যে মানুষটি ঘুমিয়ে থাকা স্বদেশবাসীর উপলব্ধির দেয়ালে প্রবল করাঘাত করে তাদের জাগিয়েছিলেন, প্রবল ক্ষোভে লোপাট করতে চেয়েছিলেন ‘শিকল পূজার পাষাণ-বেদী’, সেই মানুষটিই লিখেছিলেনহে মোর রাণী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে, আমার বিজয়কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।’ যিনি ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া’ বিশ্ব-বিধাত্রীর চির-বিস্ময় হয়ে মহাকাশে উত্থিত হতে চেয়েছিলেন সেই তিনিই পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিকের প্রতিভূ হয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ‘প্রতি তরুণীর ঠোঁটে! প্রকাশ গোপন/যে কেহ প্রিয়ারে তার চুম্বিয়াছে ঘুম-ভাঙা রাতে/রাত্রি-জাগা তন্দ্রা-ঘুম পাওয়া প্রাতে/সকলের সাথে আমি চুমিয়াছি তোমা’/সকলের ঠোঁটে যেন হে নিখিল-প্রিয়া-প্রিয়তমা!’ তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। এক হাতে বাঁশের বাঁশরী, অন্য হাতে রণতূর্য নিয়ে বাঙালির চেতনার দুয়ারে নিরন্তর দন্ডায়মান এক বিপ্লবী প্রেমিক।
প্রেমিক না বিপ্লবী? দাঁড়িপাল্লায় তুললে কোন দিকটি ভারী হবে? সে বিতর্ক একপাশে রেখে নজরুলের জীবন ও কবিতাকে যদি সাক্ষ্য মানি, তবে ‘বিদ্রোহী’র তুলনায় ‘প্রেমিক’ সত্তাটি এতটুকু ঊন হবে না। বস্তুত নজরুলের বিদ্রোহের মধ্যেও জেগে আছে প্রেম, আর প্রেমের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অভিমানী এক বিদ্রোহী। তার জীবনে প্রেম এসেছে বারবার। যদিও বহুলশ্রুত, তবু নজরুলের জীবনের প্রেমের তিনটি অধ্যায়ে আরেকবার চোখ বুলানো যাক।
১৯২১-এর মার্চ। বন্ধুবর আলী আকবর খানের সঙ্গে কুমিল্লায় বেড়াতে আসেন নজরুল। এই কুমিল্লাই নজরুলের জীবনে যুক্ত করল প্রমীলা ও নার্গিসকে। নার্গিস আলী আকবর খানের ভাগ্নি, অন্যদিকে নজরুল কুমিল্লা শহরে যার বাড়িতে আতিথ্য নিয়েছিলেন সেই ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রমীলা। কাকতালীয়ভাবে, প্রমীলা ও নার্গিস দুজনেরই পিতা প্রয়াত, দুজনেই নিজ নিজ মায়ের আদরে-শাসনে প্রতিপালিত। ভবিতব্য ঠিক করে রেখেছিল, নার্গিস ও প্রমীলা দুজনেই নজরুলের স্ত্রী হবেন। তবে প্রমীলা পাবেন স্ত্রীর পূর্ণ মর্যাদা, হবেন নজরুলের সন্তানের মা, আর নার্গিস পাবেন অবহেলা, অসম্মান এবং দীর্ঘ বিরহের জ্বালা।
আলী আকবর খানের প্রবল আগ্রহ এবং প্রত্যক্ষ উদ্যোগে নার্গিসের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন নজরুল। ইতিহাসখ্যাত সে বিয়ে এক রাতও টেকেনি। দৌলতপুর ছেড়ে স্ত্রী নার্গিসকে কোথাও নেওয়া যাবে না কাবিননামায় এই শর্তের কারণে প্রেমিক নজরুলকে ছাপিয়ে বিদ্রোহী নজরুল প্রবল হয়ে উঠলেন। কনেপক্ষের কাকুতি মিনতি উপেক্ষা করে বিয়ের আসর থেকে উঠে এলেন। কখনোই আর ফিরে আসেননি। সতেরো বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফের বিয়ে করেন নার্গিস। ১৯৩৭ সালে, নিজের দ্বিতীয় বিয়ের প্রাক্কালে হঠাৎ নজরুলকে আবার চিঠি লিখলেন তিনি। সে চিঠি নজরুল সংরক্ষণ করেননি। তবে উত্তর দিয়েছিলেন। নার্গিসকে লেখা তার প্রথম ও শেষ চিঠি। ১৯৩৭-এর ১ জুলাই কলকাতা থেকে নার্গিসকে লেখা সেই চিঠির শেষে নজরুল বললেন, ‘আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়ছি তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি।’ চিঠির শেষে বলেছেন, ‘...আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষ রশ্মি ধরে ভাঁটার স্রোতে, তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করো না। তোমাকে লেখা এই প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। যেখানেই থাকি, বিশ্বাস করো, আমার অক্ষয় আশীর্বাদী কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখী হও, শান্তি পাওএই প্রার্থনা। আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস করো, আমি তত মন্দ নই এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ!’
