শান্তর আয়নায় মুমিনুল

মিরপুরে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মাথায় অঝোরে নামল বৃষ্টি। টানা কয়েকদিনের তাপপ্রবাহ শেষে স্বস্তির বৃষ্টি সজীব করল প্রকৃতি। ২৬ ইনিংস পর শতরানের দেখা পেয়ে কি এমনটাই মনে হয়েছে মুমিনুল হকের। ২১ এপ্রিল ২০২১-এর পর ১৬ জুন ২০২৩, এর ভেতর অনেক পরিবর্তন দেখেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। মুুমিনুল অধিনায়কত্ব হারিয়েছেন, কোচের পদে ফিরেছেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। কিন্তু তিন অঙ্কের রানে যেতে পারছিলেন না মুমিনুল, মধ্যে দুটো ৮০ ছাড়ানো ইনিংস থাকলেও ৫টা শূন্যও আছে। শতরানের ইনিংস খেলা মুমিনুল নিজের ছায়া দেখেন নাজমুল হোসেন শান্তর মধ্যেও। খারাপ সময়ের গেরো কাটিয়ে সুসময়ে ফেরা শান্ত মুমিনুলের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন তাকে নিকটতম দর্শক বানিয়েই।

অধিনায়কত্ব হারানোর পর কালই প্রথম সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি মুমিনুল। মধ্যে লম্বা  সময় রান পাননি। ওয়েস্ট ইন্ডিজে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে দল থেকে বাদও পড়েছিলেন। দেশে ভারতের বিপক্ষে একটা ৮০ ছাড়ানো ইনিংস খেললেও আয়ারল্যান্ডের মতো নবীন দলের বিপক্ষে হাসেনি তার ব্যাট। রান পাননি আফগানদের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসেও। পরের টেস্ট বিশ্বকাপের পর দেশে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো করতে না পারলে হয়তো ভবিষ্যৎটা হুমকির মুখেই পড়ে যেত মুমিনুলের। কিছুদিন আগে নাজমুল হোসেন শান্তকেও যেতে হয়েছে এমন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে, এখন নিয়মিত রানের দেখা পেয়ে শান্ত হয়ে উঠেছেন ভরসার পাত্র। চাপের মুখে অপরাজিত শতরান করা মুমিনুল দিনের খেলা শেষে বললেন, মধ্যের সময়টা কতটা কঠিন, ‘আমি নিজে এটার মুখোমুখি হয়েছি, এটা অসহনীয়। যে এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যায় সেই বোঝে। আমার সময় মনে হয়েছে পুরো পৃথিবী একদিকে আমি আরেকদিকে। যার হয় সে ছাড়া কেউ বোঝে না, এর মধ্যে ঢুকতেও পারবেন না। ওই সময় শুধু প্রসেস ঠিক রাখতে পারেন, বাকিটা আল্লাহ যখন দেওয়ার তখন রান দেবেন।’

বাংলাদেশের হয়ে এক টেস্টের দুই ইনিংসে শতরান করার প্রথম কৃতিত্ব মুমিনুলের। গতকালকের আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন একমাত্র। কাল শান্ত যখন সেই রেকর্ডে ভাগ বসালেন, তখন মুমিনুল অন্য প্রান্তে। জানালেন, খুব করে চাইছিলেন শান্ত যেন শতরান করেন, ‘প্রথম ইনিংসে যখন ১০০ করছিল, দ্বিতীয় ইনিংসে...আমরা দলের সবাই চাচ্ছিলাম দুইটা ১০০ হোক। আলহামদুলিল্লাহ ওকে ধন্যবাদ, টিমের জন্য দুইটা ১০০ করে অবদান রাখার জন্য। এটা বিরাট ব্যাপার।’ শান্তর মতো ব্যাটিং করতেও ইচ্ছা করে মুমিনুলের, ‘শান্তর ইনিংস দেখলে খেলা অনেক ইজি মনে হয়। নিজেরও মনে হয় ওভাবেই খেলি কিন্তু আমার ওভাবে খেলা ডিফিকাল্ট। শান্ত-লিটন দুজনের খেলা দেখতেই অনেক ভালো লাগে। শান্ত এই গরমে যেভাবে খেলছে, দুইটা ১০০ অনেক বড় অর্জন।’

মুমিনুল অধিনায়ক থাকার সময়ই স্পিন নির্ভরতা থেকে বের হয়ে একটা শক্তিশালী পেস বোলিং ইউনিট গড়ার বীজটা রোপিত হয়েছিল, আজ যার ফল পাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই স্বীকৃতি তৃপ্তি দেয় মুমিনুলকে, ‘কোনো আফসোস কাজ করে না। সন্তুষ্টি কাজ করে। আপনারা যদি বলেন, তাহলে আরও সন্তুষ্টি কাজ করে।’ ২৬ ইনিংস পর টেস্ট সেঞ্চুরির স্বস্তি আছে মুমিনুলের, সেই সঙ্গে আছে পরের ম্যাচে নামবার দীর্ঘ প্রতীক্ষাও। এবারের সিরিজে দুটো টেস্ট থাকলেও বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ও আফগানদের ভারত সিরিজ খেলার লোভের বলি হয়ে কাটা পড়েছে একটা টেস্ট। এতকিছুর পর টেস্টের প্রতি আবেগটা ধরে রাখাটা কষ্টকর হয়ে যায় মুমিনুলের মতো যারা শুধুই টেস্ট খেলেন তাদের, এজন্য একটু আর্থিক প্রণোদনাও চাইছেন তিনি, ‘আমার কাছে মনে হয় এটা প্যাশনের ব্যাপার। কেউ স্বপ্ন দেখে লাল বল খেলবে বা সব ফরম্যাট খেলবে। এখনকার যুগে অনেকে চিন্তা করে টাকার দিকে। যেভাবে আপনি চিন্তা করেন। আপনার যদি প্যাশন থাকে টেস্ট ক্রিকেটটা খেলব, যে স্বপ্নটা দেখবে তার নিজেকে ওভাবে তৈরি করতে হবে। হয়তো টাকা-পয়সা বাড়িয়ে দিতে হবে।’

অনেকদিন পর রান করে মাইক্রোফোনের সামনে অনেক কথাই বললেন মুমিনুল। কক্সবাজারের ছেলে ব্যাট হাতে বাউন্সার সামলাতে পারলেও প্রশ্নবাণ সামলাতে ততটা পটু নন। তাই তো বলে গেলেন, অধিনায়কত্ব ছেড়ে ভালোই লাগছে তার, ‘ক্যাপ্টেন্সি না থাকলে একটা সুবিধা হয় এই যে, এত এত কিছু নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। খালি ব্যাটিংটাতে মনোযোগ দিলেই হয়।’ আপাতত তিনি সেটাই করছেন।