ঈদযাত্রায় যেন ডেঙ্গু ছড়িয়ে না যায়

দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের ভিড় বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এখনো খোলা হয়নি পৃথক ওয়ার্ড বা কর্নার, রোগীদের যথাযথ চিকিৎসায় গুরুতর অসুস্থদের জন্য নেই পৃথক আইসিইউ সুবিধা। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মশারি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হচ্ছে না।

ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে অনেক রোগী মেঝে ও করিডরে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পাশাপাশি অন্য রোগীদেরও সেবা দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

এদিকে এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু রোগীদের স্বজন এবং সেবায় নিয়োজিত নার্স ও চিকিৎকদের ঈদ আনন্দ বিবর্ণ হতে চলেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন ভবনের ইউনিট-৫ এর ৭০২নং ওয়ার্ডে ৫ নম্বর বিছানায় ভর্তি শনির আখড়ার সুমাইয়ার কথাই যদি বলি, বিছানায় মশারি থাকলেও মাথার পাশে গুছিয়ে রেখেছেন। জানতে চাইলে তার ভাই ফরহাদ আহমেদ বলেন, মশারি টানালে গরম লাগে। এই ওয়ার্ডের দুজন নার্স, ১৮ দিন আগে সুমাইয়া ও তার দুবোন, এক ভগ্নিপতি এখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। সুমাইয়ার দাঁতের রক্তপাত বন্ধ না হওয়ায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সাধারণ মশা ডেঙ্গু রোগীকে কামড়ালে ওই মশাও এডিসের জীবাণু বহন করে। মশাটি কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত হবেন। এক পরিবারের চারজন ডেঙ্গু পজিটিভ হওয়ার বিষয়টি তাই প্রমাণ করে। আর ডিএমসিতে ডেঙ্গু আক্রান্তদের সঙ্গে অন্য রোগীরাও চিকিৎসা নিচ্ছেন, কিন্তু মশারি ব্যবহার করছেন না। ফলে চিকিৎসক-নার্স ও রোগীর এটেনডেন্ট সবাই ঝুঁকিতে রয়েছেন। ভবন-২ এর ৬০১, ৬০২, ৭০১, ৭০২, ৮০১, ৮০২ মেডিসিন ওয়ার্ড ছাড়াও ৯ তলায় ডেঙ্গু রোগী আছে। ৬০২নং মেডিসিন ওয়ার্ডের ১০টি কক্ষে ৮টি করে ৮০টি বিছানা আছে। এই ওয়ার্ডে গত রবিবার ১৫৯ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগী ৩৪ জন। প্রত্যেককে সঠিক ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। তবে পর্যাপ্তসংখ্যক মশারি নেই। যেগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলো কেউ ব্যবহার করছে না।

অবস্থাদৃষ্টে বোঝাই যাচ্ছে যে, এবার ডেঙ্গু মশার প্রজনন মৌসুম শুরুর আগেই পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তনসহ দ্বিতীয়বার আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। পরিস্থিতি সামলাতে জরুরি ও বহির্বিভাগের রোগীদের মধ্যে থেকে ফিল্টার করে যাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দরকার তাদের ভর্তি করা হচ্ছে। অন্যদের ফলোআপে থাকতে বলা হচ্ছে।

ডেঙ্গুতে এবার আগের মতো উচ্চমাত্রার পাঁচ দিনের জ্বর নাও হতে পারে। সামান্য জ্বর নিয়েও ডেঙ্গু হচ্ছে। আগে বলা হতো যে, পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলে এবং জ¦র সেরে যাওয়ার পরই কেবল জটিলতা শুরু হয়। এবার দেখা যাচ্ছে জ¦রের শুরুতেই বা দ্বিতীয়, তৃতীয় দিনেও জটিলতা নিয়ে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। আকস্মিক রক্তচাপ কমে যাওয়া, ক্যাপিলারি লিকেজ, রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়া, হেমাটোক্রিট বেড়ে যাওয়া দেখে জটিলতা বোঝা যাচ্ছে। শিশু ওয়ার্ডের একজন চিকিৎসক জানান, ‘এবার শিশুদের শক সিনড্রোম বেশি হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে চারজন শক সিনড্রোমজনিত রোগী আসছে। তাদের মধ্যে একজনের আইসিইউ সাপোর্ট লাগছে।’

ঢামেকে দৈনিক গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। গড়ে ১৫ জন ভর্তি হচ্ছেন। মাইল্ড, মডারেট ও সিভিয়ারসহ ভর্তি রোগীদের ৫০ শতাংশই শক সিনড্রোম দেখা যাচ্ছে। এদের মধ্যে কো-মরবিডিটি, গর্ভবতী ও শিশু বেশি। ইতিমধ্যে ঢামেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজন চিকিৎসক এবং দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, শনিবার সকাল থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১১৭ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ২৬৭ জন ও ঢাকার বাইরের ১৩২ জন। চলতি বছরের ১ থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন সাত হাজার ২৩৮ জন।

তাদের মধ্যে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন ৫৬১৯ জন। আর ঢাকার বাইরে ভর্তি হন ১৬১৯ জন। একই সময়ের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫৬৯৫ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৪৪৬৭ জন এবং ঢাকার বাইরে ১২২৮ জন। আর এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪৫ জন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজধানীর তুলনায় মফস্বলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আপাতভাবে কম হলেও নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছু নেই। সামনে ঈদ উপলক্ষে ইতিমধ্যেই রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে ঘরমুখো মানুষ। তাদের অনেকেই ডেঙ্গু জীবাণু বহন করে গ্রামে নিয়ে যেতে পারেন। আর তাদের কামড়ানো মশা সুস্থ মানুষকে যখন কামড়াবে, তখন তারাও সংক্রমিত হবেন। এভাবে সারাদেশে ডেঙ্গু মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রচারণা, সতর্কতা দেখা যাচ্ছে না। সরকার হয়তো তাদের মতো করে উদ্যোগ, প্রচারণা, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সেটা নিতে দেরি হয়ে যায় কি না সেটাই প্রশ্ন। তবে ঈদে যারা বাড়ি যাচ্ছেন তাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে ঘরমুখো মানুষ যখন শহরের বাসা তালাবদ্ধ করে গ্রামের উদ্দেশে শহর ছাড়ছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, তারা যেন বন্ধ ঘরের কোথাও পানি না জমে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখেন। কারণ দেখা গেল তাদের তালাবন্ধ ঘরের কোণে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে রেখেছে। ঈদ শেষে শহরের বাসায় তারা ফিরে এলে তখন ওই মশা তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। মূল কথা হচ্ছে, ঈদে ঘরমুখো মানুষের আনন্দযাত্রায় যেন ডেঙ্গু সারাদেশে ছড়িয়ে না যায়।

অন্যদিকে ইতিমধ্যে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু আক্রান্তদের মশারি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা দরকার। কাগজে-কলমে বাধ্যতামূলক নয়, সেটা মানা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা জরুরি। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কর্নার করা জরুরিভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। অন্য সাধারণ রোগী, নার্স ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তার কথাও মাথায় রাখতে হবে। গুরুতর অসুস্থরা যেন পৃথক আইসিইউ সুবিধা পান সে প্রস্তুতিও রাখতে হবে।

লেখক : ইন্টার্ন চিকিৎসক, ডিএমসি

towfiqsultan.help@gmail.com