কী পরিহাস, নজরুল তথা প্রিয় নুরুদার বিয়েতে মা বিরজাসুন্দরীসহ আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে যোগ দিয়েছিল ত্রয়োদশবর্ষীয়া দুলিও। স্বপ্নেও কি ভেবেছিল, তিন বছর না গড়াতেই নুরুদার সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধতে হবে? প্রমীলা ও নজরুলের দাম্পত্য জীবন দীর্ঘ হয়েছিল; অবসান ঘটেছিল ১৯৬৭ সালে প্রমীলার মৃত্যুতে। এর বহু আগে, ১৯৩৯ সালে পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়েছিলেন তিনি, বছর তিনেক পর নজরুলও বাকহারা হলেন চিরজীবনের জন্য। প্রমীলার অসুস্থাবস্থায় নজরুল এবং নজরুলের অসুস্থাবস্থায় শয্যাশায়ী হয়েও সেবা ও যত্নের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন প্রমীলা। এ থেকে স্পষ্ট, উভয়ের প্রতি উভয়ের শ্রদ্ধাবোধ ছিল গভীর। প্রেম? সে-ও ছিল নিশ্চয়ই; যদিও সংসারের ভারে পরবর্তী জীবনে আবেগের চেয়ে দায়িত্বই বড় হয়ে উঠেছিল বলে প্রতীয়মান হয়। প্রমীলার অসুস্থতার সময় স্ত্রীর জন্য নজরুলের আকুলতা, তার চিকিৎসায় আত্মনিবেদন ইত্যাদি পত্নিপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তন্ত্রমন্ত্র, ঝাঁড়ফুক ইত্যাদি নানা অপচিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমেও তিনি চেষ্টা করেছেন স্ত্রীকে সুস্থ করে তুলতে; যদিও তাতে কোনো কাজ হয়নি। নার্গিস অধ্যায়ের চরম মানসিক বিপর্যয়ের পর শান্ত, স্থির প্রমীলা নজরুলের জীবনে স্থৈর্য এনেছিলেন। ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে অম্লান প্রদীপের মতো জেগে থেকে নজরুলকে দিয়েছিলেন গার্হস্থ্য শান্তি।
তবে পতিভক্ত স্ত্রী কিংবা সংসারের টানকোনোকিছুই প্রেমিক নজরুলকে পুনর্বার প্রেমে পড়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি। ১৯২৭ সালে ঢাকার বন্ধুদের আমন্ত্রণে নজরুল আড়াই মাস ঢাকায় ছিলেন। সে সময়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। প্রথম দেখাতেই নজরুল ফজিলাতুন্নেসার প্রতি প্রবল অনুরাগ বোধ করেন। নিজের সবটুকু আকর্ষণী ক্ষমতা দিয়ে ভালোবাসার মানুষটির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সব চেষ্টাই ফজিলাতুন্নেসার নির্বিকারতার দেয়ালে প্রতিহত হয়ে ফিরে এসেছে। নার্গিসের প্রতি যে নির্মম অবহেলা দেখিয়েছিলেন হয়তো প্রকৃতিই সেটি ফজিলাতুন্নেসার মাধ্যমে সুদে-আসলে ফিরিয়ে দিল তাকে। বেদনার্ত নজরুল ফজিলাতুন্নেসাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘সুন্দর কঠিন তুমি পরশ-পাথর, তোমার পরশ লভি হইনু সুন্দর/তুমি তাহা জানিলে না।’ এ সময় প্রিয় বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনকে লেখা একাধিক চিঠিতে প্রেমিক নজরুলের আহত হৃদয়ের আকুলতা ফুটে উঠেছে। ১৯২৮-এর ৮ মার্চ কলকাতা থেকে কাজী মোতাহার হোসেনকে লেখা এক চিঠিতে দুঃখ করে বলেছেন, ‘যেদিন আমি ঐ দূর তারার দেশে চলে যাবসেদিন তাকে বলো, এই চিঠি দেখিয়েসে যেন দুটি ফোঁটা অশ্রুর তর্পণ দেয় শুধু আমার নামে! হয়তো আমি সেদিন খুশিতে উল্কা ফুল হয়ে তার নোটন খোঁপায় ঝ’রে পড়ব।’ ১৯২৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে চলে যান ফজিলাতুন্নেসা। ফিরে এসে নজরুলের সঙ্গে আর যোগাযোগ রক্ষা করেননি। নজরুলের জীবনের আরেক প্রগাঢ় প্রেমকথার এভাবেই বেদনাদায়ক সমাপ্তি ঘটে।
প্রেমিক নজরুলের দিকে যদি তাকাই, অন্য সব বৈশিষ্ট্য ছাড়িয়ে একটি বৈশিষ্ট্যই প্রবল হয়ে ওঠে, তা হলো আবেগের প্রাবল্য। আদর্শ প্রেমিকের কুললক্ষণও কিন্তু তা-ই। প্রতিটি প্রেমই যেন সেই দুখ-জাগানিয়া বাঁশির সুর হয়ে এসেছে নজরুলের জীবনে। কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে লেখা চিঠিতে বলেছিলেন, ‘... আজ ডুবেছি, বন্ধু! একেবারে নাগালের অতলতায়। ভাসে যারা, তাদের কূল মেলা বিচিত্র নয়। কিন্তু যে ডোবে, তার আর উঠবার কোনো ভরসা রইল না।’ বোঝা যায়, প্রেম-দরিয়ায় এই অসহায় নিমজ্জন কবিকে ব্যাকুল করে তুলেছিল বটে, তবে সেই ব্যাকুলতার মধ্যেও ছিল এক ধরনের আনন্দযে আনন্দের স্বাদ কেবল প্রকৃত প্রেমিকই জানেন। বস্তুত কেবল প্রেমেই নয়, জীবনভর সব কাজে মস্তিষ্ক ও হৃদয়এ দু’য়ের দ্বন্দ্বে হৃদয়কেই প্রাধান্য দিয়েছেন নজরুল। যতদিন চেতন ছিলেন, আবেগকেই দিবারাত্রির সঙ্গী করে রেখেছেন। জীবনের প্রথম পর্যায়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে যে রোমান্টিক কবির জন্ম হয়েছিল, কালের পরিক্রমায় তিনি ক্রমশ স্থিতপ্রাজ্ঞ এবং গভীরতাসন্ধানী হয়েছেন। প্রেমের সূক্ষাতিসূক্ষ অনুভূতি আর বহুমাত্রিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। যত সময় গেছে, কোনো বিশেষ মানবী নয়, জীবন ও প্রকৃতির বৃহত্তর পরিসরে ক্রমবিস্তৃত হয়েছে কবির আবেগি সত্তা। রোমান্টিক বিষন্নতার এক অনুভূতি তাড়া করেছে তাকে। মানুষ, প্রকৃতি, মহাবিশ্ব সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে দিয়েছেন। জীবনের যত না পাওয়া, পেয়ে হারানোর বেদনা আর প্রতিদানহীন ভালোবাসা কবিকে ক্রমশ বিষন্ন করে তুলেছে। হয়তো সেই অভিমান থেকেই চিরস্তব্ধ হওয়ার কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ‘আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম। সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।’
যেন এক ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ভর করেছিল নজরুলের ওপর, সেজন্যই এমন নিখুঁতভাবে দেখতে পেয়েছিলেন সামনের দিনগুলোকে। বস্তুত এ-ও ছিল এক অভিমানী প্রেমিকের কণ্ঠস্বর। নজরুলের জীবন, সৃষ্টি ও সত্তার মধ্যে যে কণ্ঠস্বর চিরঞ্জীব অগ্নিশিখার মতো সতত দীপ্যমান।
কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও অনুবাদক
সূত্র:
১। নজরুল জীবনে প্রেমের এক অধ্যায়। সৈয়দ আলী আশরাফ (সম্পা.)। বাংলা সাহিত্য বিভাগ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৬৭
২। কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃষ্টি। রফিকুল ইসলাম। কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানি, কলকাতা। ১৯৯১
৩। নজরুল জীবনী। অরুণকুমার বসু। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা। ২০০০