দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় প্রতি বছরই বাড়ছে, দেশি-বিদেশি প্রতিবেদনে এমন তথ্যই মিলেছে। অভিযোগ আছে, পাচারকৃত অর্থের বড় অংশ দিয়ে বিদেশে প্লট, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনা হচ্ছে। অর্থপাচার কমাতে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা দেশের আবাসন খাতে বিনা শর্তে সহজ বিনিয়োগের সুযোগ চেয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এ সুযোগ রাখা হয়নি আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে।
আবাসন ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, বৈশ্বিক মন্দায় অর্থ সংকটে পড়েছে সরকার। অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বিনা শর্তে আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে অর্থপাচার কমবে। এতে দেশের অর্থ দেশে থাকবে। অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়বে।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বাজেট প্রস্তাব প্রণয়নের আগে প্রাক বাজেট আলোচনাকালে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) লিখিতভাবে এ প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। বৈঠকেও এ প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু আবাসন ব্যবসায়ীদের এ প্রস্তাব আমলে আনা হয়নি।
আবাসন খাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন (কাজল) দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সহজ শর্তে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। অনেকে দেশেই ফ্ল্যাট ও প্লট কিনতে আগ্রহী হবে। অর্থপাচার করে বিদেশে ফ্ল্যাট-প্লট কেনার পরিমাণ কমবে।
দেশের অর্থনীতি গতিশীল করার স্বার্থে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। বাজেট বিষয়ক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য বিনা প্রশ্নে ফ্ল্যাট, প্লট, বাণিজ্যিক ভবন ও বিপণিবিতানে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বিনিয়োগের সুবিধা বহাল রাখা প্রয়োজন। আগামী ১০ বছর পর্যন্ত এ সুবিধা রাখা হলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। জাতীয় সম্পদ ও প্রবৃদ্ধি বাড়বে। প্রসঙ্গত, বিদ্যমান আয়কর আইনে একটি স্থায়ী ধারা (১৯ ধারা) আছে, ‘যে কোনো সময়ে নির্ধারিত করের (উচ্চ কর) পাশাপাশি জরিমানা হিসেবে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা (অপ্রদর্শিত অর্থ) প্রদর্শন করা যাবে। এটা অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতে যতদিন এই ধারা বিলুপ্ত না হবে ততদিন থাকবে।’ এ ধারা অনুযায়ী উচ্চ হারে কর দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আছে। তবে রাজস্ব আইনের বিধান অনুযায়ী বিনিয়োগকারীর অর্থের উৎস নিয়ে এনবিআর কিছু না বললেও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের যে কোনো সংস্থা জবাবদিহিতায় আনতে পারবে। প্রতি বছরের মতো আগামী অর্থবছরেও এ সুযোগ রয়েছে। আইনি জেরার মুখে পড়ার ভয়ে অনেকে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্র্থ সাদা করায় আগ্রহী হয় না।
২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা মূলধারার অর্থনীতিতে আনতে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ‘১ জুলাই ২০২০ থেকে ৩০ জুন ২০২১ পর্যন্ত। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত অর্থ জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না।’ অর্থাৎ এনবিআর, দুদকসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের তদন্ত করতে বা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে না। বিশেষ এ সুবিধা নিয়ে এ দেশের অনেক ব্যবসায়ী, বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, শিল্পী, খেলোয়াড়সহ অনেকে কালো টাকা সাদা করেছেন। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১ হাজার ৮৫৯ ব্যক্তি ২০ হাজার ৬৫০ কোটি কালো টাকা সাদা করেছেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।
ব্যবসায়ী, সাবেক ও বর্তমান সরকারি কর্মকর্তা, পোশাক কারখানার মালিকসহ ৪৭৯ জন ১৬৭৭ কোটি কালো টাকা সাদা করেছেন। এ সময়ে এনবিআরের বড়মাপের করদাতাদের ৩১ জন ব্যক্তি ১৫২৭ কোটি টাকা সাদা করে। এদের মধ্যে ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক বেশি।
স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বিশেষ সুবিধা দেওয়া বাদে ১৮ বার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই ১৮ বারে যে পরিমাণ কালো টাকা সাদা হয়েছে তার প্রায় সমান পরিমাণ সাদা হয়েছে বিশেষ সুযোগ দেওয়ার পর। ২০২০-২১ এক অর্থবছরেই সাদা হয় ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১ হাজার ৬৬৩ কোটি কালো টাকা সাদা হয়েছে। এতে রাজস্ব পেয়েছে ১১৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের স্থায়ী বিধানের পাশাপাশি বিদেশে পাচার করা অর্থ বা সম্পদের ঘোষণা দিয়ে তা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে সরকার। কেউ ৭ শতাংশ কর দিয়ে পাচার করা অর্থ দেশে আনতে পারবে। অন্যদিকে বিদেশের কোনো স্থাবর সম্পত্তি দেশে ফিরিয়ে না আনলে ওই সম্পত্তির মোট মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ এবং বিদেশে থাকা অস্থাবর সম্পত্তি দেশে না আনলে তার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থবছরের মেয়াদকালে এক বছরের জন্য এ সুবিধা থাকলেও এখনো পর্যন্ত এ সুযোগ কেউ নেয়নি।
এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রশ্ন তোলা হবে এমন ভয়ে অনেকে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করেন না। বিশেষ সুযোগ দেওয়া হলে অনেকে কালো টাকা সাদা করবেন।