তখন ২০০৮ সাল, আমার ছেলের বয়স মাত্র ৮ মাস। আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী, উইন্টার ভ্যাকেশনে ময়মনসিংহে মায়ের বাড়ি গেছি। আমার ছেলের ভীষণ ঠাণ্ডা জ¦র-কাশি ইত্যাদির সমস্যা দেখা দিল। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক বিভাগের প্রধানের প্রাইভেট চেম্বারে নিয়ে গেলাম। তিনি দেখেশুনে জ¦র-কাশির ওষুধ আর দুটি অ্যান্টিবায়োটিক দিলেন। এত ছোট বাচ্চাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া ঠিক হবে কিনা তাই নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে আমরা পরদিনই ওকে ঢাকায় নিয়ে এলাম। তার পরদিন নিয়ে গেলাম সেন্ট্রাল হাসপাতালের এক চাইল্ড স্পেশালিস্টের কাছে। আমি একাই গেলাম বাচ্চাকে নিয়ে। একা যাওয়ার প্রসঙ্গ কেন আনলাম সেটা পরে ব্যাখ্যা করছি। আমি ডাক্তারকে জানালাম যে, আমার বাচ্চা বুকের দুধ টেনে খেতে পারছে না। আমি স্টুডেন্ট হওয়ায় ওকে ১৫ দিন বয়স থেকেই বুকের দুধের পাশাপাশি সিরিয়াল খাওয়াতে হয়েছে, তা-ও বললাম। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, ওই ডাক্তার আমার ছেলের বুকে স্টেথোস্কোপ বসিয়েও দেখলেন না। শুধু বললেন, দুধ পাল্টে দিতে। সেই নন-ল্যাকটিক সিরিয়াল কিনে বাসায় ফিরলাম। কিন্তু ছেলের অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না। পরদিন আবারও গেলাম, সঙ্গে আমার বর আর ভাশুরও গেলেন। ডাক্তার বললেন ওর ব্রংকিওলাইটিস হয়েছে, নেবুলাইজ করতে হবে। ওই দিন নেবুলাইজ করার পর আমরা আর ওই ডাক্তারের কাছে যাইনি। সে যাত্রায় ওকে বাঁচিয়েছিলেন তৎকালীন আয়েশা মেমোরিয়াল, বর্তমানে ইউনিভার্সেল হাসপাতালের ডাক্তাররা।
এবার আসি প্রথম দিন আমার একা যাওয়ার বিষয়টাতে। একে কেউ ফেমিনিস্ট ক্র্যাপ বললে আমার কিছু করার নেই। একটা শিশুর একদিনের ব্যবধানে ব্রংকিওলাইটিস হয়ে যেতে পারে না, তিন দিন আগে ময়মনসিংহে থাকতেই ওটা হচ্ছিল, যে কারণে ময়মনসিংহের চাইল্ড স্পেশালিস্ট বাধ্য হয়েই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছিলেন। এই ডাক্তারের কাছে প্রথম দিন আমি একা গেছি, আমার নিজেরই তখন অল্প বয়স, সবে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি, সঙ্গে কোনো পুরুষ সঙ্গী নেই। সন্তানধারণের চাপে জর্জরিত হওয়া ছাড়াও অতি সাধারণ পোশাক-আশাক ব্যবহার করা আমার আজীবনের স্বভাব। ফলে ডাক্তার আমাকে একজন পাওয়ারলেস সাধারণ মেয়ে মানুষ হিসেবে দেখে আমার ছেলের চিকিৎসায় যথাযথ গুরুত্ব দেননি। পরদিন আমার বর আর ভাশুরের উপস্থিতি তাকে তার প্রথম দায়িত্ব রোগীর বুকে স্টেথোস্কোপ বসানোর কাজটা মনে করাতে পেরেছিল। ভুল মানুষেরই হয়। লেখাপড়া শেষ করে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম। ডেস্কে কাজ করতাম। পেশাগত জায়গায় কোনো ভুল কি আমরা সাংবাদিকরা কখনো করি না? অবশ্যই করি। কিন্তু একজন সাংবাদিক বা শিক্ষকের ভুলের কারণে বড়জোর মিসইনফরমেশন হতে পারে, ভুল তথ্য প্রচার হতে পারে, কারও মানসম্মান যেতে পারে, আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু কারও জীবন কি চলে যেতে পারে? একজন ডাক্তারের সামান্য ভুলে মানুষের জীবন চলে যেতে পারে।
