেষ ওভারের প্রথম বলেই তাকে ২০ রানে নিখুঁত এক ইয়র্কারে বোল্ড করে ম্যাচ জয়ের পথ করেন হাসান। এরপর ম্যাকব্রায়েনকে নিয়ে শেষ ওভারটায় মাত্র ১ রান দিয়েছেন এই পেসার। তামিম জানালেন জয়ের আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন কিন্তু মজার খেলা ক্রিকেটে যে কোনো কিছু সম্ভব হলো, ‘আমি একটা সময় ভেবেছিলাম ম্যাচটা হাত ফসকে গেছে। কিন্তু ক্রিকেট মজার খেলা, এক দুটা উইকেট ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। আমরা যখন ক্যাম্ফার ও টাকারকে আউট করলাম তখন ধরে নিয়েছি যে ম্যাচটা জিততে পারি।’
এর আগে ব্যাটিংটা খুব ভালো হয়নি বাংলাদেশের। দারুণ উইকেট পেয়েও পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। সবাই ভালো শুরু পেয়েছেন নিজ নিজ ইনিংসের কিন্তু তা টানতে পারেননি। বিশেষ করে ৯ ম্যাচ ও ৯ মাস পর হাফসেঞ্চুরি পাওয়া তামিম ৮২ বলে ৬ চারে ৬৯ করেও সেঞ্চুরি করতে ব্যর্থ। অথচ উইকেট ও কন্ডিশন সবকিছুই তাকে সঙ্গ দিচ্ছিল। ইনিংসের শুরুতে একটি জীবনও পেয়েছিলেন। তামিমের মতো একই রকম ব্যর্থ বলা চলে লিটন দাশকেও। উইকেটে সেট হয়ে ৩৯ বলে ৩৫ করে ফিরেছেন এই ব্যাটার। তামিমের সঙ্গে ৭০ রানের জুটি ছিল তার। গত ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান শান্ত করেছেন ৩৫। তারও ভালো শুরু আটকে যায় ভুল শটে। লোয়ার অর্ডারে মুশফিকুর রহিমের ধারাবাহিক ফর্ম ও মেহেদী হাসান মিরাজের পাওয়ার হিটিং বাংলাদেশকে ভালো স্কোর এনে দেয়। মুশফিক এ ম্যাচেও দারুণ ইনিংসে খেলেছেন ৫৪ বলে ৪৫ রানে। আর মিরাজ ৩৯ বলে করেছেন ৩৭। তাদের ৭৫ রানের জুটি বাংলাদেশের জয়ের কারণ হয় শেষ পর্যন্ত। লেজের ব্যাটাররা শেষ ৩.২ ওভারে গুটিয়ে যান দ্রুত। ওই সময়ে ৫ উইকেট না হারালে আরও কিছু রান পেত বাংলাদেশ। তখন জয়টা সহজ হতো।
এ সিরিজ জয়ের মধ্য দিয়ে ওয়ানডে সুপার লিগ শেষ হলো বাংলাদেশের। ৬ সিরিজে ২৪ ম্যাচের ১৫টিতে জিতেছে বাংলাদেশ। একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়। মোট ১৫৫ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ।