মহীন ও তার শেষ ঘোড়া

আজও তাদের গান ফেরে মানুষের মুখে মুখে। যে প্রজন্ম তাদের পারফরমেন্স কোনোদিন স্টেজে দেখেনি তাদের একটা বড় অংশও যাদের ভক্ত সেই ব্যান্ডটি হল এক এবং একমাত্র ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও হারায়নি এতটা জনপ্রিয়তা।

১৯৭৪ সালের দিকে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ব্যান্ডটি গঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে দলটিতে সাত জন সদস্য থাকায় তাদের নাম ছিল ‘সপ্তর্ষি’। সাত সদস্যের মধ্যে ছিলেন, গৌতম চট্টোপাধ্যায় (কণ্ঠ, লিড গিটার, স্যাক্সোফোন ), তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায় (কণ্ঠ, গিটার), রঞ্জন ঘোষাল (এমসি, ভিজ্যুয়াল, মিডিয়া সম্পর্ক ), তাপস দাস (কণ্ঠ, গিটার), এব্রাহাম মজুমদার (পিয়ানো, ভায়োলিন), বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় (ড্রাম্স, বেস ভায়োলিন) ও প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় (বেস, বাঁশি)।

প্রথমদিকে ব্যান্ডটির নাম ছিল ‘তীরন্দাজ’। পরে এর নাম হয় ‘গৌতম চ্যাটার্জি বিএসসি অ্যান্ড সম্প্রদায়’। এরপর রঞ্জন ঘোষালের প্রস্তাবে ব্যান্ডটির নাম ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ রাখা হয়। এই নাম এসেছে কবি জীবনানন্দ দাশের ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থের ‘ঘোড়া’ শিরোনামের কবিতার দ্বিতীয় পঙক্তি থেকে। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম বাংলা রক ব্যান্ড।

১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সংবিগ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক (১৯৭৭), অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব (১৯৭৮) এবং দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি (১৯৭৯); এই তিনটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। যদিও সে সময়ে তারা প্রায় অপরিচিত ছিল বলা যায়। নব্বইয়ের দশকে তারা দ্য ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের মতোন পুনরায় সমালোচনামূলক মূল্যায়ন পেয়েছে। ১৯৯৫ সালে সমসাময়িক বিভিন্ন শিল্পীদের সমন্নয়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায় আবার বছর কুড়ি পরে শিরোনামে মহীনের ঘোড়াগুলির একটি কভার সংকলন প্রকাশ করে। জীবনমুখী গান এবং নৈতিক সঙ্গীতদর্শনের কারণে বর্তমানে তাদেরকে বাংলা গানের প্রথিকৃত বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

গান না হারালেও গানের স্রষ্টাদের অধিকাংশই একে একে পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। ব্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য গৌতম চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা জীবনমুখী গানের ধারার আদিস্রষ্টা। বাকি ছয়জন হলেন বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় – ড্রাম্স, বেস ভায়োলিন (১৯৭৬–১৯৮১) প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় – বেস, বাঁশি (১৯৭৬–১৯৮১) রঞ্জন ঘোষাল – এমসি, ভিজ্যুয়াল, মিডিয়া সম্পর্ক (১৯৭৬–১৯৮১) এব্রাহাম মজুমদার – পিয়ানো, ভায়োলিন (১৯৭৬–১৯৮১) তাপস দাস – কণ্ঠ, গিটার (১৯৭৬–১৯৮১) তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায় – কণ্ঠ, গিটার (১৯৭৬–১৯৭৮)।

সময়ের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে থাকা এ ব্যান্ডটির অন্যতম সদস্য ছিলেন তাপস দাস তবে গানপ্রেমীদের কাছে তিনি ‘বাপিদা’ নামেই পরিচিত ছিলেন। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে হার মানলেন তিনিও। কলকাতার এস এস কে এম হাসপাতালে রবিবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। নিভে গেল মহীনের ঘোড়াগুলির শেষ বাতি।

লাং ক্যানসারের তৃতীয় স্টেজে ছিলেন তিনি। অর্থাভাব থাকায় চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারছিলেন না একটা সময়। এই দুরারোগ্য ব্যাধির বিপুল খরচের কাছে একটা সময় তার পরিবার যেন নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। তখন তার পাশে এসে দাঁড়ান বর্তমান সময়ের একাধিক বাংলা ব্যান্ডের গায়করা। চিকিৎসা তহবিলের জন্য কলকাতায় একাধিক কনসার্টের ব্যবস্থা করেন। এরপর তারা ক্রাউড ফান্ডিং শুরু করেন। এরমধ্যেই পাশে এসে দাঁড়ান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। চিকিৎসার দায়িত্ব নেন।

বাংলাদেশের ব্যান্ড কমিউনিটিও একটি উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ১৪ জুলাই ‘ভালোবাসি জ্যোৎস্নায়’ শীর্ষক সেই কনসার্ট ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ইতোমধ্যে কনসার্টের টিকিটও বিক্রি শুরু হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই এলো শিল্পীর প্রয়াণের খবর।

দুই বাংলায় জনপ্রিয় হওয়া বেশ কিছু গানের কথা লিখেছেন তিনি। গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের পাশে থেকে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ গানের দলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তাদের ‘পৃথিবী’, ‘টেলিফোন’, ‘তোমায় দিলাম’ গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।