টোটকা দাওয়াইয়ে কাজ হবে না

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ০৩:৫১ এএম

সরকারি মহল থেকে দুর্নীতি দমনে যে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয় কিংবা দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্সের কথা বলা হয়, এর প্রতি অগাধ আস্থা রেখেও বলা চলে সদিচ্ছা দুর্নীতি বা অনিয়ম হ্রাসে দরকারি শর্ত মাত্র, যথেষ্ট শর্ত নয়। উপরওয়ালাদের মহতি উক্তি এবং করণীয় যে কী কারণে চোরাবালিতে আটকে পড়তে পারে সে কথা বলব সবার শেষে।

দুই.

প্রথমেই জানিয়ে রাখা ভালো, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। এ অঞ্চলটিতে নিজের আসল পরিচয় হারিয়ে শাসক সম্প্রদায়ের কেউ মি. টুয়েন্টি পারসেন্ট, কেউ মি. টেন পারসেন্ট ইত্যাদি নামে সমধিক পরিচিত। অর্থাৎ, কাজটি পেতে হলে মোট বরাদ্দের এক-পঞ্চমাংশ বা এক-দশমাংশ কর্তাকে দিয়ে কৃতার্থ করতে হবে। বেশিরভাগ ঐতিহাসিক মনে করেন, ইংরেজ প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা দুর্নীতির জন্ম দেয়, যদিও তারা নিজেরা দুর্নীতিপরায়ণ ছিল না। প্রায় দুই হাজার বছর আগে একটা সংকলনের নানান অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘... প্রজাদের রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে রাজা যাদের নিয়োগ দেন তারাই ভণ্ডামি করে অন্যদের সম্পত্তি গ্রাস করে এবং রাজাকে এ ধরনের কর্মকর্তাদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে হবে; রাজার দায়িত্ব হলো যেসব দুষ্ট লোক মামলার বিভিন্ন পক্ষ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে তাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া এবং তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।’

চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের বয়সও ধরা যাক প্রায় দুই হাজার বছর হবে। চাণক্য লিখেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা দুভাবে বড়লোক হয় : হয় তারা সরকারকে প্রতারণা করে, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করে ... জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব অসম্ভব, তেমনি সরকারের তহবিল লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা অসম্ভব ব্যাপার। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করে তা জানা যেমন অসম্ভব তেমনি নির্ণয় সম্ভব নয়, কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা তহবিল তছরুফ করে।’

তিন.

শুধু সরকারি কর্মচারীরাই দুর্নীতি করেন এমন কথা নেই, বেসরকারি খাতে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও দুর্নীতির দুর্গন্ধ ভেসে বেড়ায় প্রতারণা করা, ভেজাল মেশানো, সিন্ডিকেট গড়ে তোলা ইত্যাদির মাধ্যমে দুর্নীতি বিকাশ লাভ করে। বাংলাদেশে এর জলজ্যান্ত উদাহরণ ঋণখেলাপি অপসংস্কৃতি এবং এর সহায়ক শক্তি, বালি উত্তোলন, বালিশ কেনা, মুরগি সিন্ডিকেট প্রভৃতি। আবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতির ছাপ আড়ালে-আবডালে থাকে না । ভারতের পশ্চিম বাংলা, এমনকি লোকসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শোনা কথা, ভারতে জনৈক রসিক ব্যক্তি বলেছেন, ‘রাজনীতিবিদরা ও ডাকাতরা একই ধরনের কাজ করে থাকে, তবে উল্টো পরম্পরায়। ডাকাতরা প্রথমে ডাকাতি করে তারপর জেলে যায়; রাজনীতিবিদরা প্রথমে জেলে যান, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ডাকাতি করেন।’

চার.

দুর্নীতি উন্নয়নের জন্য সহায়ক এমন তত্ত্ব এককালে সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণায় শেকড় গেড়েছিল । যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হলো এই প্রতিপাদ্য যে, ঘুষের টাকায় লাল ফিতার দাপট দূর করত দ্রুত সিদ্ধান্ত হাতে পাওয়া সহজ হয়; ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, বাবুও কাবু হয় না। সুতরাং ফেলো কড়ি, মাখ তেল যেখানে বিধিবদ্ধ নিয়ম, সেখানে পদে পদে ঘুষের ভূমিকা সহজে অনুমেয়। অবশ্য, এই প্রতিপাদ্যটি অসাড় বলে প্রমাণ করেছেন পরবর্তী গবেষকরা। নিকট অতীতে গবেষণায় দুর্নীতির চার ধরনের কুফল চিহ্নিত করা হয়েছে : সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি, সামষ্টিক অর্থনীতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট, প্রকটতর সামাজিক বৈষম্য এবং নিরুৎসাহিত বৈদেশিক বিনিয়োগ। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বলয়ে, বিশেষত রাজনৈতিক অঙ্গনে, দুর্নীতির বিরূপ প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা আছে এবং মনে করা হয়, দুর্নীতির কারণে বছরে আমাদের জিডিপির ২-৩ শতাংশ খোয়া যায় অর্থাৎ এ পরিমাণ দুর্নীতি না হলে সম্ভবত পদ্মা সেতুর মতো আরও তিন তিনটি সেতু নির্মাণ করা যেত।

পাঁচ .

এবার আসা যাক দুর্নীতি নির্মূল পদক্ষেপ প্রসঙ্গ করণীয় নিয়ে কিছু কথায়। এক সময় ভাবা হতো যে, বেতন কম বিধায় সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘুষ খান। তবে বেতন বৃদ্ধি যে দুর্নীতি রোধে মোক্ষম অস্ত্র নয়, তার প্রমাণ স্বয়ং বাংলাদেশ যেখানে দফায় দফায় বেতন ও দুর্নীতি উভয়ই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তাছাড়া কতদিন আপনি বেতন বাড়াবেন যখন দুর্নীতির কারণে রাজস্ব আহরণ নিম্নমুখী? তার মানে এই নয় যে, প্রশাসনে সৎ কর্মচারী নেই, সমাজে ভালো মানুষ নেই। তারা আছেন, তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মতোই তাদের কোণঠাসা অবস্থা; দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীর দাপটে তারা শান্তিতে থাকতে পারেন না। মুদ্রার জগৎ সম্পর্কে যেমন গ্রেসাম বলতেন, খারাপ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে তাড়িয়ে দেয় ঠিক তেমন এক অবস্থা প্রশাসনেও  খারাপ কর্মচারী-কর্মকর্তার দাপটে সৎজন এবং সজ্জন উধাও।

দুর্নীতি হ্রাসে সর্বপ্রথম দরকার দুর্নীতিপরায়ণদের আইন অনুযায়ী সাজা দেয়া তার মানে আইনের শাসন কায়েম করা। যেমন হংকং, চিলি ও নিউ সাউথ ওয়েলসের অভিজ্ঞতা আমলে নেওয়া। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, যেমন অভাব নেই আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসার ফাঁকফোকরের। সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা, মামলাও হচ্ছে কিন্তু সেই মামলার বিরুদ্ধে আপিল করে তারা আপাত স্থিতাবস্থার সুযোগ নিয়ে সুদে-আসলে লাভবান হচ্ছেন। তেমনি ঘটছে ব্যাংকের ঋণ আদায়ের জগতে প্রলম্বিত শুনানি দুর্নীতির জন্য সোনায় সোহাগা।

ছয়.

একটা বিখ্যাত উক্তি এ রকম : ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সব সমাজে সফল হয় না। শুধু যেসব দেশে প্রশাসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৎ কর্মকর্তা রয়েছে, সেসব দেশে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তি দেওয়া সম্ভবৃ মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে দুর্নীতি তাড়ানো সম্ভব নয়... আইন হলো মাকড়সার জালের মতো, যা ছোট ছোট পতঙ্গদের আটকাতে পারে, বড় পোকাদের ঠেকাতে পারে না।’ অর্থাৎ সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়ন করতে হলে সর্ব প্রথম সরকারকে সব ব্যবসা থেকে হাত গোটাতে হবে। মার্কিন সাংবাদিক উইল রজারসের ভাষায়, ‘সরকারের কাজ হচ্ছে সরকারকে ব্যবসাবাণিজ্যের বাইরে রাখা, যদি না ব্যবসায়ীরা সরকারের সাহায্যের প্রয়োজন বোধ করে।’ একমাত্র একচেটিয়া ব্যবসা ছাড়া সরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান লাভের মুখ দেখেছে, এমন নজির খুব কম। সরকারি ব্যাংক কিংবা বিমানের ব্যর্থতার কথা কে না জানে। তারপরও বলতে হয়, দুর্নীতি নির্মূলের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি সরকারি ব্যবসায়ী সংস্থায় একজন ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতিবিষয়ক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বেঞ্চ বা অন্য কোনো উপায় বের করতেই হবে। দুর্নীতিবাজদের অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল হচ্ছে বিচার বিভাগীয় দীর্ঘসূত্রতা।

তৃতীয়ত, সার্বিকভাবে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ব্যতীত যথা প্রশাসনিক, রাজস্ব, আমদানি-রপ্তানি, এমনকি নির্বাচন পদ্ধতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার ব্যতীত দুর্নীতি নির্মূল অধরা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আর এসব সংস্কারের বিরুদ্ধে যারা জোট পাকিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করে তাদের মধ্যে আছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এবং আমলা। সর্ষের ভেতর ভূত রেখে ভূত তাড়ানো যেমন অসম্ভব, তেমনি এসব সংস্কার-বিরোধী গোষ্ঠী ক্ষমতায় কিংবা ক্ষমতার আশপাশে থাকলে দুর্নীতি নির্মূল অভিযান ভেস্তে যেতে পারে। প্রসঙ্গত, প্রযুক্তি-নির্ভর কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রসার দুর্নীতি নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

 সব শেষে নির্মোহ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যতীত বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল অত সহজ হবে বলে মনে হয় না। মোট কথা, একমাত্র সুশাসন পারে দুর্নীতিমুক্ত এক বাংলাদেশ উপহার দিতে; সচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন থাকতে হবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরতে পরতে। জনগণ যাতে সরকারকে বলতে পারে : হুজুর, আমরা আপনার কাছে কোনো উপকার চাই না, শুধু মেহেরবানি করে দুর্নীতিবাজদের সামলান।

আসল কথা হলো, অন্তত দুর্নীতি নির্মূলের ক্ষেত্রে সদিচ্ছাই সব নয়, একই সঙ্গে সঠিক পন্থা বাস্তবায়ন এবং তার যথাযথ তদারকি সদিচ্ছার সুফল কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ডেনমার্কের যুবরাজ ছাড়া যেমন হ্যামলেট নাটক সম্ভব নয়, তেমনি অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য চাই ব্যয় সংকোচন এবং সে ক্ষেত্রে অর্থ পাচার ও দুর্নীতি গুরুত্বপূর্ণ ছিদ্র বলে আমরা মনে করতে পারি। যত তাড়াতাড়ি এই ছিদ্র বন্ধ করা যায়, ততই মঙ্গল। টোটকার সাহায্যে হয়তো শরীরের ফোসকা সারানো সম্ভব, কিন্তু গভীর ক্ষতের জন্য দরকার সার্জারি এবং এখনই।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত