নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ও উৎকণ্ঠা, সংলাপ নিয়ে বিতর্ক আর নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা সংকোচনের বিষয়ে উদ্বেগ নিয়ে চলছে সরগরম আলোচনা। নির্বাচন নিয়ে কথা উঠলে স্বাভাবিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকার পাশাপাশি আলোচনায় আসে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেমন হবে। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশা, সবসময় ছিল এবং আছে। নির্বাচন কমিশনের যতটুকু ক্ষমতা আছে, সেটা প্রয়োগে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সবসময় ছিল। কিন্তু যখন নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়, তখন আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়। নির্বাচন নিয়ে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে, সেখানে হস্তক্ষেপ করা এবং প্রয়োজনে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল নির্বাচন কমিশনের। উনিশশ বাহাত্তর সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৭ম অধ্যায়ের ৯১(ক) ধারায় বলা হয়েছে যে, নির্বাচনে বলপ্রয়োগ, ভীতি-প্রদর্শন ও চাপ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিরাজমান অপকর্মের কারণে যুক্তিযুক্ত, ন্যায়সঙ্গত এবং আইনানুগভাবে নির্বাচন পরিচালনা নিশ্চিত করতে, নির্বাচন কমিশন যেকোনো ভোট কেন্দ্র বা (ক্ষেত্রমতে সম্পূর্ণ নির্বাচনী এলাকায়) নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে ভোট গ্রহণসহ নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সংশোধনী এনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার সংকোচনের কেন প্রয়োজন পড়ল তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ এবং বিতর্ক।
নির্বাচনকালীন সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য। ১১টি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশে। প্রতিটি নির্বাচন নিয়ে কমবেশি বিতর্ক আছে। কিন্তু ৪টি নির্বাচন আপাত সুষ্ঠু হয়েছে বলে মনে করা হয়। যেগুলো হলো ১৯৯১ সালের নির্বাচন, ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন, ২০০১ সালের নির্বাচন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন। একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, এসব নির্বাচন কোনো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি। সে কারণেই এই দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে যে, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য দলীয় সরকার নয়, একটি গ্রহণযোগ্য তদারকি সরকার দরকার। কিন্তু কী হবে সেই সরকারের রূপরেখা? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে একসময় উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক অঙ্গন। আন্দোলনে দাবি আদায়ও হয়েছিল, কিন্তু যে রাজনৈতিক দলের আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা ছিল তারাই এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবল বিরোধী। হাইকোর্টের রায়ের উদাহরণ দিয়ে তারা নাকচ করে দিচ্ছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ধারণা। ফলে নির্বাচনের চাইতে নির্বাচনকালীন সরকারের গ্রহণযোগ্যতাই এখন বিতর্কের প্রধান ইস্যু।
যেকোনো রাজনৈতিক সমস্যার উদ্ভব হলে, তার সমাধানের পথ খুঁজতে থাকেন সবাই। সংঘাত বাড়ানো নাকি আলোচনা করে সমাধানের পথ খোঁজা হবে এই প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহল। চূড়ান্ত সংঘাতে একটা ফয়সালা করা বা এসপার ওসপার একটা কিছু হয়ে যাক অথবা আলাপ-আলোচনা করে কিছু ধরে কিছু ছেড়ে একটা আপাত সমাধান করা এই দুই পক্ষে মতামত আসতে থাকে। এ ক্ষেত্রে সংঘাত, সহিংসতা এড়িয়ে আপাত সমাধানের জন্য সংলাপের বিকল্প নেই বলে একটা প্রবল জনমত আছে। সংলাপ তো একা একা হয় না। বিবদমান পক্ষগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তখনই দরকার হয় গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারীর। এটা নিয়েও চলছে কথার লড়াই।
ক্ষমতাসীন জোট ১৪ দলের সমাবেশে গণতন্ত্রের স্বার্থে, প্রয়োজনে জাতিসংঘের প্রতিনিধির মধ্যস্থতায় বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী বক্তব্য দিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজনে জাতিসংঘের প্রতিনিধি আসুক আমরা বিএনপির সঙ্গে মুখোমুখি বসে আলোচনা করে দেখতে চাই, কীভাবে সবাই মিলে একটি অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায়। সেটা আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা হতে পারে, অন্য কোনো পথে নয়। তার এই বক্তব্য আলোচনার টেবিলে ঝড় তুলে দিল। আলোচনা, প্রশ্ন, সন্দেহ দেখা দিল এই বক্তব্যে। সংকট নিরসনে সরকার কি নতুন কোনো পথ উন্মোচন করলেন কিনা? আসলেই সরকার কি এ কথা ভাবছেন নাকি বাজারে কথা ছেড়ে দিলেন যাতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই চিন্তা কী নেতার ব্যক্তিগত না দলীয় সিদ্ধান্ত ইত্যাদি নানা কথা ডালপালা মেলতে শুরু করল, তার এই বক্তব্যের পর।