শেষ হলো উইন্ডিজ ‘এ’ দলের সঙ্গে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের তিনটি আনঅফিশিয়াল টেস্ট সিরিজ। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হয়ে যাওয়া তিন-ম্যাচ সিরিজের ফল ১-০, জয়ী দল উইন্ডিজ ‘এ’। জাতীয় দলের নির্বাচকরা বলছেন, এই সিরিজে পারফরম্যান্স নিয়ে অতৃপ্তি থাকলেও আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টের আগে প্রস্তুতি ভালো হয়েছে।
জাতীয় দলের পরবর্তী সিরিজ আফগানিস্তানের সঙ্গে, ১৪ মার্চ মিরপুরের শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হবে সিরিজের একমাত্র টেস্ট ম্যাচট। সাদা পোশাকের সংস্করণে আফগানদের সঙ্গে প্রথম দেখাতেই হেরেছিল বাংলাদেশ। রশিদ খান, নাভিন-উল-হক, ফজল হক ফারুকিদের বোলিং সামলাতে প্রস্তুতিটাও চাই সর্বাত্মক। উইন্ডিজ ‘এ’ দল মিটিয়েছে সেই দাবিটা। কেভিন সিনক্লেয়ার, অ্যান্ডারসন ফিলিপ, গুডাকেশ মোতিদের নিয়ে দারুণ একটা বোলিং আক্রমণ ছিল ক্যারিবিয়ানদের। নিজের দেশেও এই বোলারদের খেলতে ধুঁকেছেন ব্যাটসম্যানরা, বিশেষ করে টপ-অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা। এই জায়গাটা নিয়েই আক্ষেপ নির্বাচক হাবিবুল বাশারের, ‘টেস্ট ম্যাচে খেলোয়াড়রা কেমন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে পারে, টেস্ট ম্যাচ কতটা কঠিন, তারই একটা পরীক্ষা দিল ক্রিকেটাররা। আমরা ফল আমলে নিচ্ছি না, এসব ম্যাচে ফলের চেয়ে প্রস্তুতিটা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সই বেশি দেখেছি আমরা। যারা খেলেছে তারা বুঝতে পেরেছে পরের পথটা কতখানি কঠিন।’
পারফরম্যান্স প্রসঙ্গে সাবেক এই অধিনায়ক দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন তার মূল্যায়ন, ‘পারফরম্যান্স আমি আরেকটু ভালো আশা করেছিলাম। ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই, আরো ভালো করার সুযোগ ছিল। টেস্টে আমাদের যে সমস্যা, শুরুতেই টপ-অর্ডারে অনেক বেশি উইকেট হারিয়ে ফেলি, এখানেও একই সমস্যা দেখেছি। এটাই হলো চিন্তার বিষয়। ব্যাটিংটা মনের মতো হয়নি।’
দশদিন পর আফগানদের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ। এর আগে অনুশীলন চললেও নেই কোনো বড় দৈর্ঘ্যরে ম্যাচ। বিসিবি একাদশ-আফগানিস্তান একাদশ কিংবা আন্তঃস্কোয়াড অনুশীলন ম্যাচ, কোনো রকম প্রস্তুতি ম্যাচেরই সুযোগ নেই সামনে। উইন্ডিজ ‘এ’ দলের বিপক্ষে শেষ আনঅফিশিয়াল টেস্টে তাই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল মমিনুল হক, ইয়াসির আলি রাব্বি, নুরুল হাসান সোহানসহ জাতীয় দলের নিয়মিত কয়েকজনকেই। ইয়াসির প্রথম ইনিংসে ৯ রান করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে করেছেন ৬৭ রান। মমিনুল প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও আউট হয়েছেন ৫ রান করে। টানা ৯ ইনিংসে এক অঙ্কের ঘরে আউট হওয়ার পর বাদ পড়েছিলেন মুমিনুল উইন্ডিজ সফরের দ্বিতীয় টেস্টে। মিরপুরে ভারতের বিপক্ষে ৮৪ রানের ইনিংস খেললেও পরের ৩ ইনিংস যথাক্রমে ৫, ১৭ ও ২০* রানের। আফগানদের বিপক্ষে টেস্টের আগে মমিনুলকে নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা আছে কি না জানতে চাইলে হাবিবুলের উত্তর, ‘মমিনুল একজন পরীক্ষিত টেস্ট ক্রিকেটার। তার একটা দুইটা ম্যাচে রান না করাটা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নই। রান করতে পারলে ভালো হতো, ওর ব্যাটিং অনুশীলনটা ভালো হতো। তবে আমার মনে হয় না এই নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু আছে।’
