নির্বাচনটা তারা সুষ্ঠু দেখতে চায়

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচনকে সামনে রেখে যে সম্প্রতি মার্কিন ভিসানীতি দেওয়া হয়েছে সেটাকে দুইভাবে দেখা যায়। এই যে ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্রকে সমর্থন বা সুষ্ঠু নির্বাচনকে সমর্থন, এটার মধ্যেও একটা জিও-পলিটিক্যাল দিক আছে। সেটা কীরকম? একটা হলো তাত্ত্বিক পর্যায় থেকে দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবেই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছে। সেটা বিভিন্ন পর্যায়ে, বহুমাত্রিকভাবে। সেই সম্পর্কটা কিন্তু গত ৫২ বছরে ইতিবাচকভাবেই আবর্তিত হয়েছে। যেমন প্রথম দুই দশকের কথা যদি ধরি, সেই সম্পর্কটা ছিল মূলত এইড নির্ভর। ওই সময় বাইরে থেকে আমরা যে আর্থিক অনুদানগুলো পেতাম তার একটা বড় কন্ট্রিবিউটর বা অংশীদার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা যে আর্থিক অনুদান দিত তার ভিত্তিতে আমরা আমাদের অর্থনীতিটা চালু রাখার চেষ্টা করতাম। আমাদের বাজেটও হতো সেভাবে। প্যারিস ক্লাবের পয়সা থেকেই তখন আমাদের বাজেট হতো। আমরা প্যারিসে গিয়ে জেনে আসতাম যে ডোনাররা কত দেবে, তার ভিত্তিতে আমরা বাজেট তৈরি করতাম। আর প্যারিস ক্লাবের সবচেয়ে বড় দাতা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের সবচেয়ে বড় ডোনারও তারা। স্বাধীনতার প্রথম দুই দশক এই নির্ভরতাটা ছিল। তার পরের ২০ বছরে দেখা যায় সম্পর্কটা বিবর্তিত হয়েছে। সেই এইড বা অনুদান নির্ভর সম্পর্ক থেকে এটা কিন্তু বাণিজ্যিক সম্পর্কে পরিবর্তিত হয়েছে। এই পর্যায়ে সম্পর্কটা লেনদেনের দিকে গেল। অর্থাৎ আগে আমরা একপাক্ষিকভাবে তাদের কাছ থেকে কেবল সাহায্য নিতাম পরে লেনদেনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিকে গেলাম। এর মধ্য দিয়ে সম্পর্কেও একটা গুণগত পরিবর্তন হলো। বাংলাদেশের ৫২ বছরের হিসেবে এর পরের ১২ বছর যদি ধরি তাহলে এই সময়ে সম্পর্কটা কৌশলগত সহযোগিতার জায়গায় এসেছে। ২০১২ সালে আমাদের মধ্যে পলিটিক্যাল ডায়ালগ শুরু হয়েছে। সিকিউরিটি ডায়ালগ, ইকোনমিক ডায়ালগ হয়েছে। তখন থেকে এসব শুরুর পর এখন কাঠামোটা অনেক বেশি নিয়মতান্ত্রিক হয়েছে। একটা সম্মানজনক জায়গায় পারস্পরিক সহায়ক হিসেবে আমাদের সম্পর্কটা তৈরির দিকে এগিয়ে নিয়েছি। এর ফলে সম্পর্কে নতুন যে উপাদানগুলো যোগ হয়েছে বা প্রত্যাশাটা তৈরি হয়েছে সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ যেন গণতান্ত্রিক পথে যায়। আমরা একটা বড় জনগোষ্ঠীর দেশ, বঙ্গোপসাগরের পাশেই আমাদের অবস্থান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একটা সংযোগ স্থাপনের ভৌগোলিক অবস্থানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশ কৌশলগত গুরুত্বও তৈরি করেছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপিয়ান বা পশ্চিমা জগৎ এশিয়া অঞ্চলের ইতিবাচক অর্থনীতির অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে যখন বিশেষভাবে নজর দিচ্ছে। সেই মনোযোগের দিক থেকে আমরাও সেই বিশেষ মনোযোগের বা তাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছি। এই কারণেই বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেহারা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সন্ত্রাসবাদবিরোধী যেসব কর্মকা- হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। আমেরিকার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটার মাত্রা এর মাধ্যমেই বোঝা যায়।

এবার যদি নতুন প্রেক্ষাপটে আসি। বাইডেন প্রশাসন আসার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আগের সেই সন্ত্রাসবাদবিরোধী গ্লোবাল ন্যারেটিভ থেকে বেরিয়ে এসেছে। এখন মার্কিন প্রশাসন তার অভ্যন্তরীণ কারণে, গত ৭/৮ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই গণতান্ত্রিক সংকট তৈরি হয়েছে। সেই সংকট থেকে উত্তরণের আলোকেই এখন অনেক কিছু হচ্ছে। তারা মনে করছে যে বাইরের পৃথিবীটাতেও যদি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করা যায় তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে বৈশ্বিক স্বার্থ আছে সেটা রক্ষা করা যাবে না। এখানে বৈশ্বিক স্বার্থ বলতে তাদেরই কৌশলগত স্বার্থের কথা বুঝিয়েছি। তারা একটা রুল বেজড গ্লোবাল অর্ডারের কথা বলে। সেখানে মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু থাকার কথা বলে। এগুলোর সবই তো আমাদের জন্যও ইতিবাচক। ভারত মহাসাগরে বা বঙ্গোপসাগরে যদি রুল  বেজড মানে আইনের শাসন থাকে বা সমুদ্রপথটা যদি নির্বিঘ্ন হয় তাহলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন বর্তমান প্রশাসনের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো গণতন্ত্র। বাইডেন প্রশাসন পরিষ্কার বলেছে, গণতান্ত্রিক বিশ্ব, অগণতান্ত্রিক বিশ্ব। তারা গণতান্ত্রিক বিশ্বটাকেই শক্তিশালী করতে কাজ করবে এটা তো ঘোষণাই করা হয়েছে। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও গণতন্ত্র যাতে শক্তিশালী হয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যেন চালু থাকে সে লক্ষ্যে সক্রিয় হয়েছে। কাজেই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই দুটি মৌলিক বিষয়কে যদি আমরা দেখি তাহলেই বোঝা সম্ভব হবে যে এখানে কীভাবে আমরা কৌশলগত জায়গায় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছি।

এখন ভূ-রাজনৈতিক জায়গার প্রসঙ্গে আসি। এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বন্ধু বাড়াতে চাইছে এটা যেমন সত্যি কথা তেমনি আমরা তো নিজেদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু বলেই মনে করি। সে ক্ষেত্রে তাদের যে পরিকল্পনা সেখানে কয়েকটা বিষয় আছে। একটা হচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি। অর্থাৎ এই ভারত মহাসাগর অঞ্চলকে ঘিরে তারা এখন বন্ধু বা একটা গণতান্ত্রিক বাতাবরণ তৈরি করতে আগ্রহী। এরও কারণ রয়েছে। তারা মনে করে চীন অগণতান্ত্রিক। কাজেই চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো আমার বন্ধু হিসেবে থাকলে মার্কিন অবস্থানটা শক্তিশালী হয়। এজন্য তারা চাইছে আমরা যেন আদর্শিকভাবে গণতন্ত্র চর্চার মধ্যে থাকি।

গণতন্ত্র কিন্তু শাসক দলের গণতন্ত্র না বা শাসনব্যবস্থার গণতন্ত্র না। গণতন্ত্রের মূল বক্তব্য হচ্ছে জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার। সেটাই হচ্ছে গণতন্ত্র। কাজেই সেই গণতন্ত্রের আলোকে জনগণই নির্ধারণ করবে কারা শাসন ক্ষমতায় থাকবে। এবং সেটা ঠিক করার প্রক্রিয়াটাই হচ্ছে নির্বাচন। যদি লক্ষ করি, গণতান্ত্রিক চর্চার কথা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই বলছে না, অন্যরাও বলছে। আমাদের প্রতিবেশীরাও তাই-ই প্রত্যাশা করে। এখন এটা নিয়ে ভিসানীতি দেওয়াতে বা ব্লিঙ্কেন সাহেব কথা বলেছেন বলে আমাদের একটু খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া সবাই চায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা চালু থাকুক ও সেটা শক্তিশালী হোক। এর মধ্য দিয়ে মানুষের অধিকারের জায়গাটাও সাবলীল থাকুক। নিরাপদ থাকুক। বিশ্বের যে বড় বড় অর্থনীতি আছে যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আমাদের গার্মেন্টসের বড় চালান যায় সেখানে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সিঙ্গেল এক্সপোর্ট ডেস্টিনেশন। জাপান আমাদের এক নম্বর বাই ন্যাচারাল ডোনার। তারপর ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসংঘের কথাও এক। জাতিসংঘ তো স্পষ্ট করেই গণতান্ত্রিক চর্চার কথা বলেছে। কাজেই লক্ষ করলেই বোঝা যাবে যে, এখানে একটা বৈশ্বিক আকর্ষণ বা অ্যাটেনশন যদি বলি, সেটা কিন্তু বাংলাদেশ পাচ্ছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা হোক মানুষ তার অধিকারটা পাক। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিটাও চালু থাকুক, নির্বিঘœ থাকুক। এসব নিয়ে দেশে-বিদেশে একটা সচেতনতা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ব্লিঙ্কেন সাহেব যেটা বলছিলেন যে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনটার দিকে বিশ্ব তাকিয়ে আছে। এই জায়গাটায় আমরা তার একটা ইঙ্গিত বা প্রতিফলন দেখতে পাই। আমরা সামগ্রিক অর্থে বিবেচনা করি তাহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চা, আগামী নির্বাচন, মানুষের অধিকারের মতো বিষয়গুলো যে শুধুমাত্র আমাদের জন্যই প্রয়োজন বা দরকার তা নয় কিন্তু। বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশকে অন্যরা কীরকম দেখতে চায় তারও একটা ইঙ্গিত রয়ে গেছে। এটা তো আমাদের জন্যও ইতিবাচক হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তো ইতিমধ্যেই বলেছে যে আমরা যদি জিএসপি প্লাস পেতে চাই তাহলে আগামী নির্বাচনটা তারা সুষ্ঠু দেখতে চায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সেটা দেখতে চায়। জাপানও তার প্রত্যাশার কথা বলেছে। আর চীন যে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু থাকুক সেটা চায় না, সেটা কিন্তু কখনই বলেনি। চীন চায় এমন একটা বাংলাদেশ যেটা স্থিতিশীল, অগ্রসরমাণ। কাজেই আমাদের বন্ধু বলেন আর উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র, তারা সবাই কিন্তু এই একটা ব্যাপারে সহমত বলে আমার মনে হয়েছে।

এক্ষেত্রে তাদের চাওয়া তো আছেই তার চেয়ে বড় তো আমাদের নিজেদের চাওয়া। সেটা হলো শান্তিপূর্ণভাবে, টেকসইভাবে আমাদের এই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সেজন্য সবচেয়ে উত্তম পথ হচ্ছে গণতান্ত্রিক চর্চাটাকে সাবলীল রাখা। তবে মার্কিন ভিসানীতির ক্ষেত্রে এখানে বাংলাদেশের দিক থেকে চীন-রাশিয়ার দিকে খানিকটা ঝুঁকে থাকার প্রবণতার বিষয়টির কথা অনেকে বলতে পারেন। তা খানিকটা থাকলেও আমি মনে করি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলে অটোমেটিক্যালি ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু হয়ে যাব। স্থিতিশীলতার জন্যও এটা দরকার। শ্রীলঙ্কার উদাহরণই যথেষ্ট। দেশটির পরিস্থিতির জন্য পুরোটা না হলেও চীনা ঋণের একটা ভূমিকা আছে। চীনা সহায়তার প্রশ্নে পাকিস্তানেরও প্রায় একই অবস্থা। তারা এখন আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিতে চেষ্টা করছে। তাদের দৃষ্টিতে চায়না একটা সমস্যা। তাই এই দেশগুলো যাতে সেদিকে না যায় সেজন্য একটা কৌশলগত জায়গা পশ্চিমাদের থাকতে পারে। কিন্তু তাদের এই কনসার্ননেস বা সহায়তার উপাদানটা কাজে লাগবে না, যদি দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক না থাকে।