এ যেন এক অচেনা বাংলাদেশ

কুড়ি বছর পর সাফের মঞ্চে মালদ্বীপকে হারানোর রাতটা বাংলাদেশ দলের ফুটবলারদের জন্য ছিল অন্যরকম। হোটেল কর্র্তৃপক্ষ আগে থেকেই একটা কেক তৈরি করে রেখেছিল বাংলাদেশের জয়ের উদযাপনটা বাড়াতে। সেই কেক কাটার আগ মুহূর্তের একটি ভিডিও ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। কেক সামনে নিয়ে বসেছিলেন দলের হয়ে দ্বিতীয় গোল করা তারিক কাজী। পাশেই ছিলেন অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়া। তাদের ঘিরে ছিলেন দলের বাদবাকিরা। কেক কাটার আগ মুহূর্তে তারিক সবাইকে থামিয়ে বলে ওঠেন, ‘বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচ হারার পর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। আমরাও চাই এই আসরের চ্যাম্পিয়ন হতে।’ তারিকের এই কথাটা অত্যুক্তি মনে হতেই পারে। সেমিফাইনালের মঞ্চেই যে এখনো পা রাখা হয়নি। আগামীকাল বাংলাদেশকে টপকাতে হবে ভুটান বাধা। সেই পরীক্ষার প্রস্তুতি অবশ্য ১২ ঘণ্টা যেতে না যেতেই শুরু করেছে দারুণ উৎফুল্ল বাংলাদেশ দল। গতকাল দুপুরে বেঙ্গালুরু স্পোর্টস হল ক্লাব মাঠে দেখা মিলেছে এক অচেনা বাংলাদেশের।

একটা জয় আসলে বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের আবহ। ফুটবলাররা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, চাইলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। হাজারবার মাথা কুটেও যে গোলের দেখা মিলছিল না, মালদ্বীপের বিপক্ষে নব্বই মিনিটেই মিলে গেল তিনটি। এই জয় বাংলাদেশের ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস যেমন ফিরিয়ে দিয়েছে, তেমনি দেখাচ্ছে সেমিফাইনালের স্বপ্ন। এগিয়ে নেওয়া গোলের পর অ্যাঙ্কেলে চোট পেয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন তারিক কাজী। গতকাল অনুশীলনে তাকে দেখতে না পেয়ে শঙ্কাটা বাড়ল। তবে সেটা দূর করে দেন দলের ম্যানেজার আমের খান। যা জানালেন, তাতেই বোঝা যায় হাভিয়ের কাবরেরার এই দলটির ভাবনাতেই এসে গেছে বড়সড় পরিবর্তন, ‘তারিক খুব করে চেয়েছিল দলের সঙ্গে অনুশীলন করতে। আমরাই তাকে জোর করে হোটেলে রেখে এসেছি। আজ (গতকাল) থেকে মেডিকেশন শুরু হয়েছে। এক্সরে রিপোর্টেও খারাপ কিছু আসেনি। সব মিলিয়ে ও শঙ্কামুক্ত। তারপরও আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না।’

হোটেলে ফিরে অল্প-বিস্তর উদযাপন হলেও মাঠে মালদ্বীপকে হারানোর পর সেভাবে উল্লাসে মাতেনি দল। দলের অন্যতম অভিজ্ঞ উইঙ্গার মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানিয়েছেন উদযাপনটা তুলে রেখেছেন সেমিফাইনালের জন্য। আগের দুই ম্যাচে বদলি নেমে দলের আক্রমণের ধার বাড়ানো ইব্রাহিম জয়ের কারণ হিসেবে লম্বা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগকে সামনে টেনে এনেছেন, ‘সাফকে ঘিরে আমাদের প্রস্তুতিটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে, সেই সৌদি আরবে আবাসিক ক্যাম্প থেকে শুরু করে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা সাফের জন্য তৈরি হয়েছি। কম্বোডিয়া ও লেবানন ম্যাচের পর কোচ আমাদের ভিডিও দেখিয়ে পরিকল্পনার কথা বুঝিয়ে দেন। সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি, খেলেছি। বলতে পারেন আমরা সেটারও ফল পেয়েছি।’

মালদ্বীপের বিপক্ষে কেবল গোল করা নয়, মাঝমাঠ থেকে শুরু করে প্রতিটি পজিশনে ছিল বাংলাদেশ কর্র্তৃত্ব। দারুণ ছকে তারা পাসিং ফুটবল খেলে বিভ্রান্ত করেছেন প্রতিপক্ষকে। বল দেওয়া-নেওয়া, বোঝাপড়াটাও ছিল অসাধারণ। এর জন্য বাংলাদেশ অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়া কৃতিত্ব দিলেন দলের মিডফিল্ডারদের। যে দৃঢ়তা মালদ্বীপের বিপক্ষে দেখিয়েছে জামাল, দুই সোহেল রানা ও মোহাম্মদ হৃদয়কে নিয়ে গড়া বাংলাদেশের মিডফিল্ড, সেটাই স্বপ্ন দেখাচ্ছে অধিনায়ককে, ‘প্রতিটি ম্যাচেই এক-একরকম ভারসাম্য খুঁজে নিতে হয়। গত ম্যাচে আমরা চার জন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে খেলেছি। সত্যি বলতে আমরা স্ট্রাইকার ছাড়া খেলেছি। আমি খেলেছি ফলস নাইন হিসেবে। মাঝমাঠে আমরা যারা খেলছি, তারা সবাই বল পায়ে রাখতে পারি। এজন্য ফাহিম, রাকিব ভালো বলের জোগান পেয়েছে, আক্রমণের সুযোগ পেয়েছে।’

মালদ্বীপের বিপক্ষে গোটা দল দারুণ দলীয় শক্তির পরিচয় দিলেও তেকাঠীর প্রহরী আনিসুর রহমান জিকোকে কিছুটা সময় একটু নড়বড়ে মনে হয়েছে। বিশেষ করে ১৮ মিনিটে হামজা মোহাম্মদ বক্সের অনেক বাইরে থেকে শটে গোল করেছেন, এরকম প্রচেষ্টা অন্যসময় অহরহ ঠেকিয়েছেন দেশসেরা গোলকিপার। ওই গোল হজমের পরও আরেকটি ভুল করে বসেছিলেন, ভাগ্য সহায় তা থেকে গোল পায়নি মালদ্বীপ। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ভুটানের বিপক্ষে আরও ভালো খেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জিকো, ‘লক্ষ্য ছিল লেবাননের পরের দুই ম্যাচে ক্লিনশিট রাখা। সেই চাওয়া পূরণ হয়নি মালদ্বীপের বিপক্ষে। ভুটানের বিপক্ষে আমরা নামব সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে।’

বি গ্রুপটা এখনো উন্মুক্ত। চার দলেরই সুযোগ আছে সেমিফাইনালের চৌহদ্দিতে পা রাখার। তবে ২ ম্যাচ জিতে লেবানন অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেলেছে সেমিফাইনাল। ৩ পয়েন্ট করে আছে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের। ভুটান ২ ম্যাচে হারলেও বাংলাদেশকে কাল হারালে ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকবে তাদেরও। জামালরা অবশ্য কোনো সমীকরণ ভাবনায় নিতে চান না। বরং আরেকটি অসাধারণ পারফরম্যান্সে ইতি টানতে চান সেমিফাইনালের ১৩ বছরের অপেক্ষার।