যদিও চিন্তার খোরাক আসছে অন্য জায়গা থেকে। চন্ডিকা হাথুরুসিংহের সময়ে টেস্ট দল থেকে বাদ পড়েছিলেন মমিনুল। ওয়ানডে দলে আফিফ হোসেনের যে পরিণতি হয়েছে, মমিনুলের জন্য যদি একই দাওয়াই বরাদ্দ রাখেন কোচ, তাহলে জাতীয় দলের হয়ে খেলার অপেক্ষা লম্বা হতে পারে সাবেক টেস্ট অধিনায়কের।
আরেক নির্বাচক ও সাবেক বামহাতি স্পিনার আব্দুর রাজ্জাকও দেশ রূপান্তরকে জানান, ফলের দিকে না তাকিয়ে অনেককে সুযোগ দিয়ে পরখ করাটাই ছিল প্রধান লক্ষ্য, ‘এটা বলা যাবে না যে খুব দারুণ কিছু হয়েছে, তবে আমাদের জন্য এখন বড় দৈর্ঘ্যরে ক্রিকেটটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেদিক থেকে দেখা গেলে ভালো, সুযোগ ছিল ভালো একটা দলের সঙ্গে খেলার। ওরা কিন্তু বেশ ভালো দল পাঠিয়েছে, ওদের জাতীয় দলের অনেকেই ছিল। জশুয়া দা সিলভা ছিল, চন্দরপলের ছেলে ছিল।’ সিরিজের শেষ ম্যাচে বেশ কয়েকজন জাতীয় দলের সম্ভাব্য ক্রিকেটারকেই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের পারফরম্যান্স নিয়ে রাজ্জাক বললেন, ‘সিনিয়র প্লেয়ার বলতে আমাদের যেহেতু সামনে টেস্ট ম্যাচ আছে, তাদের জন্য এর থেকে ভালো অনুশীলনের সুযোগ আর কী হতে পারে! পারফরম্যান্সের থেকে এখানে অনুশীলনের ব্যাপারটাই অগ্রাধিকার পেয়েছে। আগামীতে আমাদের যেসব ম্যাচ আছে সেসবের জন্য অনুশীলন করতে পারে সেজন্যই তাদের ‘এ’ দলে দেওয়া। যে কিছু রান করেছে তার জন্য অনুশীলনটা ভালো হয়েছে, যে করেনি তার জন্য ভালো হয়নি। অনুশীলন করার মানে কিন্তু এই না যে নেটে যেভাবে অনুশীলন করি সেভাবে করলাম, ১০ বার আউট হলাম, চেষ্টা করছি এই খেলা ঐ খেলা এরকম কিছু না। অনুশীলন মানে হচ্ছে ম্যাচ সিনারিও মানে ম্যাচের মধ্যে কী পরিস্থিতি হতে পারে, আসতে পারে। একদম একরকম তো হবে না, যতটুকু হয় আর কি।’ রাজ্জাকের কাছে তরুণ পেসারদের পারফরম্যান্স ভালো লেগেছে আর আরও উন্নতির জায়গা দেখছেন ব্যাটিংয়ে।
রাজ্জাকের এই পর্যবেক্ষণ অবশ্য সিরিজ শেষে পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। সর্বোচ্চ রান জশুয়া দা সিলভার, ৫ ইনিংসে ৩০০ রান। বাংলাদেশের সাইফ হাসানের ৩ ম্যাচে ৬ ইনিংসে ২১৮ রান, সাদমান ইসলাম ৪ ইনিংসে ১৫৫ রান। ১৩ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি সিনক্লেয়ার, বাংলাদেশের পার্টটাইম স্পিনার সাইফ হাসান ৮ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ। ১ ম্যাচ খেলে শরিফুল ইসলামের ২ উইকেট আর খালেদ আহমেদের ১ উইকেট। শেষ অধ্যায়ে মাহমুদুল হাসান জয়ের সেঞ্চুরি করেছে মুখরক্ষা। তা না হলে ২-০ তে হারতে হতো সিরিজটা, ঘরের মাঠে বেশ কয়েকজন টেস্ট ক্রিকেটারকে নিয়ে দল গড়েও উইন্ডিজ ‘এ’ দলের সঙ্গে এভাবে হারলে যে লজ্জাই পেতে হতো।