ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অতিথি চীন

বহু শতাব্দী ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বিরাজ করছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে তার মৃত্যু হয়। এরপর বিজয়ীরা আপন খেয়ালখুশি মতো পুরো অঞ্চলের নকশা আঁকে, কাটাকুটি করে। কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ডিজাইন করা হয়েছে এ বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ জানাতে ডেভিড ফ্রমকিন ও জেমস বার নামের দুই ব্রিটিশ লেখক দুটি বই লিখেছেন। ফ্রমকিনের বইয়ের নাম ‘এ পিস টু অ্যান্ড অল পিস’। তিনি দেখিয়েছেন, ভার্সাই শান্তিচুক্তি কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির যবনিকা টেনেছে এবং এই অঞ্চলের বিপর্যয় রোধ করার বদলে অতলে ডুবিয়েছে। জেমস বারের বইয়ের নাম ‘এ লাইন ইন দ্য স্যান্ড’।

দুটি বই-ই যুক্তি-প্রমাণসহ উপস্থাপন করেছে যে, উপজাতি, সম্প্রদায় এবং ভৌগোলিক বিবেচনার তোয়াক্কা না করে কতটা অযত্নে সে সময় বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্ত রেখা টানা হয়েছে। এই তাড়াহুড়া ও অসতর্কতার ফল ভোগ করছি আমরা। শতাব্দীকাল পরে আজ আমরা কেবল আশাই করতে পারি যে, একদিন নিশ্চয় সীমান্তগুলো শীতল হবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে আপন সমস্যার সমাধান করবে।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকানরা এসেছে তারও বহু পরে। ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত শুরু হয়েছে। তারপর কেটে গেছে ৭০ বছরেরও বেশি সময়। আজ আর মার্কিন প্রভাব পিদিম এখানে ঝলমলে নেই। নতুন অতিথি এসেছে চীন। যদিও ওয়াশিংটনের দাবি, এখনই তারা বিদায় নিচ্ছে না। তবে এ অঞ্চলে প্রভাব টিকিয়ে রাখতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার উপস্থিতি বাড়ানো উচিত হবে কি না এ নিয়ে তারা বেশ কিছুদিন দ্বিধার মধ্যে ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্ব যেভাবে বেড়েছে, তাতে চাইলেও ওয়াশিংটনের পক্ষে সামরিক উপস্থিতি হ্রাস করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। চীনও বসে থাকছে না, চারদিক থেকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি করে চলেছে।

মধ্যপ্রাচ্য কি তাহলে এবার সত্যিই পুনর্গঠনের দুয়ারে দাঁড়িয়েছে? একসময় এখানে চীনের অস্তিত্ব বলতে গেলে ছিলই না। কীভাবে কীভাবে সে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়েছে। কয়েকটি খাতে সুনির্দিষ্ট ভূমিকাও পালন করছে। যদিও সামরিক সমভিব্যাহারে এখনই মধ্যপ্রাচ্যে আসার পক্ষে নয় বেইজিং। তবে নিজেকে অর্থনৈতিক অধিকর্তা হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত করতে এবং কূটনৈতিক ওজনও বাড়িয়ে তুলতে কসুর করছে না। হতে পারে শেষ পর্যন্ত স্বার্থরক্ষার প্রয়োজনেই তাকে সেনাবহর মোতায়েন করতে হবে।

চীনের উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ভূমিকা আরও দমিয়ে দেবে বলে মনে হয়। ইরাকে মার্কিন হস্তক্ষেপ এই অঞ্চলের বহু চিত্র বদলে দিয়েছে। যুদ্ধে ইরাকের অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে ব্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যয় ধরা হয় ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে। এ তো গেল টাকা-পয়সার হিসাব। মানবিক মূল্য? প্রায় ৫ মিলিয়ন শিশু এতিম এবং ১০ লাখ ইরাকির জীবন ভেনিশ। সেনা ছাড়াও ৭ হাজারের বেশি আমেরিকান কর্মী এবং ৮ হাজারেরও বেশি ঠিকাদার মারা গেছে। মালি ও নাইজেরিয়ার মতো আইএস এ অঞ্চলে স্থায়ী মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে এবং তাদের নির্মূল করার পথ থেকে আমরা এখনো বহুদূরে। ইরাক কার্যত তিনটি ভাগে বিভক্ত উত্তরে কুর্দি, দক্ষিণে শিয়া এবং মাঝখানে সুন্নি।

