টানা ৩১ বছর ৬ মাস ২ দিন কারাভোগের পর অবশেষে কারাগার থেকে বের হয়ে আলোর মুখ দেখলেন দেশের বহুল আলোচিত কারাবন্দি জল্লাদ শাহজাহান ভূঁইয়া (৭৩)। গতকাল রবিবার বেলা ১১টা ৪৬ মিনিটে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। শাহজাহান তার সাজা থেকে ১০ বছর ৫ মাস ২৮ দিন ক্ষমা পেয়েছেন।
কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার প্রথম মুহূর্তে ডুকরে কেঁদে ওঠেন শাহজাহান। এরপর একে একে তার কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ৩১ বছর অনেক সময়। এত দিন সাজা ভোগ করার পর এখন আমি আর অপরাধ করতে চাই না। তা ছাড়া আমার আর অপরাধ করার সক্ষমতাও নেই এখন।
জল্লাদ শাহজাহান আরও বলেন, ‘বাইরে আমার কেউ নেই। শুনেছি আমার এক বোন ও ভাগনে আছে। তবে তাদের সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। তবে এখন আমি একজনের বাসায় যাচ্ছি। কারাগারে থাকার সময় তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করছি, তিনি যেন আমাকে বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেন। যাতে বাকি জীবন আমি সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারি।’
২৬ জন আসামিকে ফাঁসি দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি বিচার-প্রক্রিয়া শেষে কারাগারে সাজা ভোগ করছিলাম। তাই কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কোনো না কোনো কাজ করতে হয়। আমি একটু সাহসী ছিলাম বলে আমাকে জল্লাদের কাজে নিয়োগ করা হয়। এসব ফাঁসি আমার সিদ্ধান্তে আমি দিইনি, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিয়েছি।’
এর আগে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জল্লাদ শাহজাহান এ পর্যন্ত ২৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করেছেন। এতে প্রতি ফাঁসির জন্য তার দুই মাস করে শাস্তি মওকুফ হয়েছে। এ ছাড়া জেলে কেউ ভালো কাজ না করলে, কারও শাস্তি মওকুফ করা হয় না। তবে শাহজাহান জেলে থাকা অবস্থায় ভালো কাজ করে ১০ বছর ৫ মাস সাজা কমিয়েছেন।
কারও ফাঁসি কার্যকর করতে খারাপ লেগেছে কি না, জানতে চাইলে শাহজাহান বলেন, প্রতিটি ফাঁসির আগেই আবেগ কাজ করেছে। এখানে তো আমার কিছু করার নেই। এ কাজ কাউকে না কাউকে তো করতে হতো। এখন আমি চলে আসছি, অন্য কেউ করবে। সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে আমাকে এ কাজ করতে হয়েছে।
কারাগারের রেকর্ড বলছে, এ পর্যন্ত ২৬ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন তিনি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় ঘাতক, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মীর কাসেম আলী ও জেএমবির দুই শীর্ষ জঙ্গি।
শাহজাহান ১৯৯১ সালের ১৭ ডিসেম্বর অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রথম মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং ২১ নভেম্বর ১৯৯৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসেন বলে জানা যায়। পারিবারিক আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জরিমানার ১০ হাজার টাকা কারাগার কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন।