শিক্ষার প্রাথমিক ঘাটতি

প্রাথমিক শিক্ষায় চলছে চরম অব্যবস্থাপনা। শুধু শিশুদের ভর্তিই করা হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষা নিশ্চিতের কোনো উদ্যোগ নেই। প্রাথমিকের এই অরাজকতা বন্ধে কোনো কর্মসূচিও নেওয়া হয়নি। এমন উন্নাসিকতা শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে নয়, সমাজের বিভিন্ন সেক্টরে দৃশ্যমান। কেন এমন হচ্ছে, সেই চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। অসম্ভব দায়িত্বহীনতা এবং দীনতা গ্রাস করছে চারদিক। কোনো জবাবদিহি না থাকার কারণে, স্বেচ্ছাচারিতার চরম পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন শুভ উদ্যোগ। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। দেশ রূপান্তরে গতকাল প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, প্রায় শতভাগ শিশু ভর্তির আওতায় এসেছে অনেক আগে। এরপর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতের কাজ অনেকটাই আটকে আছে। খোদ সরকারি সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে প্রাথমিকে চরম দুরবস্থার কথা। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাক্সিক্ষত মানের চেয়ে শিশুরা অনেক পিছিয়ে। কিছু শিক্ষক এবং মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা স্ব-উদ্যোগে কাজ করার চেষ্টা করলেও কথায় কথায় তাদের ওপর নেমে আসছে শাস্তির খড়্গ। মানের উন্নয়ন না হলেও ঠিকই অধিদপ্তরে বসে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন কর্মকর্তারা। নানা অব্যবস্থাপনায় এগোচ্ছে না প্রাথমিক শিক্ষা।

গবেষণার তথ্য বলছে, করোনার আগে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে শিখন অর্জনের গড় হার ছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ। করোনাকালে বন্ধের প্রভাবে এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশ। একই শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ^পরিচয় বিষয়ে শিখন অর্জনের গড় হার ৫১ শতাংশের বেশি, যা আগে ছিল ৬৮ শতাংশের মতো। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা, গণিত ও বিজ্ঞানেও ক্ষতি বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষা দিন দিন পিছিয়ে পড়লেও সেদিকে তেমন নজর নেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের। তারা ব্যস্ত আছে লাখ লাখ শিক্ষক এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন নিয়ে। কেউ কথা বললেই তার ওপর নেমে আসছে শাস্তি। ফলে শিক্ষকরাও দিন দিন তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন; কোনো রকমে দিন পার করছেন।

এর মানে হচ্ছে, অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ভিন্ন বিষয়ে। যে বিষয়ে তাদের নগদ প্রাপ্তি হবে, সে বিষয়েই আগ্রহ প্রবল। যে কারণে বদলি-পদায়ন নিয়ে পার করছে সময়। অথচ মূল বিষয়ে কোনো ধরনের ভ্রƒক্ষেপ নেই! এই বন্ধ্যত্ব কীভাবে দূর করা যায়, কোন ধরনের কর্মসূচি প্রণয়ন করা দরকার শিশুদের জন্য সে ব্যাপারে নেই কোনো ধরনের আগ্রহ এবং উদ্যোগ।

প্রকাশিত সংবাদে যে বিষয়টি উদ্বেগের তা হলো করোনাকালে বন্ধ থাকা প্রাথমিক শিক্ষা চালু রাখতে কিছু শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা স্ব-উদ্যোগে কিছু অনলাইন প্ল্যাটফরম চালু করেন; যাতে অনলাইন ক্লাস, শিক্ষকদের মধ্যে আলোচনাসহ নানা কাজ করা হয়। এতে প্রতিটি ফেসবুক গ্রুপে লাখ থেকে হাজারো শিক্ষক যুক্ত হয়েছেন। এখনো সেসব গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু সেই গ্রুপগুলোকেই এখন শায়েস্তা করার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের অজুহাত দেখিয়ে অনলাইনে যুক্ত থাকা অনেক শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাকেই দেওয়া হচ্ছে কারণ দর্শানো নোটিস (শোকজ)। সরকার যেখানে শিক্ষকদের ডিজিটালি আপডেট হওয়ার কথা বলছে, সেখানে প্রায় অনেকটাই উল্টোপথে হাঁটছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকা দরকার। এর পুরো দায় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের।  আসলে এই শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীরা কতটুকু আত্মস্থ করতে পারছে বা এজন্য আর কী করা প্রয়োজন, সে ব্যাপারে তেমন নজর নেই। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে ইচ্ছাতন্ত্রের বলি শিশুরা যেন না হয়। সেদিকে নজরদারি জরুরি।