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকরা ছুটতে থাকেন, অন্যান্য দায়িত্বশীল নেতাদের মন্তব্য জানার জন্য। এই বক্তব্যের পরদিন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, আলোচনার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। তিনি আরও বলেন, আমাদের নিজেদের সমস্যা আমরা আলোচনা করব। প্রয়োজন হলে নিজেরাই সমাধান করব। জাতিসংঘের মধ্যস্থতার কথাও উড়িয়ে দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, এখন বাইরের বিষয়টা কেন বারবার আসে? জাতিসংঘ কেন মধ্যস্থতা করবে? জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করবে এমন কোনো রাজনৈতিক সংকট এই স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত হয়নি। অন্যদিকে সচিবালয়ে সাংবাদিকরা জনাব আমুর বক্তব্য নিয়ে অবস্থান জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমির হোসেন আমু আমাদের দলের অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি তার ব্যক্তিগত বক্তব্য। তার এ বক্তব্য নিয়ে আমাদের দলের মধ্যে, সরকারের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। এমনকি ১৪ দলের মধ্যেও কোনো আলোচনা হয়নি।
সম্ভবত এসব কারণেই এ রকম একটি তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অবস্থান পরিবর্তন করে নিজের বক্তব্যকে তাৎপর্যহীন করে সরকারদলীয় এই গুরুত্বপূর্ণ নেতা। দলীয় এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন ইস্যুতে কাউকে আলোচনার জন্য আহ্বান করা হয়নি। আলোচনার জন্য কাউকে বলা হয়নি, কাউকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। কাউকে আহ্বান করা হয়নি। কাউকে আহ্বান করার সুযোগ নেই। এটা আওয়ামী লীগের বাড়ির দাওয়াত নয় যে, দাওয়াত করে এনে খাওয়াব।’
১৪ দলের এই মুখপাত্র আরও বলেন, জোটনেত্রী শেখ হাসিনা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে যে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সেটা তিনি করবেন। নির্বাচন হবে সংবিধানের ভিত্তিতে। সবাইকে সে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। আগামীতে ক্ষমতা কার হাতে থাকবে সেটা জনগণ নির্ধারণ করবে। সেই পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে বলা যায়, কিন্তু আলোচনার জন্য নয়। আগের কথায় সংশয় থাকলেও এবারের বক্তব্য পরিষ্কার।
সবসময় ক্ষমতায় যারা থাকেন তারা বলেন, দেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রটা কী নিয়ে এবং কীভাবে হচ্ছে তা যদি ক্ষমতাসীনরা জানতেই পারেন তাহলে কেন তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয় না? যেমন তিনি বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে ২০১৩ সাল থেকে বারবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। সেই নির্বাচনে জাতিসংঘ থেকে তারানকোকে (জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো) পাঠানো হয়েছিল। আমাদের সঙ্গে বৈঠকে আমরা তাদের সামনে প্রমাণ করেছিলাম, নির্বাচন না হলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। একটি দেশের জন্য সাংবিধানিক শূন্যতা কাম্য হতে পারে না। আজকেও নির্বাচন হবে সংবিধানের ভিত্তিতে। দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হতে দেওয়া যাবে না। তার এই বক্তব্যটাও একদম স্পষ্ট। সংবিধানকে ভিত্তি করেই সব সমস্যার সমাধান হবে।
সবার কথাই স্পষ্ট, কিন্তু সংবাদপত্র পাঠকেরা বিভ্রান্ত হয়ে যান, পরস্পরবিরোধী সংবাদ পাঠ করে। ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাই শুধু নন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা আছেন তাদের পরস্পরের বক্তব্যের মধ্যে বড় ফারাক যখন দেখেন তখন তাদের কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। যেমন সংলাপের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, সংলাপ চলমান থাকবে। সংলাপের বিকল্প নেই। আমরা মনে করি, সবকিছুই সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। কী পরিষ্কার কথা!
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগ একটি জনপ্রিয় দল। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে জনগণের ক্ষমতায় জনগণকে নিয়েই চলতে হবে। আর জনগণের ক্ষমতা অব্যাহত রাখতে হলে সবার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তাই আলোচনার বিকল্প কিছু নেই। তাহলে কোন কথা ছেড়ে কোন কথাকে বিবেচনায় নেবে মানুষ?
রাজনীতিতে সংকট ছিল না, এমন কোনো সময় কি বাংলাদেশে ছিল? জনগণের সংকট কী আর শাসনক্ষমতায় সংকট কী তা নিয়ে আলোচনা এবং বিতর্ক রাজনীতির প্রাণ। বলা হয়, বিতর্কই নাকি গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি আর ভিন্নমত নাকি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সংকট দেখা দিলে, সমাধানের পথ খুঁজে মানুষ। আর রাজনীতিতে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে, সংলাপের কথা ভাবতে থাকে। সে ক্ষেত্রে বিতর্ক আসবেই। কিন্তু দায়িত্বহীন কথা আর দায়হীন মন্তব্যে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ থেকে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি আর সৌন্দর্য কি হারিয়ে গেল?
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট
rratan.spb@gmail.com