অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে!

উন্নয়নশীল এবং উন্নত, সব ধরনের সমাজেই বৈষম্য থাকে। এর ফলে তৈরি হয় মূল্যবোধের ঘাটতি। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণের দায়িত্ব সরকারের। একটি সমাজে বৈষম্য কমানোর জন্য, সরকারের নির্দিষ্ট কিছু পলিসি থাকে। সেই পলিসি অনুসরণ করেই ভারসাম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এটা এই কারণেই করা হয়, না হলে অপরাধ ও দুর্নীতিও একই হারে বাড়তে থাকবে যা কোনো সরকারেরই কাম্য না। একইসঙ্গে সামাজিক অস্থিরতার ফলে, সরকারের মধ্যেই তৈরি হয় এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতা। ভেঙে পড়ে চেইন অব কমান্ড। তখন সেই সমাজ পরিণত হয় অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে।

একটি সমাজে আয়ের তুলনায় বৈষম্য যখন লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই জনগণের মধ্যে তৈরি হয়, অসন্তোষ। সেই অসন্তোষের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে যাওয়ার আগেই, উদ্যোগী হতে হয় সরকারকে। সেখানে ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নেই। যখন আয়ের তুলনায় সম্পদ বৈষম্য দ্বিগুণ হয়ে যায়- তখন বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে, সরকারের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা দরকার।

দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে- সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন- যে দেশের আয় যত বেশি বাড়ে, সে দেশের সম্পদ কর আহরণ তত বেশি বাড়ে। বাংলাদেশের সম্পদ কর আহরণ জিডিপির শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১ শতাংশ জিডিপি বাড়লে সম্পদ কর শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ বাড়ার কথা। সেই আয় ও মূল্যস্ফীতি মিলিয়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় বছরে ৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তি সম্পদ কর আসার কথা ছিল। কিন্তু তা আসছে না। তিনি আরও জানাচ্ছেন- বাংলাদেশে আয় বেড়েছে দ্বিগুণ, একই সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে। কিন্তু দেখার বিষয়, আয় বৈষম্যের চেয়ে সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। আয় বৈষম্য ১.৪ শতাংশ বেড়ে থাকলে সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে ৩ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ সম্পদের বৈষম্য ক্রমান্বয়ে ঘনীভূত হচ্ছে ও বৈষম্য কয়েকগুণ হারে বাড়ছে।

জমি, বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কর আরোপ হচ্ছে না। এখানে বৈষম্য রয়েছে। জমির ওপর বিনিয়োগ বাড়ছে, কারণ জমির দাম অস্বাভাবিক হারে  বাড়ছে। এটার বড় কারণ এই বিনিয়োগে বড় ধরনের কর দিতে হয় না। সোজা কথায় এর অর্থ দাঁড়ায়, মধ্যবিত্তকে প্রত্যক্ষ করের আওতায় আরও কীভাবে নিয়ে আসা যায়- সেই পথ খুলে দেওয়া। এর মানে হচ্ছে-  যারা জমি-বাড়ির মালিক, তারা কর প্রদানের ক্ষেত্রে গড়িমসি করলেও, কোনোভাবেই যেন মধ্যবিত্ত কর প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় না পায়। বিষয়টা কি তাই!

আসলে ট্যাক্স পদ্ধতির মধ্যে শহর-গ্রাম অথবা ধনী-গরিবের মধ্যে যে পাহাড়সম বৈষম্য রয়েছে, তার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আসা জরুরি। আমরা জানি, জিডিপির পরিমাণ বাড়লে এমনিতেই কর আদায় বাড়ে। একইসঙ্গে বাড়তে থাকে কর্মসংস্থান। কিন্তু বর্তমানে সমাজের চিত্র পুরোপুরি উল্টো! এই উল্টো প্রতিবিম্বকে সোজা করার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তাদের ব্যর্থতা জনগণের কাঁধে চাপানোর কোনো সুযোগ নেই।

কিছু আমলা দুর্নীতিবাজ, কিছু ব্যবসায়ী দুর্নীতিবাজ, কিছু সরকারি কর্মচারী দুর্নীতিবাজ আবার কিছু রাজনীতিবিদও দুর্নীতিবাজ। তাহলে আর বাকি থাকল কী- সাধারণ জনগণ? খুব স্বাভাবিকভাবেই, ঘুরেফিরে সব বোঝা সেই পাবলিকের ঘাড়েই।

এইভাবে সম্পদ বৈষম্য যদি বাড়তে থাকে, মনে রাখতে হবে- উল্টো দিকে অন্য কিছু বাড়বে। ফলে সময় থাকতেই, অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বরেণ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বসে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। কর্মসংস্থানহীন, করহীন সমাজব্যবস্থায় স্থিতিশীল কোনো কর্মযজ্ঞই শেষ পর্যন্ত আর স্থিতিশীল থাকে না। বিষয়টি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন, ততই মঙ্গল। বাংলাদেশে আয়ের তুলনায় সম্পদ বৈষম্য কমে আসবে- এটাই কাম্য।