বাজেটে গরিবরা একেবারে অদৃশ্য : সিপিডি

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন বাজেট সবার জন্য। বাজেট সবার জন্যই হয়। যেহেতু সম্পদ সীমাবদ্ধ, অতএব কার পক্ষে বেশি সম্পদ বরাদ্দ করা হলো বা বেশি সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করা হলো তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এবার বাজেটের আগে কাকে নিয়ে বসা হয়েছে জানি না। বাজেটে অংশীজনদের অংশগ্রহণ নেই।’

গতকাল বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও সিপিডি আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৩-২৪ : অসুবিধাগ্রস্ত মানুষগুলো কী পেল?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপের সদস্য অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এতে বক্তব্য রাখেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বলা হয় প্রত্যেক বাজেটের পর আমরা গৎবাঁধা সমালোচনা করি। ডাক্তারকে গিয়ে যদি বলেন একই রোগের ভিন্ন ওষুধ দেন। তাহলে ডাক্তারের মুশকিল হয়ে যাবে। রোগটা তো একই। গত ১০ থেকে ১৫ বছরে বাজেট অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি দলিল বা মাধ্যম হিসেবে কতখানি উন্নতি করল!’

তিনি বলেন, ‘বাজেট ব্যবস্থাপনায় ২০০৬ সালে একশর মধ্যে আমরা ৩৮তম ছিলাম, পয়েন্ট ছিল ৬৪। আর এখনকার পরিস্থিতিতে আমরা ৯৫তম। শুধু অবস্থানের দিক থেকেই ক্রমাবনমন হয়নি। আমাদের যে স্কোর তার ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হয়। অর্থনৈতিক নীতি-কৌশলের গুণমান এর মধ্যে নেই।’

দেবপ্রিয় বলেন, ‘পৃথিবীতে বড় বাজেটের ১৪৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৩৭তম। বড় বাজেটের মধ্যে সরকার খরচ করে ৩২ দশমিক ২ শতাংশ। আর বাংলাদেশ সরকার ব্যয় করে ১৫ বা ১৬ শতাংশ। ২০২২ সালে ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ জিডিপি করার কথা থাকলেও হয়েছে ১৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। বাকি প্রায় ২ শতাংশ কে দেবে?’

তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে কর আহরণের যে গতি ছিল তা পড়ে গেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর আবারও একইভাবে কমে গেছে। আমরা বলি, গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ঘাটতি হলে সরকারের কর আহরণ, উন্নয়ন ব্যয় উভয়ই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়।’

সিপিডির এ ফেলো বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিবিএস এক ধরনের কথা বলছে, অর্থ মন্ত্রণালয় আরেক পরিসংখ্যান দিচ্ছে। তাহলে কি ডান হাত-বাম হাত একসঙ্গে কাজ করছে না? এরকম হলে কিন্তু বাজার বেত্তমিজি করবে।’

তিনি বলেন, ‘এবার রাজস্ব আদায়ের মরিয়া চেষ্টা দেখা গেছে। সরকারের হাতে খরচ করার মতো টাকাও নেই, ডলারও নেই। খরচ করার টাকা সংগ্রহ করতে চাচ্ছে তারা। আইএমএফ বলেছে, প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব বাড়াতে হবে। আইএমএফের প্রথম সমীক্ষা হয়ে গেছে। দ্বিতীয় সমীক্ষা বছরের শেষের নাগাদ হবে। দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পেতে হলে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। লক্ষণীয় বিষয়, এত মরিয়া চেষ্টার পরও আধা শতাংশ বর্ধিত করের লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে প্রাক্কলন করা সম্ভব হয়নি।’

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘রাজস্ব আহরণে যে পদক্ষেগুলো নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ২ হাজার টাকা সারচার্জসহ অন্যগুলো নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষকে প্রভাবিত করবে নেতিবাচকভাবে।’

তিনি বলেন, ‘রিটার্ন সনদ পেতে ২ হাজার টাকাÑ এটা কেউ দেয়? কত টাকা এর থেকে আদায় হবে? কেউ বলছে এক হাজার কোটি টাকা আদায় হতে পারে। কার্যত এটি থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা আদায় হতে পারে। আগে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির বৈঠক হতো, সর্বশেষ মুহিত সাহেব স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের ডেকে বৈঠক করতেন। এবার তাও হয়েছে কি না, আমরা জানি না।’

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের যে সম্পদ আছে তার বণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এনবিআর কত টাকা আয় করতে পারল, কত টাকা সাশ্রয় করা যায়, তাও গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। আমাদের ১ হাজার ২৫০টির মতো প্রকল্প আছে, যার মধ্যে ৮৭৮টি ২০২৪ সালে শেষ করতে হবে। অধিকাংশই আগের প্রকল্প। এই যে ক্যারিওভার প্রকল্প, এগুলোর কারণে সমস্যা আরও প্রকটিত হচ্ছে। শুধু বাজেট প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অনেক বৈসাদৃশ্য আছে। এগুলো এখন প্রতীয়মান হচ্ছে।’

জলবায়ু ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘অন্যসব মন্ত্রণালয়ের মতো জ্বালানি ও জলবায়ু নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের সঙ্গে বাস্তবায়নের ফারাক থেকে যায়। আমরা আইএমএফের ঋণের আওতায় রয়েছি। তাদের শর্ত অনুযায়ী ১১টি খাতে সংস্কার করতে হবে। এর মধ্যে জলবায়ু খাতে সংস্কারের শর্তও রয়েছে। বাজেটে আমরা সেটির প্রতিফলন দেখতে পাইনি।’

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘এবারের বাজেটে দরিদ্র মানুষরা বা যাদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে তারা অদৃশ্য। তাদের জন্য বেশি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। দরিদ্র হয়ে জন্মায় বলেই তারা বাজেটে বঞ্চিত।’