সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ সামনে রেখে জাতীয় দলের কোচ হাভিয়ের কাবরেরা শেষ মুহূর্তে প্রাথমিক দলে ডেকেছেন বসুন্ধরা কিংসের তরুণ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার শেখ মোরসালিনকে। কিংসের হয়ে শেষ কয়েক ম্যাচে খেলছেন অসাধারণ ফুটবল। গতকাল দুই অ্যাসিস্টে মোহামেডানের বিপক্ষে দলের জয়ে অবদান রাখা মোরসালিন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দর কাছে জানিয়েছেন নিজের স্বপ্নের কথা।
মোহামেডানের বিপক্ষে দারুণ দুইটা অ্যাসিস্টে নিজেকে তো আজও আলাদা করে চেনালেন...?
মোরসালিন : আমার জন্য দোয়া করবেন। শেষ পাঁচ ম্যাচে শুরু থেকে খেলার সুযোগ পাচ্ছি। এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে সব সময় চাই সেরাটা দিতে। আমার কিন্তু আগের ম্যাচে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট ছিল।
গত মৌসুমে মোহামেডানের জার্সিতেও নজর কেড়েছিলেন?
মোরসালিন : আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি। কারণ আমার শীর্ষ পর্যায়ে শুরুটাই হয়েছে বসুন্ধরা কিংসের মতো ক্লাবে। গত লিগের দ্বিতীয় পর্বে আমি ধারে মোহামেডানে খেলি। সাতটা ম্যাচ খেলে দুইটা গোল ও একটা অ্যাসিস্ট ছিল।
গত বছর দুটি গোলই ছিল চোখধাঁধানো। খুব বোঝা গেছে আপনার প্রতিভা আছে। সেটা ধরে রাখতে তো অনেক পরিশ্রম করতে হবে?
মোরসালিন : আমি জানি, ভালো ফুটবলার হতে হলে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। তাই আমি দলের সঙ্গে অনুশীলনের পরও ব্যক্তিগতভাবে জিমে অনেক বেশি সময় দিই। এ ছাড়া বিকেলে আলাদাভাবে শুটিং, কর্নার ও ফ্রি-কিক প্র্যাকটিস করি নিয়মিত। কারণ বড় খেলোয়াড় হতে হলে প্র্যাকটিসের বিকল্প নেই।
শেখ রাসেলের বিপক্ষে এই লিগেও তো গোলটা করেছেন দূরপাল্লার শটে। বোঝা গেছে এগুলোর চর্চা করেন নিয়মিত?
মোরসালিন : এ রকম গোলের পর অনেক প্রশংসা পাই সবখান থেকে। সবাই খুব অনুপ্রেরণা দেন। তাতে সাহস আরও বাড়ে। আগেই বলেছি, আমি দলের সঙ্গে অনুশীলনের বাইরেও আলাদাভাবে শুটিং ও ফ্রি-কিক চর্চা করি। কোনো দিনই এটা মিস যায় না।
২০২১ সালে তৃতীয় বিভাগ লিগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর আপনাকে বসুন্ধরা কিংস নিয়ে আসে। এই ক্লাবে থেকে খুশি তো?
মোরসালিন : সেবার ১৬ ম্যাচে ১৯ গোল করে তৃতীয় বিভাগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হই। তখন কিংস আমাকে দলে নেয়। আগেই বলেছি, আমি ভাগ্যবান। বাংলাদেশে এ রকম পেশাদার ক্লাব আর নেই। এর মধ্যে আরও অনেক ক্লাব আমাকে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে কিংসের সঙ্গে আমার চুক্তি আগামী মৌসুম পর্যন্ত। তা ছাড়া এখানে আমি ভালো আছি। ছাড়ার চিন্তাই করি না।
২০১৬ সালে বিকেএসপিতে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। এ বছর এইচএসসি পাস করলেন। তবে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে আপনাকে সেভাবে দেখা যায়নি?
মোরসালিন: আসলে আমি একবার অনূর্ধ্ব-১২ দলে সুযোগ পেয়েছিলাম। এরপর বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার পর অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-২০ দলের সঙ্গেও অনুশীলন করেছি, তবে খেলার সুযোগ পাইনি। শেষ অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে খেলতে পারিনি পাসপোর্ট জটিলতার কারণে। তবে এখন সেই জটিলতা কেটে গেছে।
এখন তো মনে হচ্ছে একেবারে সিনিয়র জাতীয় দলেই খেলে ফেলবেন?
মোরসালিন : শুরুতে খুব অবাক হয়েছিলাম। এত তাড়াতাড়ি ডাক পাব ভাবিনি। তবে এখন আমি খুব আশাবাদী। কারণ কিংসে আমি অনুশীলন করেছি বেশির ভাগ জাতীয় দলের ফুটবলারদের সঙ্গে। তাই আত্মবিশ্বাস আছে, জাতীয় দলে মানিয়ে নিতে খুব বেশি সমস্যা হবে না। এখন মূল লক্ষ্য চূড়ান্ত দলে জায়গা করে নেওয়া।
সুযোগ পেলে নিশ্চয় আরও বড় কোনো লক্ষ্যের পথেই হাঁটবেন?
মোরসালিন : যদি সুযোগ পাই, স্বপ্ন তো অনেক বড়। ছোটবেলা থেকেই মনে হতো খেলব জাতীয় দলে। মাঝে মনে হয়েছিল খেলা ছেড়ে পড়াশোনায় মন দিই। এখন স্বপ্নের খুব কাছাকাছি আছি। সুযোগ পেলে চেষ্টা করব ভালো কিছু করার। আমার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে। ১০-১১ বছর বয়সে আমি ফুটবলের প্রেমে পড়ি। ছাত্র হিসেবেও ভালো। তাই পরিবার থেকে কেউ চায়নি আমি খেলাধুলায় সময় বেশি দিই। সব বাবা-মায়ের মতো আমার বাবা-মাও চেয়েছেন পড়াশোনা করে বড় কিছু হই। কিন্তু আমার যে খেলতেই বেশি ভালো লাগে। তাই বলে ভাববেন না আমার রেজাল্ট খারাপ। এইচএসসি পরীক্ষায় আমি জিপিএ-৫ পেয়েছি। এখন ইচ্ছা আছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় অথবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার।
পরিবারের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে খেলাকে বেছে নিলেন?
মোরসালিন : আসলে আমার একজন মামা আছেন। তিনি আমাকে অনেক আদর করেন। তিনিই আসলে আমাকে অনেক সমর্থন দিয়েছিলেন। তিনি না থাকলে হয়তো ফুটবলার হওয়া হতো না।
জাতীয় দলের দরজাটা তো খুলল দুজনের চোটের কারণে? দুই সতীর্থ মতিন মিয়া ও সাদউদ্দিন ছিটকে গেছেন চোটের কারণে?
মোরসালিন : কোচ (হাভিয়ের কাবরেরা) হয়তো মনে করছেন তার পরিকল্পনায় আমি আছি। তার অধীনে ভালো করব, তাই হয়তো আমাকে ডেকেছেন।
কিংসে তো আপনার পজিশনে অনেক খেলোয়াড় আছেন। নিশ্চয় খুব কঠিন তাদের পেছনে ফেলে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়া?
মোরসালিন : ধারে মোহামেডানে খেলে এই মৌসুমে আমি কিংসে ফিরে অনুশীলন করে যাচ্ছিলাম। আসলে আমার পজিশনে আরও অনেক দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছেন। বড় ভাইয়েরা আছেন। তাদের বাদ দিয়ে আমার সুযোগ পাওয়া কঠিনই। তারপরও আমি হাল ছাড়িনি। তাদের সঙ্গে লড়াই করেই নিজের জায়গা করে নিতে হচ্ছে। এই লিগে পাঁচ ম্যাচে আমি শুরু থেকে খেলছি। এখন নিজেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য।
আপনি অ্যাটাকিং মিডফিল্ড পজিশনে ভালো করছেন। বিশেষ কাউকে অনুসরণ করেন কি?
মোরসালিন : আমি ছোটবেলা থেকেই বিদেশের লিগগুলো দেখি। আমার রোল মডেল কেভিন ডি ব্রুইন। ওর খেলা আমার ভীষণ পছন্দ। ওকে চেষ্টা করি অনুসরণ করার। চেষ্টা করি ওর মতোই গোল করার এবং গোল করানোর।
ক্লাবে তো আপনি সবচেয়ে ছোট। সিনিয়ররা কী বলেন?
মোরসালিন : আমরা আসলে পাঁচজন ছিলাম সমবয়সী। এখন দুজন আছি। বাকিরা ধারে অন্যান্য ক্লাবে খেলেছে। ক্লাবে সিনিয়ররা সবাই খুব অনুপ্রেরণা দেন। সবার স্নেহ ও সমর্থন পাই বলেই নিজের স্বপ্নটা বড় করতে পারছি।