এদেশে আগুন নেভানোর বদলে ছাই সরানোর ঘটনা কম নয়। যে বিষয় এদেশে মীমাংসিত, যে বিষয় নিয়ে কারও আপত্তি বা অভিযোগ নেই, তা-ই আলোচনার টেবিলে স্থান পায়। আর যে বিষয় নিয়ে জনআপত্তি আছে, অসন্তোষ আছে, ক্ষোভ আছে তা নিয়ে আলোচনা নেই, ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুদিন আগে বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগ ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে হওয়ার সম্ভাবনা মর্মে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক নিন্দার ঝড় ওঠে। আন্দোলনের ডাক দেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। আন্দোলনের গতি ও এর বিশালতার জবাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে সরে আসে সরকার, যদিও এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি শুরু থেকে এমন কথা বলে আসছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। পরবর্তী সময়ে জানানো হয় আগের পদ্ধতিতেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং শিক্ষক নিয়োগের কর্তৃত্ব এনটিআরসিএর কাছেই রয়েছে। এই পুরনো ক্ষোভের রেশ কাটতে না কাটতেই গণমাধ্যমের আরেক সংবাদ পুরনো ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন ক্ষত সৃষ্টি করার উপক্রম করেছে। ১১-১২ গ্রেডের ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় লিখিত ৫০ এবং মৌখিক ৫০; ১৩-১৬ গ্রেডে লিখিত ৬০ ও মৌখিক ৪০; আর ১৭-২০ গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক দুটোতেই ২৫ করে নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রক্সি পরীক্ষা বা জালিয়াতি রোধের যুক্তি দেখিয়ে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এ সংক্রান্ত একটি বিধিমালার অনুমোদন দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। এবারও এইরকম কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে বক্তব্য আসবে কি না তা সময় বলে দেবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা কেন কর্তাব্যক্তিদের মাথায় এলো তা ব্যাখ্যা করেছেন তারা। তাদের মতে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি বা জালিয়াতির মাধ্যমে অনেকে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে প্রকৃত চাকরিপ্রত্যাশীরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সুষ্ঠু নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এটি রোধ করতেই নাকি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এমতাবস্থায় লিখিত পরীক্ষায় যদি নম্বর কমে ও মৌখিক পরীক্ষায় যদি নম্বর বাড়ে, তাহলে নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক কোনটির গুরুত্ব কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
প্রার্থীর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, ভাষাগত দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা যাচাই করার একটি চমৎকার প্রক্রিয়া হলো লিখিত পরীক্ষা। এই প্রক্রিয়ায় অভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আনা হয়। ফলে প্রার্থীদের মূল্যায়ন সহজ হয়। আর মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্নের ভিন্নতার কারণে মূল্যায়নে সমতা আনা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র কে বা কারা মূল্যায়ন করবেন তা যেমন প্রার্থীর কাছে অজানা থাকে, তেমনি কোন পরীক্ষক কার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করছেন তাও সবার কাছে থাকে অজানা। ফলে ওভার-মার্কিংয়ের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। অপরদিকে মৌখিক পরীক্ষায় চাইলে নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে পারফরম্যান্সের তুলনায় ওভার-মার্কিং করা যায়। এক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষায় এগিয়ে থাকা প্রার্থীকে চাইলে পেছনে ফেলা যায়। লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীর সঙ্গে পরীক্ষক-নিরীক্ষকের সম্পর্ক থাকে না বলে এই পরীক্ষায় নম্বর প্রদানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কোনো বিষয় কাজ করে না। তাছাড়া মৌখিক পরীক্ষার সংক্ষিপ্ত সময়ের মূল্যায়নকে লিখিত পরীক্ষার এই দীর্ঘমেয়াদি অর্জনের সমান গুরুত্ব দিলে প্রকৃত মেধার সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন হয়। শুধু তা-ই নয়, মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে কোন প্রশ্নে কত নম্বর প্রদান করা হলো সে মর্মে কোনো লিখিত প্রমাণ থাকে না। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর লিখিত পরীক্ষার সমান হলে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়া বা অযোগ্য কাউকে অন্যায্যভাবে সুপারিশ করার মতো ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তাছাড়া মৌখিক পরীক্ষায় অনেক সময় দলীয় প্রভাব বা তদবির হয় বলে একটা ধারণা জনমনে কাজ করে। গণতন্ত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে একটা কথা আছে। নিয়োগ পরীক্ষার বেলায়ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড গুরুত্বপূর্ণ। এই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করে। যে পরীক্ষায় প্রশ্ন, সময় ও মূল্যায়নের মানদ-ে যত বেশি অভিন্নতা থাকে, সে পরীক্ষার মাধ্যমে তত বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী বাছাই করা যায়। মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্নের ধরন, পরীক্ষকের মূল্যায়ন ও ব্যক্তিগত বিচারবোধের ভিন্নতার কারণে এই সমতল ক্ষেত্র নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া মৌখিক পরীক্ষায় ওপরতলার কারও সুপারিশ বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে দুর্নীতির একটি শঙ্কা থাকে। অতীতের অনেক নিয়োগে অভিযোগ যেমন ছিল, তেমনি ছিল বিতর্কও। মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে নিয়োগ প্রক্রিয়া যে প্রশ্নবিদ্ধ হবে না তা বলা যায় না। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্বও কম নয়। প্রার্থীর বাচনভঙ্গি, কথা বলার ধরন, ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত বুদ্ধি ও পেশাগত দায়িত্ববোধ ইত্যাদি কিন্তু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমেই বের হয়ে আসে।
প্রক্সি পরীক্ষা বা জালিয়াতি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে লিখিত পরীক্ষার নম্বরে কাটছাঁট করে কমানো প্রকৃত সমাধান নয়, বরং এটি প্রক্সি পরীক্ষার্থীদের সুযোগ তৈরিতে উসকে দেয়।
মাথাব্যথা সারানোর বদলে মাথা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত যেমন সমাধান নয়, জালিয়াতি ঠেকাতে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমানোও কার্যকর সমাধান হতে পারে না। মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর ইস্যুকে ঘিরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে আন্দোলনে নেমেছে। নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে সরকারের এমন সিদ্ধান্তে থাকা উচিত যেন ছাত্ররা আন্দোলনে নয়, পড়ার টেবিলে মনোযোগী হয়। আর তাই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে বিতর্ক উসকে দেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় আগের বণ্টনকৃত নম্বর অপরিবর্তিত রাখা।
লেখক : শিক্ষক, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও গবেষক