সেই ২০০৬ সাল থেকে বাফুফের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন গোলাম রব্বানী ছোটন। ২০০৯ সালে মেয়ে ফুটবলের দায়িত্ব নেন। এরপর কঠোর পরিশ্রমে এই কোচ এনে দেন একের পর এক সাফল্য। নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রার অন্যতম নায়ক গতকাল দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দের কাছে
ছোটন বলেছেন অনেক চেপে রাখা কথা।
হুট করেই দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত কী কারণে?
গোলাম রব্বানী ছোটন : প্রথমত, সাত-আট বছর অনেক টুর্নামেন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে। বয়সভিত্তিক দলগুলো থেকে শুরু করে জাতীয় দলের দায়িত্ব পালন করায় অনেক শারীরিক ও মানসিক চাপ পোহাতে হয়েছে। পরিবার, বন্ধুবান্ধবকে কোনো সময় দিতে পারিনি। ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু ছিল না। কাজের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি জবাবদিহিও বেড়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব ক্লান্ত।
মেয়েদের ফুটবলের জাগরণ তো আপনার হাত দিয়ে...
ছোটন : এটা হয়তো আপনারা মনে করেন, আমি মনে করি না। এটা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হয়েছে। ফেডারেশন সমর্থন দিয়েছে, আপনারা (মিডিয়া) সমর্থন দিয়েছেন। আমার একক কোনো অবদান নেই।
জবাবদিহির কথা বললেন। প্রধান কোচ হিসেবে আপনাকে কেন এত জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে?
ছোটন : আমাকে অনেকের কাছেই জবাবদিহি করতে হয়। উইমেন্স উইঙ্গস তো আছেই, আমাদের ঊর্ধ্বতনদের কাছে পদে পদে জবাবদিহি করতে হয়; বিশেষ করে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলির কাছে। প্রতিনিয়ত উনি দোষ ধরেন। বলেন, এটা হচ্ছে না, সেটা হচ্ছে না। বাফুফে ভবনের কারও কাছেই আমাদের কোনো দাম নেই।
এত কিছু ‘হচ্ছে না’র মধ্যেই তো অসংখ্য সাফল্য এসেছে আপনার হাত ধরে...
ছোটন : একটা কথাই বলতে পারি, আমরা চেষ্টার কোনো কমতি রাখিনি। কাজের ব্যাপারে সব সময় সৎ ছিলাম। ভোর ৪টা থেকে শুরু করে সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। কাজ করেছি সততার সঙ্গে। সাধ্যের পুরোটাই দিয়েছি।
মেয়েরা সাফ জয়ের পর বলা হয়েছিল, তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়বে, খেলার সুযোগ বাড়বে। আপনাদেরও সুযোগ-সুবিধা বাড়বে। আসল চিত্রটা কী?
ছোটন : যতটুকু বাড়া উচিত ছিল, ততটুকু বাড়েনি। সাফের পর আট মাস মেয়েরা একটা ম্যাচও খেলার সুযোগ পায়নি। সাফে যারা আমাদের মূল প্রতিপক্ষÑ সেই ভারত, নেপাল প্রতিনিয়ত ম্যাচ খেলছে। নিজেরা খেলার সুযোগ না পাওয়ায় এবং অন্যদের প্রতিনিয়ত খেলতে দেখে আমাদের মেয়েদের হতাশা গ্রাস করছে। এ কারণেই মেয়েরা একে একে খেলা ছেড়ে দিচ্ছে।
মেয়েদের অবসরের কি এটাই একমাত্র কারণ?
ছোটন : খেলার সুযোগ তারা পাচ্ছে না। অথচ ক্যাম্পে তাদের পুরোদস্তুর ট্রেনিং করতে হচ্ছে। কবে খেলার সুযোগ পাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হবে বলে মেয়েরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল, সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। কিসের আশায় মেয়েরা খেলা চালিয়ে যাবে?
এই মেয়েগুলোকে তো আপনিই গড়ে তুলেছেন।
এদের নিয়মিত খেলাতে না পারাটা আপনাকেও নিশ্চয় কষ্ট দেয়?
ছোটন : সিনিয়ররা স্বপ্ন দেখেছিল ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলে কিছু টাকা অর্জন করবে, সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। ওদের মুখের দিকে তাকানো যায় না। কোচ হিসেবে আমারও তো কিছু করার নেই।
আপনি সেই ২০০৯ থেকে মেয়েদের ফুটবলের সঙ্গে ছিলেন। আপনার কী মনে হয় বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবল যেভাবে চলছে, এভাবে আরও বড় মঞ্চে ভালো করা সম্ভব?
ছোটন : নেপালের মতো দেশে শত শত ফুটবল একাডেমি। বাংলাদেশে কিন্তু অনেক মেয়ে এখন ফুটবল খেলছে। তাই ৮ বিভাগে ৮টা একাডেমি থাকা ভীষণ জরুরি। এসব জায়গায় উন্নতির কোনো বিকল্প নেই।
কাজের মূল্যায়ন হয়নি বলেই কি সরে যাওয়া?
ছোটন : আমি ব্যাপারটাকে দুইভাবে দেখি। একজন হয়তো তার দৃষ্টিতে বলেছেন, মেয়েদের ফুটবল উন্নয়নে আমাদের কোনো অবদান নেই। আবার সারা দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিন্তু আমাদের অনুপ্রাণিত করছেন, আমাদের অবদানের কথা বলেন, জানেন। মূল্যায়নের কথা বাদ দিন, আমরা কাজে কোনো ঘাটতি রাখিনি। সেই ভোর ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিরামহীন এই মেয়েদের পেছনে শ্রম দিয়েছে। আমার কথা বাদ দিন, লিটু, অনরা (দুই সহকারী কোচ) ২৪ ঘণ্টা ক্যাম্পে এতগুলো মেয়েকে দেখে রাখে। এদের অবদান কীভাবে ভুলবেন? মা-বাবারা তাদের দুইটা মেয়েকেও ঠিকঠাক দেখে রাখতে পারেন না। আর আমাদের যে বছরের পর বছর ৭০ জন মেয়েকে দেখে রাখতে হচ্ছে, তাদের নানা সমস্যার সমাধান দিতে হচ্ছে, আমাদের এই কাজের মূল্যায়ন কি কেউ করেছে?
আপনার হাত ধরে মেয়েদের সব পর্যায়ের অসংখ্য সাফল্য এসেছে। সেই ২০১৫ অনূর্ধ্ব-১৪ রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা দিয়ে শুরু। গত বছর মেয়েরা সিনিয়র সাফে জিতেছে। সামনেও আরও অনেক খেলা। এত কিছু রেখে সরে যাচ্ছেন। খারাপ লাগছে না?
ছোটন : সত্যি বললে, আমার কোনো খারাপ লাগছে না। কারণ এখানে আমার চেয়ে অনেক যোগ্য লোক আছেন। তারা নিশ্চয় আমার চেয়েও আরও অনেক ভালো করবেন। এখন আমাকে শুরু করতে হবে শূন্য থেকে। আমি কাজের ব্যাপারে সৎ ও পরিশ্রমী। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি না। কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে কোনো ক্লাব চাইলে কাজ করব। আরেকটা ব্যাপার হলো, আমি কখনোই যেটা ছেড়ে আসি, সেটা নিয়ে ভাবি না, আফসোস করি না। এটা আমার একটা গুণও বলতে পারেন, দোষও বলতে পারেন।
অনেক পরিবার, অনেক অভিভাবক আপনার দিকে তাকিয়ে তাদের মেয়েদের খেলতে পাঠিয়েছেন। তারাও তো ভীষণ হতাশ হবেন, কষ্ট পাবেন?
ছোটন : এত বছর আমাকে বিশ্বাস করার জন্য আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমাদের ওপর আস্থা রেখে এতগুলো মেয়েকে তারা আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। এটা অনেক কঠিন একটা জায়গা। তবে মনে হয় অনেক ভালোভাবেই আমরা মেয়েদের রাখতে পেরেছিলাম।