গত ১৬ জুলাই নোবেল বিজয়ী, বিজ্ঞানী, কূটনীতিক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ধর্মীয় নেতা এবং সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান মিলে দুইশরও বেশি মানুষ মিলিত হয়েছিলেন রোমের ক্যাপিটোলাইন হিলে। তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলে স্বাক্ষর করেন : ‘নিরস্ত্র ও শান্তির জন্য রোম ঘোষণা’। এই ঘোষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পারমাণবিক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, নতুন ডিজিটাল প্রটোকল এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল উন্নয়নের যুগে শান্তির প্রত্যয় ব্যক্ত করে। ইতালীর রোমে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারমাণবিক যুদ্ধ বিষয়ক নোবেল বিজয়ী সমাবেশ’ শেষে এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে রোম ঘোষণা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান বিশ^ ডিজিটাল বলয়ে আবৃত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার বিশ্বকে অস্থির করে তুলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি আয়না, যা ডিজিটাল ও ভূরাজনৈতিক জটিলতার এ যুগে আরও গভীরে প্রবেশ করা বাংলাদেশকে একটি জাতি হিসেবে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার তাগিদ দেয়।
রোম ঘোষণায় বলা হয়েছে, মানবতা এখন একসঙ্গে দুটি বিপজ্জনক প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে। একটি হলো, ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা আর অন্যটি হলো ক্রমে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির প্রতিযোগিতা। ঘোষণাটি স্পষ্ট করে বলে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত কখনোই সম্পূর্ণভাবে যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। রোম ঘোষণায় পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ওপর নতুন করে বৈশ্বিক চুক্তির আহ্বান জানানো হয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার করাল গ্রাস থেকে মুক্তির জন্য কঠোরতর নিয়মের দাবি জানান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা এমন একটি ডিজিটাল ভবিষ্যৎ চান, যা কেবল ক্ষমতার রাজনীতি বা করপোরেট মুনাফার ওপর নয়, বরং মানবিক মর্যাদার ওপর গড়ে উঠবে। ঘোষণাটি স্বীকার করে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক ভালো কাজ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি পারমাণবিক কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে, তাহলে অনিচ্ছাকৃত বা আকস্মিক সংঘাতের ঝুঁকি তীব্রভাবে বাড়তে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক নেতাদের কেউ কেউ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। বাংলাদেশের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের কোনো কর্মসূচিও নেই। তাই এটা ভাবা সহজ যে, ভ্যাটিকানে নোবেল বিজয়ীদের স্বাক্ষরিত একটি ঘোষণার সঙ্গে ঢাকার নীতিনির্ধারণের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু অন্তত তিনটি কারণে এটি একটি ভুল ধারণা হবে।
প্রথমত, বৈশি^ক অনিরাপত্তার সীমান্ত থাকে না। বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যা পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের দ্বারা প্রভাবিত। পারমাণবিক সংযম কোথাও দুর্বল হলে বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো সংকটে গুরুতর ভুল হিসাব ঘটালে, তার আঘাত ছড়িয়ে পড়বে। বাংলাদেশ এর আওতামুক্ত থাকবে না। এটি অর্থনৈতিক অস্থিরতা, শরণার্থী বৃদ্ধি, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা, এমনকি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে একটি ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর জাতিতে পরিণত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরকারি সেবা, ব্যাংকিং, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা এবং ক্রমবর্ধমানভাবে পুলিশি ও নজরদারিতে প্রবেশ করছে। ঘোষণার মূল সতর্কবার্তাটি সহজ : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাকে প্রকৃত মানবিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকতে হবে। তৃতীয়ত, শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী নৈতিক নেতৃত্বের রেকর্ড রয়েছে। বাংলাদেশ পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তির একটি প্রাথমিক ও সোচ্চার সমর্থক হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশ প্রায়ই পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণে বড় কণ্ঠস্বরে কথা বলেছে। রোম ঘোষণা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই বেশ কয়েকটি স্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের উচিত জাতিসংঘ, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, সার্ক, বিমসটেক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাসহ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রোম ঘোষণা বিষয়ে কথা বলা। মানবিক ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের নৈতিক বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর কাছে তুলে ধরতে হবে।
জীবন পরিবর্তনকারী বা জীবন সমাপ্তকারী কোনো সিদ্ধান্ত কখনোই সম্পূর্ণভাবে কোনো অ্যালগরিদমের হাতে থাকা উচিত নয়। পুলিশি, অভিবাসন, চিকিৎসা এবং কল্যাণ সুবিধার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের আগে সুরক্ষাব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতিশাস্ত্র ও ডিজিটাল সাক্ষরতা শেখাতে হবে। রোম ঘোষণা সতর্ক করে দেয়, ডিজিটালি দক্ষ কিন্তু নৈতিকভাবে অন্ধ একটি সমাজ যেন প্রতিষ্ঠিত না হয়। বাংলাদেশ রোম ঘোষণার চেতনা প্রচার করতে পারে, যা প্রতিবেশীদের মধ্যে পারমাণবিক সংযম এবং প্রতিরক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিয়ে আস্থা তৈরির পদক্ষেপকে উৎসাহিত করতে পারে। এশিয়া অঞ্চলে অবিশ্বাস প্রায়ই সংলাপের চেয়ে দ্রুত এগিয়ে চলে, সেখানে এমন প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রোম ঘোষণা মূলত বিনয়ের আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি পারমাণবিক বোমা থেকে শুরু করে জটিল অ্যালগরিদম পর্যন্ত সবসময় মানবিক বিবেকের নির্দেশনায় থাকতে হবে। বাংলাদেশ হয়তো পারমাণবিক অস্ত্র বা ফ্রন্টিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল তৈরি করবে না, কিন্তু ডিজিটাল রূপান্তর গ্রহণকারী এবং শান্তি সমর্থনের গর্বিত ঐতিহ্যবাহী একটি জাতি হিসেবে, এই ঘোষণার দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এটি করার মাধ্যমে, বাংলাদেশ কেবল একটি বিদেশি দলিল অনুমোদন করবে না; বরং এটি এমন একটি বিশ্বের প্রতি তার নিজস্ব দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার নবায়ন করবে, যেখানে প্রযুক্তি মানবিক মর্যাদার হুমকি নয়, বরং তার সেবক হবে।
লেখক : নির্বাহী সদস্য, পেন বাংলাদেশ
