বিদ্যুতে গ্যাস, শিল্পে টান

কয়লা সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের পর লোডশেডিং সামলাতে গিয়ে গ্যাসে টান ধরেছে। গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ৩টি সারকারখানা। অপর দুটিতে সার উৎপাদন কমে গেছে। শিল্পকারখানায় অন্তত ৪০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশন ও কিছু এলাকার আবাসিক গ্রাহকরাও ভুগছেন গ্যাস সংকটে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সার উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। আবার কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখতে গেলে সার আমদানিতে ব্যয় বাড়বে যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতিতে।

আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে দেশে ৬টি ইউরিয়া সারকারখানার মধ্যে ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড ও পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরিকে এক সঙ্গে করে বৃহৎ পরিসরে একটি কারখানা করার কাজ চলছে। সংস্কারকাজের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই কারখানা দুটি বন্ধ রয়েছে। বাকির চারটির মধ্যে তিনটি বন্ধ হয়ে গেছে। অপরটিতে উৎপাদন কমেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বাইরে বাংলাদেশ, জাপান, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসের অংশীদারত্বে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) থেকেও ইউরিয়া সার উৎপাদন হয়।

বিসিআইসি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো থেকে প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন হয়। চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন। ফলে ১৬ লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত ইউরিয়া সার কাফকো এবং বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় সরকারকে। গ্যাস সংকটে সারকারখানা বন্ধের কারণে অন্তত আড়াই লাখ টন উৎপাদন কমবে যা আমদানি করতে হবে। সরকার প্রতি কেজি সারে ভর্তুকি দিচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। আমদানির কারণে এই ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে।

সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে ৬ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া মজুদ আছে। পাশাপাশি দুটি কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে। আগামী অক্টোবর পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। এই সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমদানির পরিমাণ আরও বাড়বে। কিন্তু ইউরিয়ার কোনো ঘাটতি হবে না।

ইউরিয়া কারখানাগুলো পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর। বর্তমানে এই ৫টি কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিন প্রায় ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দরকার হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

জামালপুরে অবস্থিত যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের দৈনিক ইউরিয়া সার উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭০০ টন। এজন্য গ্যাস দরকার ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারিগরি ত্রুটির কারণে সার উৎপাদন বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। মেরামত কাজ শেষে গত ৩১ মে থেকে উৎপাদন শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও গ্যাস স্বল্পতার কারণে তা করা সম্ভব হয়নি। কবে নাগাদ গ্যাস পাওয়া যাবে সে বিষয়েও এখনো কিছু জানানো হয়নি আমাদের।’

শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (এসএফসিএল) গ্যাসের চাহিদা ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি গ্যাস পাচ্ছে ৪০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।

কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াবুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গড়ে প্রতিদিন ১৪৫০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস স্বল্পতার কারণে বর্তমানে ২০০ টন কম উৎপাদন হচ্ছে।

গ্যাস সংকটের কারণে গত বছরের ২২ নভেম্বর বন্ধ হয়ে যায় চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। গত মার্চ মাসের ২২ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত উৎপাদন চালু থাকার পর আবার বন্ধ যায়। প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার থেকে ১১০০ টন।

সিইউএফএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১ জুন থেকে গ্যাস পাওয়ার আশ্বাস পেয়ে সার উৎপাদনের জন্য স্টার্টআপ বা প্রস্তুতি শুরু করেছিলাম। এজন্য প্রায় ১৫ দিন সময় লাগে। শেষ পর্যন্ত গ্যাস না পেয়ে স্টার্টআপের মাঝপথে গত শনিবার সকাল ১১টায় কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানি থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গ্যাস দিতে হচ্ছে। তাই আপাতত সারকারখানায় গ্যাস দিতে পারবে না।

আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (এএফসিসিএল) দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রতিদিন ১১০০-১২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করার সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাটি বন্ধ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুনীল চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেইনটেনেন্স (রক্ষণাবেক্ষণ) কাজের জন্য ১ মার্চ থেকে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়। গত ২৫ মে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পর গ্যাস বিতরণ কোম্পানি থেকে জানানো হয় আপাতত গ্যাস দেওয়া সম্ভব নয়। ২৫ জুনের পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে। গ্যাস পেলে আবার উৎপাদন শুরু করা যাবে।

পূর্ণ ক্ষমতায় সার উৎপাদন করতে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) দৈনিক গ্যাস প্রয়োজন ৬৩ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে ৪৬ মিলিন ঘনফুট।

প্রতিষ্ঠানটির সিএফও (চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার) হাবিব উল্লাহ মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কারখানার দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার টন। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় কিছুটা কম গ্যাস পাচ্ছি। এতে প্রতিদিন ১০০ টনের মতো উৎপাদন কম হচ্ছে।’

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষির উৎপাদন ঠিক রাখতে হবে। এজন্য নানা রকম কৃষি উপকরণের পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী সার বিশেষ করে ইউরিয়ার জোগান নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। একসময় দেশীয় কারখানা থেকেই ৭০ শতাংশ ইউরিয়ার চাহিদা পূরণ হতো। এখন তা ৩০-৪০ শতাংশে নেমেছে। এতে আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির ফলে ব্যয় বাড়ছে। এখন গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে যা দেশের কৃষি তথা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাছাড়া বিশ্ববাজারে সারের দাম অস্থিতিশীল। আমদানি বাড়লে চলমান ডলার সংকট আরও বেড়ে যাবে। 

সারকারখানার পাশাপাশি অন্য শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক হোসেন মেহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমনও দিন আছে যেদিন ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যায় না। গ্যাস থাকলেও এর চাপ এতই কম থাকে যা দিয়ে উৎপাদন করা যায় না। এতে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। ‘ওয়েস্টেজের’ (অপচয়) পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। অন্তত ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে গ্যাস সংকটের কারণে।

তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে আগের চেয়ে অর্ডার নেওয়া কমিয়ে দিয়েছি। এরপরও সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে বাজার নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় জরিমানা গুনতে হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।’

সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের টান পড়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনগুলোতে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু বর্তমানে সংকটের কারণে অন্য সময়েও ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। আবার গভীর রাতে যখন গ্যাস থাকে তখন পরিবহনে গ্যাস নেওয়ার ক্রেতার সংখ্যা একেবারেই কমে যায় বলে জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্যাসের অভাবে সকাল থেকে দুপুর দুইটা-আড়াইটা পর্যন্ত প্রায় ৬-৭ ঘণ্টা অনেক স্টেশন বন্ধ থাকে। দুপুরের দিকে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও সন্ধ্যা থেকে আবার ৫ ঘণ্টার জন্য গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আবার গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই থাকার কথা থাকলেও অনেক সময় পাওয়া যায় মাত্র ২ পিএসআই। এতে গ্যাস থাকা আর না থাকা সমান কথা।

তিনি বলেন, ‘এ খাতের ব্যবসায়ীদের খুবই করুণ অবস্থা। আমরা সরকারের বিভিন্ন মহলে বারবার আমাদের দুর্দশার কথা জানিয়েছি। কিন্তু কেউ শোনে না।’

এদিকে রাজধানীর কচুক্ষেত, মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরসহ বিভিন্ন এলাকার আবাসিক গ্রাহকরা ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। কোনো কোনো এলাকায় সকাল ৭টা-সাড়ে ৭টা থেকে দুপুর ২-৩টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। আবার কোথাও গ্যাস থাকলেও চাপ অনেক কম। এতে রান্না করতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা।

বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা অন্তত ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। আমদানিকৃত এলএনজিসহ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৩০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।