এই কারণেই চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার আগে হিপোক্রেটিক ওথ নেওয়ানো হয়। কী আছে এই শপথবাক্যে? অনেক কিছুই আছে। তবে একটা কথা আছে যা আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তা হচ্ছে ‘আমি জানি না’ এই কথা বলতে লজ্জা করা যাবে না। যেকোনো সময় নিজে না জানলে অন্য ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আমি জানি না যারা এই লেখা পড়ছেন তাদের মধ্যে ক’জন কোনো দিন কোনো ডাক্তারকে বলতে শুনেছেন, ‘আমি এ বিষয়ে জানি না’? আমি অন্তত কোনোদিন শুনিনি। বরং নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি ঠাণ্ডা লেগে মরতে বসা আট মাসের শিশুর মাকে পেট খারাপের দুধ ধরিয়ে বিদায় করতে, পুরুষ সঙ্গীর অভাবে অল্পবয়সী মায়ের সন্তানকে অবহেলায় ছুঁয়েও না দেখে নমঃ নমঃ করে চিকিৎসা দিয়ে বিদায় করতে।
এই পর্যন্ত পড়ে কেউ যদি মনে করেন আমি বলতে চাচ্ছি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের বা ইউনিভার্সেল হাসপাতালের ডাক্তাররা ভালো, সেন্ট্রাল হাসপাতালের ডাক্তাররা খারাপ... তাহলে ভুল হবে। সত্য বটে, খুব সম্প্রতি সেন্ট্রাল হাসপাতালে শিশু ও ল্যাবএইডে মাতৃমৃত্যুর ভয়াবহ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এই লেখার শুরু। এই বিষয়টা নিয়ে এর আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখে দেখেছিলাম, কাক যেমন কাকের মাংস খায় না, ডাক্তাররা কোনো দিন ডাক্তারদের সমালোচনা সহ্য করে না। পাঠকের মনে আছে কিনা, হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘বহুব্রীহি’তে একজন নার্ভাস টাইপ বোকা ডাক্তারকে দেখানো হয়েছিল বলে দেশের চিকিৎসক সমাজ ক্ষেপে গিয়েছিল। ওই সময় তো সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। অন্য এক লেখায় হুমায়ূন আহমেদ অতি বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে, তিনি ওই একই নাটকে একজন স্থিতধী ডাক্তারের চরিত্রও এঁকেছেন, যা আমাদের ডাক্তাররা দেখতেই পাননি। তারা ধর্মঘট শুরু করে দিয়েছিলেন। এখানেও অন্য পেশার সঙ্গে চিকিৎসক পেশার ফারাক। কোনো প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক বা শিক্ষকরা ধর্মঘট করলে অব্যবস্থা তৈরি হতে পারে, কিন্তু দেশ ও জাতির বড় কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু চিকিৎসকরা মাত্র ২৪ ঘণ্টা ধর্মঘট করলেও অনেক মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে, এমনকি জীবনও চলে যেতে পারে। এই ক্ষমতা সামান্য নয়।
শুরুতে তো বললাম ১৫ বছর আগের ঘটনা। এবার বর্তমান সময়ে আসি। এখন আমাদের কাছে গুগল আছে। বহুদিন ব্যাকপেইনে ভোগার পর গুগল মারফত আমি জানতে পারি আমার যে রোগটা হয়েছে এর নাম সায়াটিকা এবং এর সবচেয়ে ইফেকটিভ চিকিৎসা হচ্ছে যথাযথ ব্যায়াম, প্রপার ফুডিং এবং লাইফস্টাইল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই রোগের নাম কোনো ডাক্তার আমাকে বলেনি। তারা আমাকে গাদা গাদা মেডিসিন গিলিয়েছে, নার্ভ কন্ডিশন স্টাডি করিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করিয়েছে। ডাক্তাররা রোগ সারিয়ে তোলার বদলে রোগটা জিইয়ে রাখার জন্য যা যা দরকার সব করেছে। বিষয়টা এমন নয় যে, আমি মাত্র একজন ডাক্তারের কাছে গেছি। পুরো জিনিসটা একটা সিন্ডিকেটের মতো। মেডিসিন কোম্পানি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফিজিওথেরাপি সেন্টার এবং চিকিৎসক স্বয়ং এই সিন্ডিকেট তৈরি করে রেখেছে। আমরা সবাই তাদের কাছে জিম্মি।
হিপোক্রেটিক ওথ হচ্ছে সবচেয়ে পুরনো কোড অব এথিকস, যা লিখেছিলেন গ্রিক দার্শনিক হিপোক্রিটাস। এর আধুনিক ভার্সন লেখেন লুইস লাসাগনা, ১৯৬৪ সালে। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের জন্য সিন্ডিকেটবিরোধী হিপোক্রেটিক ওথ লেখা এখন সময়ের দাবি।
লেখক : সাহিত্যিক ও লেখক
ummerayhana@gmail.com