শেখ মুজিব ও ছয় দফা ছিল আইয়ুবের প্রধান শত্রু

রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলন বসল লাহোরে, ১৯৬৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে। ওই সম্মেলনের বিষয়-নির্বাচনী কমিটিতে শেখ মুজিবুর রহমান তার ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করলেন। স্বভাবতই তা গৃহীত হয়নি। ছয় দফা উত্থাপন করাকে আইয়ুব খান একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলেন। ক্রমবর্ধমান জন-অসন্তোষের মুখে তার জন্য একটি অভ্যন্তরীণ শত্রুর প্রয়োজন ছিল, যাকে দেখিয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ ও সেনাবাহিনীকে একাট্টা হয়ে তার পেছনে দাঁড়ানোর জন্য ডাক দিতে পারেন। শেখ মুজিব ও ছয় দফাকে তিনি সেই শত্রু হিসেবে দাঁড় করালেন। বললেন, ছয় দফা জাতীয় সংহতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র মাত্র, এবং হুঙ্কার দিলেন যে, এ ধরনের তৎপরতা বরদাশত করা হবে না। আইয়ুববিরোধী পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারাও ছয় দফাকে তাদের স্বার্থের বিরোধী হিসেবেই দেখলেন, এবং প্রায় সবাই এর জোর বিরোধিতা করলেন। এতে করে পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বটা আরও পরিষ্কার হলো।

জনপ্রিয় নেতা রাজনীতিক হিসেবে আইয়ুব তিনজনকে চিনতেন; হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান। ফজলুল হক ১৯৫৬-এর পরে রাজনীতিতে আর সক্রিয় ছিলেন না; ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল তার মৃত্যু ঘটে। ক্ষমতা দখল করার সঙ্গে সঙ্গেই ভাসানীকেও আইয়ুব খান বন্দি করেছিলেন। তাকে আটকে রাখা হয়েছিল চার বছর। তিনি মুক্ত হন অনশন করে এবং প্রবল জনমতের চাপে। সোহরাওয়ার্দীকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয়নি। পরে করা হয়; কিন্তু বেশি দিন রাখা যায়নি। তার মুক্তির জন্য প্রবল বিক্ষোভ হয়েছে, তা ছাড়া আইয়ুবের বিদেশি মুরব্বিরাও ঘোরতর মার্কিনপন্থি সোহরাওয়ার্দীকে আটকে রাখাটা পছন্দ করেনি; তাই তাকে সাত মাসের মধ্যেই মুক্তি দিতে হয়েছে, এরপর তিনি তো মারাই গেলেন, ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর।

স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে মওলানা ভাসানী সব সময়েই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৯৫৭ সালে স্বায়ত্তশাসন শতকরা ৯৮ ভাগ দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা করেছিলেন, যার বিপরীতে মওলানা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন না দিলে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে যাবে। কিন্তু ১৯৬৬-তে মওলানা শুধু পূর্ব পাকিস্তানের নন, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি হিসেবে তিনি গোটা পাকিস্তানের জাতীয় পর্যায়ের নেতা; পূর্ব পাকিস্তানের তো বটেই, সেই সঙ্গে, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান ও সিন্ধু প্রদেশেরও স্বায়ত্তশাসন তিনি চান; তার দলের দাবি এক ইউনিট বাতিল করা চাই, যে দাবি পাঞ্জাবিদের ভেতর জনপ্রিয় নয়। আর পাঞ্জাবিরাই তো দেশ শাসনে প্রধান নিয়ামক। মওলানাকে তাই তখন ততটা বিপজ্জনক বলে মনে হয়নি। এই পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব যখন ছয় দফা দিলেন, কেবল দিলেন না, সভা ও সমাবেশ করে ছয় দফার পক্ষে বলতে শুরু করলেন তখন আইয়ুব খান প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে তাকেই দেখতে পেলেন এবং তাকে পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে শত্রু হিসেবে দাঁড় করাতে চাইলেন। তার শঙ্কা আরও বাড়ছিল, কারণ তিনি টের পাচ্ছিলেন যে, স্বায়ত্তশাসনের ওই আন্দোলনের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহানুভূতি রয়েছে। এর একটা প্রমাণ ছিল এই যে, ১৯৬৩ সালেই পাকিস্তানের মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে এ রকম একটি ঘোষণা দেন যে, পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ আর্থিক সাহায্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ আলাদাভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হবে।

১৯৬৬-এরই জুন মাসে গৃহীত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষিত ১৪ দফাতেও মার্কিন সরকারের ওই দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখ পাওয়া যায়। সেটি এই রকমের : ‘পাকিস্তানের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি দরদ প্রকাশ করিয়াছে। কিছুকাল পূর্বে তদানীন্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মি. ম্যাকনগি পূর্ব পাকিস্তান সফরকালে প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তানিদের সাহায্য করার প্রস্তাব করিয়াছেন।’ এর কারণ ছিল। আমেরিকানরা বিলক্ষণ বুঝতে পারছিল যে, স্বায়ত্তশাসনের দাবির ন্যায্যতা রয়েছে এবং দাবিটা ক্রমেই প্রবল হবে। স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন যাতে কমিউনিস্টদের হাতে চলে না যায় সেটা নিশ্চিত করতে পূর্ববঙ্গের উঠতি বুর্জোয়াদের সহায়তাদানে সম্মতিটা আগেভাগেই জানিয়ে রাখাটা তারা ভালো বলে মনে করেছে। কমিউনিস্টদের প্রতি বিদ্বেষ অবশ্য আইয়ুব খানের নিজেরও নিতান্ত কম ছিল না; ১৯৬৬ সালের ২২ নভেম্বর ম্যানচেস্টারে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্বায়ত্তশাসনের দাবিদারদের ভেতর বৃহত্তর বঙ্গ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগীরা তো রয়েছেই, কমিউনিস্টরাও আছে। বলার পেছনে একটা উদ্দেশ্য ছিল। সেটা হলো আমেরিকানরা কমিউনিস্ট দমনের জন্য তার হাতকে আরও শক্তিশালী করুক এই কামনা। আরেকটা উদ্দেশ্য পুরনো, সেটা হলো দেশের মানুষের ভেতর যে ভারতবিদ্বেষ ও কমিউনিস্ট-ভীতি ছিল তাকে কাজে লাগিয়ে পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসনবিরোধী করে তোলা।

ছয় দফা পূর্ববঙ্গে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। শেখ মুজিব প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে জনসভা করে এই বক্তব্য তুলে ধরেন যে, পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত হয়েছে; এখানে যে শিল্পোন্নয়ন ঘটছে তাতেও পশ্চিম পাকিস্তানিদের আধিপত্য, ব্যবসা-বাণিজ্যও তাদের হাতে এবং পূর্ব পাকিস্তানকে বন্ধক রেখে যে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হচ্ছে তার বেশির ভাগই খরচ হচ্ছে পশ্চিমে অথচ ওই ঋণ শোধ করতে হবে পূর্ব পাকিস্তানের পণ্য বিক্রির টাকা দিয়েই। আঞ্চলিক বৈষম্য ও পীড়নের ওই সত্যটা পূর্ববঙ্গের মানুষ খুবই টের পাচ্ছিল। পূর্ব ও পশ্চিমের অর্থনীতি যে অভিন্ন নয়, তারা যে বিভক্ত, এ কথা ১৯৫০ সাল থেকেই বলা হচ্ছিল, ১৯৫৭-এর কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী কথাটা খুব জোর দিয়েই বলেছেন; এবার ১৯৬৬ সালে ছয় দফা পেশ এবং প্রচারে সেটা আগের চেয়ে বেশি করে সামনে চলে এলো। এ কাজ আইয়ুব খানের নিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ডেও সহায়ক হয়েছিল। এক পর্যায়ে তার স্বঘোষিত ‘গোমস্তা’ গভর্নর আবদুল মোনায়েম খান শেখ মুজিবকে জনসভায় বক্তৃতা শেষ করার পরেই গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় বক্তৃতা করলে আবার গ্রেপ্তার, এই কার্যক্রম চালিয়ে শেখ মুজিব ও তার বক্তব্য উভয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছিলেন। এরপর শেখ মুজিবকে জেলে আটক রাখা এবং আটক অবস্থাতে আগরতলা মামলার প্রধান অভিযুক্ত আসামি করার কাজটি আইয়ুব খান করলেন। অসন্তুষ্ট পূর্ববঙ্গ তখন একজন বিদ্রোহী বাঙালি জাতীয়তাবাদী নায়ক খুঁজছিল, শেখ মুজিবের মধ্যে তাকে পাওয়া গেল।

ছয় দফাকে ন্যাপ পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি বলে মনে করেনি। তাদের বক্তব্য ছিল এ রকমের যে, এতে শ্রমিক কৃষকের অধিকারের কথা নাই, পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কেও উল্লেখ অনুপস্থিত। এই পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাপ তাদের ১৪ দফার মাধ্যমে জাতীয় মুক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ন্যাপ তখনো দ্বিখণ্ডিত হয়নি, তবে কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে, ছাত্র ইউনিয়ন দুই টুকরো হওয়াটা ঘটেছে আরও আগে। ন্যাপের চৌদ্দ দফায় মওলানা ভাসানীর চিন্তাধারার প্রতিফলন ছিল। ছয় দফাতে যা ছিল না, চৌদ্দ দফাতে তা ছিল। চৌদ্দ দফার পূর্ণ আঞ্চলিক শাসনের দাবি জোর দিয়েই করা হয়েছে, তবে সেই সঙ্গে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব থাকবে জনগণের হাতে। যেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। চৌদ্দ দফায় পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ভাঙার কথা সরাসরি বলা হয়নি, তবে তার প্রদেশগুলোকে ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করাসহ এমন একটি আঞ্চলিক ফেডারেশন গঠন করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে কোনো একটি প্রদেশের আধিপত্য থাকবে না। বলা হয়েছে, শ্রমিক ও কৃষকের অবস্থার উন্নতির ও জনগণের খাদ্যের দাবির কথা। শিক্ষাকে ব্যবসায়ে পরিণতকরণের মধ্য দিয়ে শিক্ষা সংকোচনের নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। চৌদ্দ দফায় দাবি আছে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার। দাবি জানানো হয়েছে আমলাতান্ত্রিক পুঁজি এবং ব্যাংক, বীমা কোম্পানি ও পাট ব্যবসায়ের জাতীয়করণের। চৌদ্দ দফায় অঙ্গীকার আছে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। শাসকদের চিহ্নিত করা হয়েছে পুঁজিপতি ও আমলাতন্ত্রী বলে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়