‘উন্নয়নের দেড় দশক : স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’ এই শিরোনামের সেøাগানে উৎকলিত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈশ্বিক সংকট, ডলার সংকট, ব্যবসা-বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে মন্দা, জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ নানামুখী চাপ সঙ্গে করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে। জুনের ১ তারিখে এটি পেশ করা হলেও, বড়জোর তিন সপ্তাহ সময় মিলবে মোট ৪০ ঘণ্টা সংসদের ফ্লোরে, এ বাজেটের ওপর গতানুগতিক ও অনির্বচনীয় আলোচনার। তারপর কণ্ঠভোটে অর্থবিল পাস হবে ২৫ জুন এবং বাজেট ২৬ জুন। অনুধাবনীয় যে, শতবর্ষী ঔপনিবেশিক আয়কর আইন একবাক্যে নতুন আইন উপহার হিসেবে পাওয়ার আভাস মিলছে। আশা করা যায়, অতি গুরুত্বপূর্ণ আয়কর আইন যথাযথ জনমত যাচাই-বাছাইয়ের এবং আইন প্রণেতারা অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এটি গৃহীত হবে। আশঙ্কা থাকবে না এটি যেন ২০১২ সালের নতুন ভ্যাট আইনের মতো জন্মিয়াই মৃত্যুর অথবা আজীবন খোঁটা খাওয়ার ভাগ্য বরণ করবে না। জাতীয় নির্বাচনের বছরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চাঙ্গা করতে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের বিশাল বর্ণনা রয়েছে বাজেট বক্তৃতায়, যদিও পুরো বক্তৃতাটি পাঠের পরিবর্তে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। আত্মতৃপ্তির বিশাল বাজেট বক্তৃতাটি মিডিয়ায় হুবহু প্রকাশও করা সম্ভব নয় বিধায় গণ কর্ণকুহরে পৌঁছানো, কিংবা পাঠের সুযোগ ঘটেনি আমজনতার, যাদের জন্য এটি পেশ করা হয়েছে সংসদে। মিডিয়ার বদৌলতে বাজেটের ছিটেফোঁটা জানতে পারছে যারা, তারা সেই বিশাল নাগরিক সম্প্রদায়ের অতি খ-িত অংশ।
নয়া বাজেটের মোট আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। ডলার সংকট কাটাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর বিপরীতে দেওয়া শর্ত পরিপালন করতে গিয়ে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়াতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে জনজীবনে। ব্যাংক, আর্থিক ও রাজস্ব খাতে ব্যাপক সংস্কার আনতে হচ্ছে; প্রতি বছর ০.৫ শতাংশ হারে করদাতা বাড়াতে হবে। স্পষ্ট যে, বাজেটের অর্থের জোগান পেতে সরকার আগের চেয়ে বেশি ব্যাংকমুখী হবে। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকার চলতি অর্থবছরের চেয়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরে যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ চলতি বছরের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি বাড়বে। এটা সবার জানা যে, ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে তার প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে। কারণ, ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ টাকা ছাপিয়ে মেটাতে হয়। টাকা ছাপালে তখন বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায় এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এর ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় কর্মসংস্থান ব্যবস্থা। প্রতিবারই অর্থবছরের শেষ দিকে সরকারের ব্যাংকঋণ নেওয়া বাড়ে। বিশেষ করে জুন মাসে। চলতি অর্থবছরেও এর ব্যতিক্রম হবে না বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। আগের অর্থবছরে ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নিয়েছিল ১৩ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। একই সময়ে চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৩৯ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এদিকে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি প্রায় নেতিবাচক। অথচ চলতি অর্থবছরে ধরা হয়েছিল, এ খাত থেকে নিট ৩৫ হাজার কোটি টাকা আসবে। চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটে তারপরও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির নেতিবাচক চিত্রের কারণে জুন শেষে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