গত ইরাক যুদ্ধের সময় আমি (নিবন্ধের লেখক) ছিলাম তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ইরাকের উত্তরে একটি নতুন ফ্রন্ট খুলতে আমেরিকা চাচ্ছিল তুরস্কের মধ্য দিয়ে তাকে একটি করিডোর দেওয়া হোক। তুরস্কের সংসদ তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। এই সিদ্ধান্ত ইরাক যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়নি বটে, তবে তুরস্কের সংসদ নিশ্চয় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কূটনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ রেখেছে। পরে অবশ্য তুরস্ককে মার্কিন চাপের মুখে পড়তে হয়েছে এবং নতি স্বীকারও করতে হয়েছে, কিন্তু সে চাপ দীর্ঘ হয়নি, ধীরে ধীরে কেটে গেছে।

চীনের কথায় আসি। চীন মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে। স্থিতিশীলতা বাড়লে লাভ হবে উভয়েরই। দ্বন্দ্বের সব উৎস রাতারাতি নির্মূল হবে না নিশ্চয়, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব বিবর্ণ হতে থাকবে। কয়েক বছর ধরে রিয়াদ ও তেহরানের সম্পর্কের পারদ ওঠানামা করছিল। চীনের মধ্যস্থতায় একটা গতি হলো অবশেষে। একটি নতুন যুগের সূচনার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যে অশান্তির মধ্য দিয়ে গেছে, তাতে পারস্পরিক সম্পর্কের পুনর্গঠনের বিকল্প নেই।

২০১৬ সালে ইরানের দাঙ্গার সময় তেহরানে সৌদি দূতাবাস এবং মাশহাদে সৌদি কনস্যুলেট ভাঙচুর হলে সৌদি-ইরান সম্পর্ক ভেঙে যায়। ২০২০ সালে চীন উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাবও পেশ করে।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে শি জিনপিং সৌদি আরব সফর করেন এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের আওতায় উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসন খাতে ২৯.৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ২০টিরও বেশি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ইরান-সৌদি উভয়কে চীন ‘বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদার’-এর মর্যাদা দিয়েছে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ এমন মর্যাদা পেয়েছে বলে নজির নেই। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছে, তাতে চীন যদি এই অঞ্চলে বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেয়, তাহলে ইরান খানিকটা স্বস্তি পাবে নিশ্চয়।

ওদিকে ইসরায়েলে নেতানিয়াহু সরকারের ক্ষমতা যেহেতু ক্ষয়িষ্ণু হয়ে এসেছে, সুতরাং ফিলিস্তিন সমস্যাও এই সুযোগে সমাধান করে নেওয়া যায় কিনা ভাবা উচিত। এ জন্য প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহ ২০০২ সালে ‘আরব শান্তি উদ্যোগ এজেন্ডা’ গ্রহণ করেছিলেন, সেটাকে ফিরিয়ে আনাই হবে যুক্তিযুক্ত এবং পরিস্থিতি সৌদি আরবের জন্য উপযুক্তও হয়ে উঠেছে।

চীন এমন একটি দেশ, যেটি পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে সমান দূরত্ব বজায় রাখে। তারা কেবল প্রয়োজন হলে সাহায্যের হাত বাড়ায়, এ কারণে তার হাতে সহজে দাগ পড়ে না। চীনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি যত বাড়বে, এ অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব তত ভারসাম্যপূর্ণ হবে। নিশ্চয় আমরা স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যের দুয়ারে পৌঁছে গেছি, তবে এখনো কিছুটা রাস্তা বাকি।

লেখক : তুরস্কের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন একে পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক