ইলিশের ভরা মৌসুম। অথচ জেলেদের জালে ইলিশ নেই। ইলিশের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় হঠাৎ করেই কমে গেছে রুপালি ইলিশ। একই অবস্থা চট্টগ্রামেও। প্রতি বছর এ সময় সাগরে নামলেই জেলেদের জালে ধরা পড়ত ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই চিরচেনা দৃশ্য যেন হারিয়ে গেছে। সাগর থেকে ফিরে জেলেদের মাছ বিক্রি নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার পরিবর্তে দেখা গেছে বসে বসে ছেঁড়া জাল মেরামত করতে।
চাঁদপুরের জেলে, আড়তদার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছরই ইলিশের উৎপাদন কমছে। এবারে সরবরাহ একেবারেই কম। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ, নাব্য সংকট ও অতিরিক্ত মাছ আহরণের প্রভাব দৃশ্যমান। ইলিশ না পেয়ে জেলেদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে হতাশা।
চাঁদপুরের আনন্দবাজার এলাকার জেলে আল আমিন বলেন, এখন মাছ ধরার মৌসুম। এ সময়ের আয়ের ওপরই সারা বছরের সংসার চলে। কিন্তু নদীতে মাছ না থাকায় ঋণ পরিশোধ তো দূরের, নৌকার খরচও উঠছে না। হরিণা ফেরিঘাট এলাকার জেলে দিদার বলেন, মাছ না পাওয়ায় দেনা বাড়ছে। অনেক জেলে নৌকা বিক্রি করে চলে গেছেন অন্য পেশায়। নদীতে মাছ না পেলে জেলেরা পরিবার নিয়ে বাঁচবে কীভাবে?
ইলিশ সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটেও। একসময় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিলাম ও কেনাবেচায় মুখর থাকলেও এখন বাজার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। সরবরাহ কম থাকায় দামও বেড়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে ইলিশ।
মাছ ব্যবসায়ী নবির হোসেন বলেন, মৌসুম শুরু হলেও ঘাটে মাছের সরবরাহ কম। দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতাও কমে গেছে।
বর্তমানে বড় স্টেশন মাছঘাটে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকায়। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম দুই হাজার ১০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা। আর ৪০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকায়।
জেলা মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারি জমাদার বলেন, মেঘনায় ইলিশ কম। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকা থেকেও মাছ কম আসছে। এতে বড় স্টেশন মাছঘাটের আগের জৌলুস হারিয়ে গেছে। একসময় যেখানে দিনভর আড়তদার ও পাইকারদের হাঁকডাকে বাজার মুখর থাকত, এখন সেখানে ব্যবসা অনেকটাই স্থবির।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়েফা আহমেদ বলেন, বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় এবার ইলিশ কিছুটা কম ধরা পড়ছে। তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বৃষ্টিপাত বাড়লে আশা করা যায়, জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে ইলিশ একেবারে নেই, বিষয়টি এমন নয়।
দূষণে বড় ক্ষতিতে মাছের উৎপাদন : চাঁদপুরের মতোই পরিস্থিতি চট্টগ্রামের। জেলেরা জানান, কোথাও দুই-এক কেজি, কোথাও পাঁচ-ছয় কেজি ইলিশ মিললেও তা দিয়ে জ্বালানি, বরফ, শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য খরচ উঠছে না। ফলে হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে উপকূলের শত শত মৎস্যজীবীর। মিরসরাইয়ের ডোমখালী, সাহেরখালী, বামনসুন্দরা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় অনেক জেলেই সাগর থেকে ফিরে মাছ বিক্রির পরিবর্তে উপকূলে বসেই ছেঁড়া জাল মেরামতে ব্যস্ত।
জাল মেরামত করতে থাকা মৎস্যজীবী অভিসরণ দাশ বলেন, সাগরে মাছ তো পাচ্ছিই না। আবার জাহাজ চলাচলের সময় প্রপেলারে জালও কেটে যাচ্ছে। মাছ নেই, তার ওপর জাল নষ্ট হওয়ায় আমরা চরম বিপদে।
মৎস্যজীবী সুধাংশু দাশ বলেন, সাগরে সারা দিন জাল টেনে যে মাছ পাই, তা বিক্রি করে নৌকার খরচও ওঠে না।
জেলেরা জানান, মৌসুম শুরুর আগে অনেকেই ব্যাংক, এনজিও কিংবা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ ও দাদন নিয়ে জাল, নৌকা ও মাছধরার সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছেন। ভালো ইলিশের আশায় নেওয়া সেই ঋণ এখন তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে সংসারের খরচ তো আছেই।
উপকূলীয় জেলে সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হরিলাল জলদাশ বলেন, বঙ্গোপসাগরের এ চ্যানেলে একসময় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়লেও বর্তমানে দূষণের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সাগর থেকেও নিয়মিত যে বালু উত্তোলন করা হয় তাও একটি কারণ হতে পারে।
মৎস্যজীবীরা উপকূলে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন ও বাল্কহেড জাহাজের চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
মিরসরাই উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, মিরসরাই উপকূলে ইলিশের বিচরণ কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, কলকারখানার বর্জ্য সাগরের পানিতে মিশে পানি দূষিত হওয়া অন্যতম। ইলিশ কম পাওয়ার আরও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ জেলেদের গভীর সাগরে না যাওয়া এবং উপয্ক্তু জাল ব্যবহার না করা।