দেশে মূল্যস্ফীতির হার গত এপ্রিলে ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থবছর শুরুর দুই মাসের মাথায় গত আগস্টে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে উঠেছিল। যা হোক মূল্যস্ফীতি যেখানে গিয়ে ঠেকুক না কেন, অর্থের প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংকঋণের কোনো বিকল্প আগেও ছিল না, চলতি অর্থবছরেও নেই, আগামী অর্থবছরেও থাকবে না।
শুধু তাই নয়, আর মাত্র ছয় মাস পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বহুমুখী চাপের মুখে এ নির্বাচন সামনে রেখে জনগণকে সামান্য হলেও স্বস্তি দিতে চাওয়ার জন্য সামাজিক নিরাপত্তাসহ বহু রকম নির্বাচনী কর্মসূচি আছে এ বাজেটে। এ বছর যেখানে বিদ্যমান (ডিসেম্বর পর্যন্ত) এবং নবনির্বাচিত (জানুয়ারি-জুন) সরকার বাজেট বাস্তবায়নে থাকবে, এতসব প্রতিশ্রুত কর্মসূচি বাস্তবায়নের হালহকিকত কী দাঁড়াবে তা আমজনতার বোধগম্যের মধ্যে আসছে না।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার। এর মধ্যে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার। বিশাল আকারের রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে বাড়াতে হবে করের আওতা। করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনার সুষ্ঠু পরিকল্পনার পরিবর্তে নিম্নআয়ের মানুষকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনার সিদ্ধান্তটি হবে অযৌক্তিক।
আগামী অর্থবছরে সরকার দেশের উন্নয়নে ব্যয় করবে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় হবে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বহির্ভূত প্রকল্পে ব্যয় করবে ৭ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে ব্যয় হবে ২ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। বিভিন্ন স্কিমে ব্যয় করবে ৩ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা। আগামী বাজেটের রূপরেখায় সরকারের পরিচালনসহ অন্যান্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ বা ৬০ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকার বেশি। পরিচালন ব্যয়ের হিসাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ বাড়ছে ৩৫ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা; যা চলতি অর্থবছরের বাজেটে সংশোধিত জিডিপির চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির পরিমাণ রয়েছে ৪৪ লাখ ৩৯ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈশ্বিক সংকটেও এ উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশা করছে সরকার। যদিও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ উন্নয়ন সহযোগীরা বলছে, বৈশ্বিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আগের তুলনায় হ্রাস পাবে। মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ ধরে রাখার চেষ্টা : টানা প্রায় দেড় বছর ধরে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলেছে, যা এখন প্রায় ২ অঙ্কের ঘর ছুঁইছুঁই। মূল্যস্ফীতির এ চাপকে ৬ শতাংশে ধরে রাখার পরিকল্পনা উচ্চারিত হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। বাস্তব পরিস্থিতিতে তা কতখানি টেকসই হবে বলার সময়ই এখনো হয়নি।
মিডিয়ায় প্রশ্নটা বরাবরের ন্যায় আরও স্পষ্ট হতে হচ্ছে যে, সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লিখিত ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ’ সেই আপামর জনগণ অর্থাৎ আমজনতার আশা-অকাক্সক্ষা চাওয়া-পাওয়া দাবি-দাওয়া বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা। এ প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক যে, জাতীয় বাজেটের মধ্যে করোনা মোকাবিলার মতো, করোনায় বিধ্বস্ত ও কিয়েভ-ক্রেমলিন যুদ্ধের দ্বারা আহত অর্থনীতি গণস্বাস্থ্য জন-শিক্ষা পুনরুদ্ধারের মতো জরুরি বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েও পায়নি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে কিনা। প্রশ্ন এ কারণেও উঠতে পারে যে, জাতীয় বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ প্রকৃত প্রস্তাবে প্রয়োজনীয় খাতে (এ মুহূর্তে যেমন জীবন ও জীবিকা) যথাযথ (দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সহনীয়করণ, ব্যয় সাশ্রয়ী, অর্থায়ন আয় বৃদ্ধি ও কৃচ্ছ্র সাধন অর্থে ব্যয় সংকোচন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি-বেসরকারি খাত দল মত নির্বিশেষে ঐকবদ্ধভাবে সংকট মোকাবিলায়) ব্যবহৃত হবে কিনা, নতুন বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য সবাই পরামর্শ দিয়েছেন, দাবি তোলেন কিন্তু সেই বরাদ্দের বিপরীতে অর্থায়ন ও লক্ষভেদি বাস্তবায়নের পরিস্থিতি, সেই ব্যয়ের তাৎক্ষণিক, স্বল্প-মধ্য দীর্ঘমেয়াদি ইমপ্যাক্ট ও অভিঘাত সম্পর্কে অবহিত হওয়ার অবকাশ বরাবরই হালে পানি পায় না। সাধারণ সময় সেই অবকাশ কমবেশি দেরিতে মিললেও করোনা অভিঘাত ও বৈশি^ক প্রভাব মোকাবিলার মতো জরুরি সময়ে বরাদ্দ ব্যবহার এবং কর্মপরিকল্পনা প্রয়োগও জরুরি এ কারণে যে, ‘রোগী মারা যাওয়ার পর চিকিৎসকের উপস্থিতির’ মতো পরিস্থিতির যেন উদ্ভব না হয়। এটি এ জন্যও বিবেচিত যে, সবাই নতুন বাজেট আসার বা আনার সময় আলোচনা-পর্যালোচনা এমন কি মৃদুমন্দ সমালোচনা করেন, কিন্তু বাজেট পাস হওয়ার পর সারা বছর সেই বাজেট বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে, তাৎক্ষণিক করণীয় নিয়ে কোনো কথা তো হয়ই না, বরং বিনা বাক্যব্যয়ে সম্পূরক বাজেটে সারা বছরের অপব্যয়, অপচয়, অতিরিক্ত ব্যয়, আয়ে অপারগতা, ব্যয়ে বাড়াবাড়ি, তছরুপ-দুর্নীতি সবই গৃহীত হয়ে যায়। নির্বাচনের বছরের বাজেট গুণধারী হওয়ার চাইতে দৃশ্যধারী হওয়ার অবকাশ ছিল কি?
জীবন ও জীবিকার জন্য বাজেটকে জাতীয় বাজেট থেকে আলাদা অলিন্দে নয়, একীভূত হিসেবে দেখাই জরুরি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি খাতে অগ্রাধিকার ঘোষণা এবং কিঞ্চিৎ বরাদ্দ বাড়ালেই বাজেট জনগণের বাজেট বা ইতিবাচক হয় না, স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ালেই মহামারী মোকাবিলা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অটোমেটিক্যালি বাড়ে না, বিদেশি ঋণের টাকায় টিকা কেনা এবং ফ্রি বিতরণসহ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের সক্ষমতা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন বহাল থাকে, দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা-অপারগতায় আকীর্ণ থাকে এবং তা নিরসন নিয়ন্ত্রণে তথা জবাবদিহিকরণে ‘কথায় নয় কাজে’ অগ্রগতি না থাকে। বাজেটে বরাদ্দ বড় কথা নয়, অর্থনীতিতে সেই বরাদ্দের দ্বারা কতটা সম্পদ ও সেবা সৃষ্টি হলো, প্রভাব ফেলতে পারল সেটিই বড় কথা। বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা অক্ষমতা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকার পরিস্থিতি যথাসময়ে দেখভালের ব্যবস্থা না থাকলে সে বাজেট শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কৌশল হিসেবে পরিণতি লাভ করে। এ নিরীখেই কঠিন সময়ে কঠিন বাজেট মিলেছে।
লেখক: কলাম লেখক উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক
mazid.muhammad@gmail.com