মনুবাদী দর্শনের কেরালা স্টোরি

খুব কিছু ভুল না করলে কেরল স্টোরির ডিরেক্টর সুদীপ্ত সেনকে আমি চিনতাম। ছবিটির বিষয় এখন সবাই জানেন। নিরীহ অন্য সম্প্রদায়ের মেয়েদের কীভাবে মগজ ধোলাই করে আতঙ্কবাদী বানানো হচ্ছে। কিছু লেখার আগে চুপচাপ বসে তরুণ সুদীপ্তর বুদ্ধিদীপ্ত মুখটা মনে করার চেষ্টা করছি। আর ভাবছি, অন্য সম্প্রদায়ের মেয়েদের না হয় প্রেমের ফাঁদে ফেলে বা অন্যান্য বিষয়ের লোভ দেখিয়ে আইএসএসের চর করে তোলা হচ্ছে, কিন্তু একদা সহজ, হাসিখুশি কার প্রলোভনে এভাবে চরম ইসলামফোবিক হয়ে উঠল সেটা নিয়েও তো প্রশ্ন তোলা যায়।

একটা কথা প্রায়ই বলি, কেউ মানতে চান না। ভারতের অন্যান্য সব জায়গায় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আগ্রাসন বাড়ছে। গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, আসাম তো বহুদিন ধরেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ল্যাবরেটরি। কিন্তু যদি তাত্ত্বিক ভিত্তির কথা বলেন, আমি বলব, মূল ঘাঁটি নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের বর্ণবাদী উচ্চবর্গের হিন্দু মন। এ রাজ্যে বিপ্লব বিদ্রোহের পাশাপাশি চরম দক্ষিণপন্থি রাজনীতির অবস্থান দীর্ঘদিনের। সুদীপ্ত কলকাতা থেকেই নিশ্চিত আরএসএস মন্ত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দীক্ষিত। দিল্লির স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার পরে খোলামেলা দক্ষিণপন্থি হতে সমস্যা হয়নি।

ব্যক্তি সুদীপ্ত সেন নিশ্চিত আমার আলোচনার বিষয় নয়। বরং একজন সামান্য প্রামাণ্যচিত্র পরিচালক হিসেবে বাণিজ্য সফলতার কারণে ওকে অভিনন্দন জানাই। তবে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করতে যে পথটা ও বেছে নিয়েছেন তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কেরালা স্টোরি নিয়ে আলোচনা করাটাই আমার কাছে বাহুল্য। পরিচালক নিজেও জানেন এই পুরোদস্তুর ইসলামফোবিক ছবি নির্মাণের উদ্দেশ্য এ দেশের শাসকদের মনোরঞ্জন করে তাদের হাতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অস্ত্র তুলে দেওয়া।

এর আগে বিবেক অগ্নিহোত্রী করেছিলেন কাশ্মীর ফাইলস। তারও আগে মাওবাদী রাজনীতির নেতিবাচক বিষয়কে রং চড়িয়ে বিবেক করেছিলেন বুদ্ধ ইন দ্য ট্রাফিক জ্যাম। ২০১৮ সালে সুদীপ্ত সেন করেছিলেন এক ডকুমেন্টারি। ইন দ্য নেম অব লাভ। তারই সম্প্রসারিত রূপ এই কেরালা স্টোরি। বিবেক অগ্নিহোত্রীর ছবি গোয়ায় আন্তর্জাতিক মহল যেভাবে ছিছিক্কার করেছিল তার ফলেই বোধহয় বিবেকের জায়গায় অপেক্ষাকৃত নতুন সুদীপ্ত সেনকে বিজেপির প্রমোট করার চেষ্টা।

এও হতে পারে, এক বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালককে সামনে নিয়ে আসার পেছনে চব্বিশ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাফল্যের রণকৌশল। নতুন এক আইকন। বাঙালি জনগণের একাংশকে বলা, দ্যাখো দ্যাখো একজন বঙ্গসন্তান কেমন সাহস করে সত্যি কথা বলে তথাকথিত সেক্যুলারদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন। তোমরা আর কতকাল ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বিশ্বাস করবে!

নতুন করে সংঘ পরিবার এক সেøাগান এনেছে হিন্দু খতরে মে হায়। হিন্দু বিপন্ন। এই বিপন্ন পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে কী কী করতে হবে তার নিদান দেওয়াই কাশ্মীর ফাইলস বলুন বা এই কেরালা স্টোরির উদ্দেশ্য।

ফ্যাসিবাদী রাজনীতি নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কোনো না কোনো কাল্পনিক শত্রুকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে, তাকে ঠেকাতে বিভেদ বিদ্বেষের বীজ পোঁতা। জার্মান ফ্যাসিস্ট বাহিনীর ছিল ইহুদি। ভারতে খ্রিস্টান ও মুসলমান। আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কথায় কথায় প্রায়ই বলেন যে, ক্রোনলজি সমঝাইয়ে। মানে নানা ঘটনা যদি অতীত সময় ধরে খুঁটিয়ে লক্ষ করেন তাহলেই বোঝা যায়, কোনো ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। পরম্পরার মধ্যে লুকিয়ে থাকে নির্দিষ্ট দর্শন বা ভাবধারা।

বলা বাহুল্য, মাননীয় মন্ত্রী বিরোধী দলের প্রসঙ্গে এসব বলেন। তাদের অতীত দেখলেই বোঝা যায় যে, তারা কত ভয়ংকর। অথচ সংঘ পরিবারের ক্রোনলজি ঘাঁটলেই আপনি জানতে পারবেন এই দলগুলোর বিন্দুমাত্র গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি আস্থা নেই। ধর্মীয় বিদ্বেষ তাদের সাফল্যের মূলধন। গোয়েবলস সাহেবের কাছ থেকে তারা আরেকটি গুণ রপ্ত করেছেন। তা হলো, মিথ্যা কখনো বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে একটু-আধটু নয়, অনর্গল, অনেক বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলতে হবে। যদি একটা পাখি মারা যায়, তবে বলতে হবে, দেখে এলাম অন্তত কয়েক লাখ পাখি মারা গেছে। দাঙ্গার সময় এই টেকনিক খুব কাজে দেয়। ১৯৪৬-এর কলকাতা, নোয়াখালী বা বিহারে মিথ্যা বলে বলে ক্ষমতা দখলের নোংরা কদর্য খেলায় মেতেছিলেন আমাদের রাজনীতিকরা। তারপরও যেখানে দাঙ্গা হয়েছে সেখানেই ওই গুজব টেকনিক কাজে লেগেছে। আধুনিক সময়ে গুজব ছড়াতে সিনেমার মতো শক্তিশালী মাধ্যম আর কী আছে!

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে, বিজেপির সংস্কৃতিতে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় বেছে নেওয়া হয়েছে অপর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জনমনে ঘৃণার জন্ম দিতে। তার প্রত্যেকটি আপনি পাবেন কাশ্মীর ফাইলস বা কেরালা স্টোরির মতো প্রোপাগান্ডা ফিল্মে।

বিজেপির শত্রু ঘায়েলের কিছু প্রিয় বিষয় রয়েছে। যা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের মনে অল্পবিস্তর থাকলেও খুব স্পষ্ট নয়। যেমন লাভ জিহাদ। মুসলিম জনসংখ্যার বাড়বাড়ন্ত। কাশ্মীর কেন বিশেষ সুবিধা ভোগ করবে! কেন সেখানে অন্য প্রদেশের লোকে জমি কিনতে পারবে না! এই বিষয়গুলো নিয়েই তৈরি হচ্ছে একের পর এক ডকুমেন্টারি ও ফিচার ফিল্ম। সব কটিই সরকারি মদদে। কাশ্মীর ফাইলস বলুন কিংবা হালের কেরালা স্টোরি, বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে তার প্রদর্শনে ট্যাক্স মওকুফ করা হয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী থেকে ক্ষমতার প্রভাবশালী অংশ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন ছবিটির। একদিক দিয়ে হিন্দুত্ববাদী দর্শনের সেলুলয়েড ভার্সন এই ছবিগুলো।

বিজেপির কাজকে সমর্থন জোগানো এসব ফিল্মের উদ্দেশ্য। বিজেপি আরবান নকশাল বলে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের জেলে পুরছে, আপনি যদি আপত্তি তোলেন, তাই বিষয়টি জাস্টিফাই করতে নির্মিত হয়, বুদ্ধ ইন দ্য ট্রাফিক জ্যাম। ৩৭০ ধারা কেন বাতিল হবে তার সমর্থনে কাশ্মীর ফাইলস। আর বিভিন্ন রাজ্যে লাভ জেহাদের বিরুদ্ধে সংঘ বাহিনী লেঠেলের ভূমিকা নিয়ে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে বাধ্য হয়ে তাই এই চতুরতার কেরালা স্টোরি। যাতে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়া সহজ হয়। কাশ্মীরের ৩৭০ তো বাতিল হয়ে গেছে। জমি কেনা কঠিন নয়। জিজ্ঞেস করুন, হিমাচল প্রদেশের ৩৭১ বাতিল হয়েছে কি না! সেখানে সব জায়গায় জমি কেনা অন্য রাজ্যের লোকের পক্ষে বেআইনি নয় তো!

কেরালা স্টোরি নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। সিনেমা কেমন হয়েছে! ক্যামেরা কেমন! এডিটিং, সাউন্ড এসব গৌণ। একটা ছবির টিজারে লেখা ছিল ৩২ হাজারের বেশি মেয়েকে ধর্মান্তরিত করে অন্য দেশে নিয়ে গিয়ে সন্ত্রাসবাদী করা হয়েছে। পরিচালক, প্রোডিউসারের কাছে কোর্ট খবরের সূত্র জানতে চাইলে তারা ভুল স্বীকার করে জানিয়ে দেয় যে, বত্রিশ হাজার হবে না। ওটা তিন হবে। কেরালার একাধিক সংগঠন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে জানিয়ে দিয়েছে, একটা কেস প্রমাণ যে করতে পারবে তাকে কোটি টাকা দেওয়া হবে। এখনো পর্যন্ত কেউই পরিচালকের পক্ষে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। ২০২৪ যত এগোবে তত বিজেপির ব্যর্থতা ঢাকতে আরও বেশি বেশি এ ধরনের গোয়েবলসীয় সিনেমা হলে অবাক হব না।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar27@gmail.com