দূষণ দখল

নদী বাঁচাতে সমন্বিত ব্যবস্থা চাই

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৪ এএম

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ নদীর পানি পান করত। দূষণের কারণে অধিকাংশ নদীর এখন এমন সংকটজনক অবস্থা হয়েছে যে, পান করা তো দূরের কথা, অনেক সময় সাধারণ কাজের জন্যও ব্যবহার করা যায় না। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও শহরাঞ্চলে প্রায় সব নদী চরম দূষণের শিকার, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে গেছে।

কীভাবে নদীগুলোর এমন পরিণতি হলো, তা প্রায় সবার জানা। ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কর্ণফুলীর মতো নদীগুলোয় অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য ও মানববর্জ্য সরাসরি ফেলা হয়। শিল্পকারখানার ক্ষতিকর রাসায়নিক ও তরল বর্জ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিশোধন না করেই ফেলা হয় নদীগুলোয়। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে অনেক নদী-খালের তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এতে বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হয়। তীর দখল করে স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণও নদীরক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা।

দূষণ আর দখলের মারাত্মক প্রভাবে নদীর সঙ্গে যাদের বসবাস এবং নানা কারণে নদীর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল, এমন মানুষদের চর্মরোগ, পেটের পীড়া, এমনকি ক্যানসারের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হতে হচ্ছে। নদীগুলোয় জলজ প্রাণীর টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণায় দেশের ৫৬টি নদীর দূষণের মাত্রা পরীক্ষা করতে গিয়ে সবকটি অতিমাত্রায় দূষিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এরমধ্যে গাজীপুরের লবণদহ, নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া ও হবিগঞ্জের সুতাং এই তিন নদীর অবস্থা ভয়াবহ। কেবল লবণদহ নদীর তীরে প্রায় ২৫০টি শিল্পকারখানা হয়েছে। একসময়কার প্রবল স্রোতের অনেক নদী ক্ষীণ খালে পরিণত হয়েছে। 

 দেশের সংবিধানে নদীকে জনসম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আছে। কিন্তু নদীরক্ষায় সত্যিকার অর্থে কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ সদিচ্ছার অভাবে নেওয়া হয়নি বললেই চলে। এমন পরিস্থিতিতে নদীদূষণ রোধে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার এক বৈঠকে এ নির্দেশ দেওয়ার আগে তিনি বলেছেন, ‘নদীদূষণ এখন দুর্বিষহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত পোষণ করি। কারণ, নদীসহ সব প্রাকৃতিক সম্পদ কোনোরকম ক্ষতি না করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরের জন্য আমাদের কাছে আমানত হিসেবে আছে। এ আমানত রক্ষা করতেই হবে।

নদীদূষণ রোধে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে কোনো ধরনের অবহেলার সুযোগ নেই, এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সঠিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন। পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ব্যবহার, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের নির্দেশনা এসেছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে।

নদীদূষণ ও দখলের সমস্যাটি এত ব্যাপক ও গভীর যে, কেবল সরকারের উদ্যোগে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা দুরূহ। তাই এ বিষয়টিকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে   নেওয়া উচিত। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে হবে। নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী ও নাগরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

দেশের নদী ও খালপাড়ের ভাঙন রোধ, উপকূলীয় বাঁধ সংরক্ষণ, সড়ক ও রেললাইনের পাশে কংক্রিটের ব্লক ও জিও ব্লকের পরিবর্তে ‘বিন্না ঘাস’ ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, নদী ও খালের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে পরিবেশসম্মত, টেকসই ও আর্থিক দিক থেকে সাশ্রয়ী হলে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি না থাকলে প্রাকৃতিক সমাধানকে স্বাগত জানানো যেতে পারে।

আমরা চাই, সবার সমন্বিত চেষ্টায় নদীগুলো দূষণ-দখলমুক্ত হোক। কৃষিসহ নদীতীরের জনপদে জীবন ও জীবিকা রক্ষা পাক। জলজ স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকুক। মানুষ বাঁচুক নদীর সঙ্গে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত