আত্মবিশ্বাসের শক্তি

অনেক মানুষ আফসোস করে বলেন, হায়! আমি যদি কোরআন মাজিদ হেফজ করতে পারতাম! আবার অনেকে কোনো কোরআনের মজলিসে ছোটা বাচ্চাদের কোরআন তেলাওয়াত দেখে অথবা কম বয়সী ছোট্ট হাফেজে কোরআনকে দেখে বলে, এতটুকু বাচ্চা কোরআন মুখস্থ করেছে? আহ্, আমি যদি তার মতো হতে পারতাম! আমি যদি কোরআন মাজিদ মুখস্থ করতে পারতাম! কিন্তু আমার হয় না, আমি পারি।

বলি, আরে ভাই! তুমি পারো এবং পারবে। বরং তোমার মনোবল দুর্বল, তোমার দুর্বল হিম্মত তোমাকে বসিয়ে রেখেছে। তুমিও তার মতো কাজ করতে পারবে। তুমিও মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতে পারবে এবং মানুষকে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করতে পারবে। তুমিও পারবে কোরআন মুখস্থ করতে, কিন্তু সমস্যা হলো মানুষের হিম্মত মানুষকে বসিয়ে রাখে। মানুষ যদি হিম্মত করে সামনে বাড়ে, তাহলে অবশ্যই তা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ (রা.) অন্ধ ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি তার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। এক রাতে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ও হজরত ওমর (রা.)-এর সঙ্গে বাইরে বের হলেন। অন্ধকার রাত, মানুষজন ঘুমিয়ে গেছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তার দুই সাথীকে নিয়ে মসজিদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় মসজিদের ভেতর থেকে কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পান। অন্ধকার রাতে মসজিদ থেকে কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তার পড়া শুনলেন। মসজিদের ভেতরে অন্ধসাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ (রা.) কোরআন তেলওয়াত করছেন।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, কোরআন যেভাবে নাজিল হয়েছে কেউ যদি সেভাবে তেলাওয়াত করতে চায়, তাহলে সে যেন আবদুল্লাহর মতো তেলাওয়াত করে। এরপর আবদুল্লাহ (রা.) কোরআন তেলাওয়াত শেষ করে দোয়া শুরু করলেন। তিনি জানেন না যে, নবী কারিম (সা.) তার তেলাওয়াত শুনেছেন এবং এখন তার দোয়াও শুনছেন। তিনি দোয়া করতে লাগলেন আর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি চাও তোমাকে দেওয়া হবে। তুমি চাও তোমাকে দেওয়া হবে। তুমি চাও তোমাকে দেওয়া হবে। অর্থাৎ তুমি আরও বেশি করে চাও, আল্লাহতায়ালা তোমাকে দেবেন। তোমার দোয়া কবুল করবেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ (রা.) বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর এক যুদ্ধের সময় আবদুল্লাহ (রা.) বললেন, আমি তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধে যেতে চাই। লোকেরা বলল, তুমি উজরগ্রস্ত (অসুস্থ); মহান আল্লাহ তোমার সমস্যা গ্রহণ করবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘অন্ধের জন্যে, খঞ্জের জন্যে এবং অসুস্থ ব্যক্তির জন্যে কোনো অপরাধ নাই।’ সুরা নূর : ৬১

কিন্তু তিনি বললেন, আমি যুদ্ধে যেতে চাই। সুতরাং তোমরা আমাকে যুদ্ধের একটি পতাকা দাও। আমি পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব, আমি অন্ধ মানুষ; পালাতে চাইলেও পালাতে পারব না। ময়দানে মুসলমানদের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। মানুষ যুদ্ধ করবে এবং পতাকা দেখে একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করবে। আমাকে যুদ্ধের পতাকা দিলে অন্য একজন দৃষ্টিসম্পন্ন মুজাহিদ স্বাচ্ছন্দ্যে কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারবে। অতঃপর তিনি তাদের সঙ্গে জেহাদে বের হলেন এবং জেহাদের পতাকা নিয়ে সুদঢ় পর্বতের ন্যায় ময়দানে অটল রইলেন। মুজাহিদরা যখন যুদ্ধ করতে করতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, তখন তাকে দেখে আবার একত্রিত হতো। তিনি পতাকা হতে একটা তীর বা তরবারির আঘাতের অপেক্ষা করছিলেন। এভাবে এক সময় তিনি শহাদাত বরণ করলেন। অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও জেহাদের পতাকা বহন করে তিনি শহীদ হলেন। সুবহানাল্লাহ!

দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন, শ্রবণশক্তিসম্পন্ন, হাঁটা-চলা ও নড়া-চড়া করার শক্তিসম্পন্ন লোকদের কোনো উজর নেই। অবহেলাকরীদের জন্যে কোনো উজর নেই। আল্লাহতায়ালা আমাদের যাকে যে শক্তি দিয়েছেন, প্রত্যেককে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। বাকশক্তিসম্পন্ন লোককে প্রশ্ন করবেন, কেননা তুমি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকনি? কেননা তুমি সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করনি? হাঁটা ও চলাফেরা করার শক্তিসম্পন্ন লোককে প্রশ্ন করবেন, কেন তুমি মসজিদে যাওনি এবং আল্লাহর আনুগত্যের কাজে তোমার পাকে ব্যবহার করনি? অর্থাৎ প্রতিটি সক্ষম লোককেই তার সক্ষমতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। আল্লাহতায়ালা বলবেন, ‘আমি তোমাকে যে শক্তি দান করেছিলাম, তুমি তাকে কোন কাজে ব্যয় করেছ?’

দুনিয়ায় অসংখ্য প্রতিবন্ধী লোক রয়েছে, যারা জীবনের অনেক চাহিদাই পূরণ করতে পারে না। তার সত্ত্বেও তাদের একটা কর্মের দাগ রয়ে যাচ্ছে দুনিয়ায় এমন অনেক নজির রয়েছে। তাহলে যাদের শক্তি আছে, সামর্থ্য আছে তাদের জীবনের কী পরিমাণ প্রভাব ও ফল থাকা দরকার? বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, শিক্ষক-ছাত্র, ইমাম-মুয়াজ্জিন, শ্রমিক-চাকরিজীবী সবারই তাদের জীবনের একটা প্রভাব রেখে যাওয়ার কামনা করা উচিত। যার যে শক্তি ও সক্ষমতা আছে তাই দীনের সাহায্যে, নিজের ও উম্মাহর উপকারে ব্যয় করা উচিত। বান্দার জীবনের ছাপ ও ফল মহান রবের কাছে বাকি থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমিই মৃতদের জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করি। আমি প্রত্যেক বস্তু সুস্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছে।’ সুরা ইয়াসিন : ১১

মানুষের মধ্যে এমন মানুষ রয়েছে, যারা মৃত্যুবরণ করে আর তাদের নেক আমল বাকি থাকে এবং বদ আমলগুলো তাদের সঙ্গেই মৃত্যুবরণ করে। আবার এমন মানুষও রয়েছে, তারা যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তাদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নেক আমলগুলোও মৃত্যুবরণ করে। আবার কারও কারও বদ আমলগুলো বাকি থাকে অর্থাৎ যারা খারাপ কিছু রেখে যায়। যার কারণে অন্য মানুষ আল্লাহর নাফরমানি করে। এটা এমন একটি মাসয়ালা যে বিষয়ে সবারই সতর্ক থাকা উচিত। মানুষের নেক আমল বাকি থাকার কারণে তারা যেমন প্রতিদান পাবে, অনুরূপভাবে বদ আমল বাকি থাকার কারণেও প্রতিদান পাবে। সুতরাং আমাদেরকে খারাপ কাজের চাবিকাঠি হওয়ার পরিবর্তে নেক কাজের মাধ্যম হতে হবে। গভীর আত্মবিশ^াসের সঙ্গে সামনের পথে এগিয়ে যেতে হবে।