গর্বের ‘প্রথমে’ জড়িয়ে আসিফের নাম

তখনো এই ধরায় ভূমিষ্ঠ হননি। পরম মমতায় বেড়ে উঠছিলেন মায়ের গর্ভে। এক বিকেলে লালবাগে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে পাশের মাঠে ফুটবল খেলা দেখছিলেন তার মা। হঠাৎ একটা ফুটবল উড়ে এসে আঘাত হানে তার পেটে। আট মাসেই পৃথিবীতে পা রাখেন আসিফ। যে ফুটবল তাকে একটু আগেভাগেই পৃথিবীতে এনেছিল, তার ঋণ শোধ করতেই নিরাপদ জীবন ছেড়ে আসিফ বেছে নিয়েছিলেন ভীষণ ঝুঁকির এক জীবন। বলছি বাংলাদেশের প্রথম এএফসি প্রো-লাইসেন্সধারী কোচ এস. এম. আসিফুজ্জামান আসিফের কথা। দীর্ঘ আড়াই বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফল গত শনিবার পেয়েছেন বসুন্ধরা কিংসের সহকারী কোচ আসিফ। ৪৭ বছর বয়সে তার নাম দিয়ে ইতিহাসের পাতায় সূচনা হয়েছে নতুন এক অধ্যায়ের।

বাংলাদেশ জাতীয় দল দূরে থাক, কখনো শীর্ষ লিগেও খেলা হয়নি। ফুটবল ক্যারিয়ার মাত্র চার বছরের।  খেলা ছেড়ে পড়ালেখায় মন দিয়েছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষে দারুণ একটা চাকরিও জুটিয়ে ফেলেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে। আট বছর সেই চাকরি করার পর আসিফের হঠাৎই একদিন মনে হলো, ‘এই জীবনটা আসলে আমার নয়। দূতাবাসের চাকরিটা সব দিক থেকেই ছিল আকর্ষণীয়। কিন্তু ফুটবল যে আমার রক্তে। ফুটবলের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলাম মায়ের পেটে থাকতেই। সেটার অমোঘ আকর্ষণ ভুলে থাকতে পারিনি বলে সুখ আর নিরাপদ জীবনকে না বলে পা রাখি এক অনিশ্চিত জগতে।’

চাকরি ছেড়ে কোচিংয়ের ওপর পড়ালেখা করার সিদ্ধান্তটা ছিল ভীষণ সাহসী ও পরিবারের শতভাগ সমর্থন আর নিজের ওপর বিশ্বাস, ‘এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমার উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়। লন্ডনে গিয়ে যখন ইংল্যান্ড এফএ-র অধীনে লেভেল-১ ও লেভেল-২ কোর্স শুরু করি, তখন আমার ঘরে স্ত্রী-সন্তান। দেশে পরিবার চালাতে, কোর্স ফি জোগাতে আমাকে পার্টটাইম চাকরি করতে হয়েছে। তারপরও সেই কোর্স শেষ করে ২০১০ সালে লন্ডনেই একটি কমিউনিটি ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১২ দল দিয়ে শুরু হয় কোচিং ক্যারিয়ার।’ এর এক যুগ পর আসিফ নাম লিখিয়েছেন দেশের উচ্চশিক্ষিত কোচদের তালিকার শীর্ষে। না, কেবল থিওরিটিক্যাল নন, হাতে-কলমেও এই সময়ে নিজেকে প্রমাণ দিতে হয়েছে আসিফকে। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে আরামবাগ, অগ্রণী ব্যাংকের পর বসুন্ধরা কিংসকে শীর্ষ লিগে তুলে আনার নেপথ্য নায়ক তিনি। এর পরের বছর বাংলাদেশ পুলিশকেও চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে চ্যাম্পিয়ন করিয়ে নিয়ে আসেন প্রিমিয়ার লিগে।  অভিষেক মৌসুমেই তাকে অস্কার ব্রুজনের সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেয় ক্লাবটি।

২০২১ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলির অধীনে প্রথমবারের মতো শুরু হয় এএফসি প্রো-লাইসেন্স কোচিং কোর্স। যেখানে দেশি-বিদেশি ২৩ জন কোচ পাঁচটি মডিউল শেষ করেছেন চলতি মাসেই। এর মধ্যে আসিফসহ ১২জন বাংলাদেশি।

সবার আগে প্রো-লাইসেন্স কোচ বনে যাওয়াটা আসিফের জন্য ভীষণ আনন্দের। তার চাওয়ার আরও বেশি সংখ্যায় বাংলাদেশি কোচ উতরে যাক এই কঠিন চ্যালেঞ্জ, ‘আসলে যত বেশি শিক্ষিত কোচ আসবে, তত দেশের ফুটবলে উন্নয়ন হবে। ঠিক যেমন কোয়ালিফায়েড টিচার একটি স্কুলে বড্ড প্রয়োজন। আমার ধারণা অন্যরাও অচিরেই সুসংবাদ পাবেন।’