লোভের ফাঁদ, রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও তারুণ্য

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩১ এএম

বর্তমান বিশে^র অন্যতম দ্রুত বিস্তার লাভ করা সাইবার অপরাধের একটি হলো অনলাইন জুয়া। স্মার্টফোন, মোবাইল ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছে। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া পরিচালনার অভিযোগে একাধিক চক্রকে আটক করেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব চক্র বিদেশি নাগরিক বা বিদেশভিত্তিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় কেবল আইন প্রয়োগ নয়, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, জনসচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন জুয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, অবৈধভাবে নিবন্ধিত মোবাইল সিমের ব্যবহার। বাংলাদেশে সিম নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) যাচাই বাধ্যতামূলক। তবে যদি কোনো অসাধু সিম বিক্রেতা গ্রাহকের অজ্ঞাতে তার পরিচয় ব্যবহার করে অতিরিক্ত সিম নিবন্ধন করে, তাহলে সেটি গুরুতর অপরাধ। সাইবার অপরাধের অন্যতম বড় একটি চক্র অবৈধ ও বেনামী সিম কার্ড ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া ও কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থপাচার পরিচালিত হচ্ছে। অপরাধীরা সাধারণ মানুষের অজান্তে বা ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সিম নিবন্ধন করে এবং সেগুলো জুয়ার সাইটের লেনদেনে ব্যবহার করে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু বিক্রেতা গ্রাহককে একটি সিম দিলেও তার তথ্য ব্যবহার করে অতিরিক্ত সিম নিবন্ধন করতে পারে, যা পরে প্রতারণা, অনলাইন জুয়া, আর্থিক জালিয়াতি, ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে পারে। এতে প্রকৃত গ্রাহক বুঝতেই পারেন না যে তার নামে আরও সিম চালু রয়েছে। পরবর্তী সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্তে গেলে নির্দোষ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হতে পারেন। একই সঙ্গে এসব অবৈধ সিম ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ওয়ালেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনা করা হলে অপরাধীদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সিম নিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রত্যেক গ্রাহককে নিয়মিত নিজের নামে কতটি সিম নিবন্ধিত আছে তা যাচাই করার সুযোগ আরও সহজলভ্য করা জরুরি। অনলাইন জুয়ার ক্ষতি বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে দেশ থেকে বাইরে পাচারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং বৈধ অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দ্বিতীয়ত, তরুণ সমাজ দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় জুয়ায় জড়িয়ে পড়ে শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন নষ্ট করতে পারে। অনেক পরিবার সঞ্চয় হারায়, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। তৃতীয়ত, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে প্রায়ই সাইবার প্রতারণা, পরিচয় চুরি, মানি লন্ডারিং, ভুয়া কল সেন্টার, ফিশিং এবং ডিজিটাল আর্থিক অপরাধের সংযোগ থাকতে পারে। অনেক প্রতারক প্রথমে সহজ লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে, পরে অ্যাকাউন্ট জব্দ, অতিরিক্ত অর্থ জমা দেওয়ার শর্ত বা ভুয়া বোনাসের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করে। সিআইডির সাম্প্রতিক তথ্য মতে, অবৈধ সিম জালিয়াতি এবং অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন আনুমানিক ৭০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে, যার একটি বিশাল অংশ অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়। গত কয়েক দিন আগে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩ জন চীনা নাগরিকসহ এমন একটি বড় চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। তাদের মতে, শুধু এই একটি চক্রই প্রতি মাসে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা একটি নির্দিষ্ট গেটওয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করছিল। গত জুলাই মাসে গাজীপুর ও কুমিল্লায় ৬৬০০টি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট সংবলিত সিমসহ আটক হওয়া আরেকটি চক্র (আঞ্চলিক চক্র) প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা লেনদেন ও পাচার করত।

সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি নতুন অনলাইন জুয়ার সাইট খোলা হচ্ছে। গত ১ মে থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৫৮৬টি জুয়ার সাইট সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সাইটে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে বলে পুলিশের পর্যবেক্ষণে তথ্য মিলেছে। এই বিপুল অর্থের হিসাবের ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় ক্ষতির হিসাব। একজন তরুণ জুয়ার  পেছনে যে সময় হারায়, যে মনোযোগ হারায়, যে চিন্তার শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় করে, তা সহজে ফিরে আসে না। জুয়া মানুষের  ভেতরে একটি বিপজ্জনক ধারণার জন্ম দেয়। পরিশ্রম করে ধীরে ধীরে অর্জন করার প্রয়োজন কী? অল্প সময়ে অনেক টাকা পাওয়া গেলে এত শ্রমের প্রয়োজন কী! তারুণ্যের মন স্বভাবতই স্বপ্নময়। সেখানে কৌতূহল থাকে, সাহস থাকে, ঝুঁকি নেওয়ার আকাক্সক্ষা থাকে। অনলাইন জুয়ার ব্যবসায় সেই স্বাভাবিক ঝুঁকিপ্রবণতাকে ব্যবহার করে লোভে পরিণত করে।

ভুয়া পরিচয় বা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহারের ফলে মূল অপরাধীদের সহজে শনাক্ত করা যায় না। জুয়াড়িরা এসব স্থানীয় নম্বরে টাকা জমা দেয় এবং চক্রটি পরবর্তী সময় ক্রিপ্টোকারেন্সি বা হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে। আরও আছে সর্বনাশা সাইবার ফাঁদ। দেশে সাইবার অপরাধ বেড়েছে। বিশেষ করে যুব সমাজ আর তাদের মধ্যে নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি বা ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল, ফেসবুক আইডি হ্যাক, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, অনলাইনে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, চরিত্র হনন, সাইবার বুলিং এসব অপরাধ অনেকের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত করছে। সামাজিক লজ্জা, মানসিক চাপ এবং পারিবারিক ভয়ের কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগও করতে পারেন না। ফলে কিছু ক্ষেত্রে হতাশা চরমে পৌঁছে আত্মহত্যাসহ মর্মান্তিক ঘটনারও সৃষ্টি হয়। ৭৯% তরুণ-তরুণী (যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে), যার মধ্যে প্রায় ৪৬% থেকে ৫২% অপরাধই হলো সাইবার বুলিং বা অনলাইন হয়রানি। এসব ভুক্তভোগীর বড় একটি অংশ নারী ও কিশোরী। এসব সাইবার অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, সামাজিক সচেতনতা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ। প্রয়োজন সরকার, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিক সবার সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, প্রতিটি সিম নিবন্ধনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের মোবাইলে তাৎক্ষণিক এসএমএস পাঠানো এবং নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা সহজে যাচাই করার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অসাধু সিম বিক্রেতাদের লাইসেন্স বাতিল, ভারী অর্থদণ্ড এবং ফৌজদারি শাস্তির ব্যবস্থা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট, অ্যাপ, পেমেন্ট গেটওয়ে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক লেনদেন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে সন্দেহজনক কার্যক্রম দ্রুত বন্ধ করতে হবে। চতুর্থত, সাইবার অপরাধ তদন্তে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, বিদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময় ও যৌথ অভিযান জোরদার করতে হবে, যাতে সীমান্তের বাইরে পরিচালিত অপরাধী নেটওয়ার্ককেও আইনের আওতায় আনা যায়।

অনলাইন জুয়া, সাইবার বোলিং কিংবা অন্য যেকোনো অনলাইন প্রতারণা কেবল একটি অবৈধ ব্যবসা নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীরাও নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ, সিম নিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, আর্থিক লেনদেনের কার্যকর পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতার সমন্বয়েই এই অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দায়িত্বশীল কারোর গাফিলতি যেন অপরাধীদের সুযোগ না করে দেয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ সিম ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা এবং অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে মানুষ অচেনা লিংক, ভুয়া বিনিয়োগ, অনলাইন বেটিং বা অবৈধ আয়ের প্রলোভনে পা না দেয়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের উচিত সিম নিবন্ধনের সময় নিজে উপস্থিত থেকে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করা। অবৈধ সিম, ভুয়া পরিচয়, লোভনীয় অফার এবং বিদেশভিত্তিক সার্ভারের কারণে অনলাইন জুয়া এবং সাইবার বোলিং অতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এর মোকাবিলায় সরকার, টেলিযোগাযোগ খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিবিদ এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক : প্রযুক্তিবিদ। অধ্যাপক, আইআইটি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত