‘প্রো-অ্যাকটিভ’ কৌশল স্বাস্থ্যে

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:৩৭ এএম

এবার আর কালক্ষেপণ নয়; ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগে থেকেই জোরেশোরে প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। দুই মাস আগে প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু নিয়ে সতর্ক করার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলো অনেকে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারপর থেকে এডিস মশা নিধন বা নিয়ন্ত্রণে নানা কার্যক্রম শুরু করেছে। সেই সঙ্গে আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিতেও সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তুতিতে ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ কৌশলকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এর আগে কখনো ডেঙ্গু প্রতিরোধে এত তোড়জোড় দেখেননি। সম্প্রতি তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও নিয়েছে সরকার।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ইতিমধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজন বুঝে আরও ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের প্রস্তুতি রয়েছে। ঢাকার বাইরের রোগীদের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় করা হচ্ছে ‘ডেঙ্গু কর্নার’। গাইডলাইন অনুযায়ী দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিতে চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি এবার বেসরকারি হাসপাতালও এগিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ১০ শতাংশ বেড ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ফ্রি রাখা হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসক চার্জ লাগবে না। রোগী শুধু ওষুধ ও খাবার খচর বহন করবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ৮০ শতাংশ ফ্রি করা হবে।

বেসরকারি হাসপাতালে ১০ শতাংশ শয্যায় কত শয্যা হয় তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানাতে ইতিমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাদের পর্যাপ্ত স্যালাইনের মজুদ রাখতে বলা হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকা কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নেই সরকারের। কারণ টিকা এখনো সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত নয়।

গত সপ্তাহে ডেঙ্গুবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় এবার ‘রিঅ্যাকটিভ’ নয়, বরং ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ে এই সরকার খুবই অ্যাকটিভ; প্রো-অ্যাকটিভ বলা চলে। তবে ডেঙ্গুর নতুন কিছু নেই । মশা নিয়ন্ত্রণ করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ হবে। আমাদের সবচেয়ে অসুবিধা হলো দুর্নীতি। দুনীতি বন্ধ করা গেলে এগুলোও সব নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তবে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে।’

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিতে রাজধানীসহ দেশব্যাপী তিন মাসের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই বিশেষ কর্মসূচি গত ৬ জুন সকালে রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবরে উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সচেতনতা বৃদ্ধির পরও যদি অবহেলা পাওয়া যায়, এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়, তাহলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সর্বোচ্চ জরিমানার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার দেশজুড়ে মাইকিংসহ ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করেছে। আমরা সবার কাছে এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে চাই যে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পানি জমতে না দেওয়াই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায়। চিকিৎসা নিশ্চিতেও আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। রোগীদের চিকিৎসাসেবায় কোনো ঘাটতি না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলেও সাধ্যমতো সবার চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে।

এদিকে গত ৭ জুন ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট-বিষয়ক একটি জাতীয় ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স কার্যক্রমের প্রথম ব্যাচের উদ্বোধন করা হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়েও এই প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করা হবে। প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্লাজমা লিকেজ সময়মতো শনাক্ত করা। রোগীর অবস্থা কখন সংকটজনক পর্যায়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক নজর রাখতে হবে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় উপকরণ মজুদ দরকার। আমরা ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ স্যালাইন সংগ্রহ করেছি। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই প্রয়োজনীয় স্যালাইনের বড় অংশ হাতে চলে আসবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও গাইডলাইন নিয়ে গত গত ১ ও ২ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ে আলোচনা সভা হয়। সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, স্বাস্থ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। দুই দিনের সভায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন, মৃত্যু হয় এক হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে ভর্তি হয় এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন, মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে ভর্তি হয় এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন, মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। চলতি বছর গত ৭ জুন পর্যন্ত ৭১১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত