তারুণ্যের রাজনীতিতে কপটতা!

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ডাকসু নির্বাচন এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক দল গঠন। হঠাৎ জেগে ওঠা কিছু তরুণের উচ্চাকাক্সক্ষা, নেতৃত্বহীনতা ও দিনশেষে কপটতা।

কোটা সংস্কার আন্দোলন যেভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা ছিল অভূতপূর্ব এবং অপরিকল্পিত। এমনকি যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারাও হয়তো ভাবেননি, কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র মাত্রা ধারণ করতে পারে। সরকারি চাকরির বিশাল সিলেবাস। চাকরিপ্রার্থী শিক্ষার্থীরা সকালবেলা লাইব্রেরিতে গিয়ে মাঝরাতে বের হন। বাংলা ব্যাকরণ থেকে ইংরেজি সাহিত্যিকের নাম মুখস্থ করেও শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান কোটাব্যবস্থা চাকরিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বারবার চাকরি পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায় থেকে ফিরে আসা কিছু হতাশ যুবক, কোটা সংস্কারের দাবি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে দাঁড়ায়। মূলত এই পটভূমি থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সৃষ্টি। আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা অনেকেই দেশের নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা বলে তাদের প্রতি একটি সহানুভূতিও ছিল। কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে এই আন্দোলনকে দেশের ‘সাবঅলটার্ন ভয়েস’ বা ‘নিম্নবর্গের স্বর’ ভেবে আত্মতৃপ্তিতে ভুগেছেন।

কিন্তু সেই স্বর যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এসেছে, সেখানকার বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা নিঃশর্তে মেনে নিয়ে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা, গবেষণার সংকট ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে তারা কোনোদিন কথা বলেনি। সামগ্রিক সংকটকে তারা কখনো নিজেদের সংকট মনে করেনি। যে মাত্র তাদের চাকরিপ্রাপ্তিতে সংকট তৈরি হলো তারা আন্দোলনে নেমে পড়ল। মূলত এই আন্দোলন নিজেদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা প্রাপ্তির লক্ষ্যে গড়ে ওঠা একটি স্বার্থবাদী আন্দোলন। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্র্থীদের এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তৈরির প্রতিষ্ঠান ভাবার যে প্রবণতা গড়ে উঠেছে তাকে প্রতিষ্ঠিত করে।  

আন্দোলনে যুক্তরা শুরু থেকে দাবি করেছেন, তাদের এই আন্দোলন ‘অরাজনৈতিক’। পল গিন্সবর্গ তার ‘পলিটিক্স অব এভরিডে লাইফ’ বইতে বলেছেন, আমাদের প্রাত্যহিক ব্যক্তিগত জীবন থেকে দেশের গণতন্ত্র সবকিছু সংযুক্ত এবং রাজনীতি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে দেশব্যাপী বিশাল এক আন্দোলন কীভাবে অরাজনৈতিক হয়, প্রশ্নসাপেক্ষ। মূলত এই ‘অরাজনৈতিক’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে একটি নিরপেক্ষতার ভান করে নিরাপত্তা তৈরির যে প্র্যাকটিস রয়েছে, সেই কৌশলই কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা গ্রহণ করেছিল। ‘অরাজনৈতিক’ শব্দের ছায়াতলে দাঁড়িয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে (ডাকসু) অংশ নিয়েছিল আন্দোলনকারীরা। কীভাবে রাজনৈতিক নির্বাচনে ‘অরাজনৈতিক’ শক্তি অংশ নেয় তার ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্টদের ছিল না। তাদের এই অরাজনৈতিকভাবে রাজনৈতিক বিজয়ে দেশের বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ ভীষণ রকম উৎসাহী ছিল। তারা ভেবেছিল, দেশের নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে নুরুল হক নুর ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) হওয়ার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বিজয় দেশে তরুণদের মধ্যে প্রচলিত ‘আই হেইট পলিটিক্স’ প্রত্যয়কে উৎসাহিত করেছে তা নিয়ে খুব কম লোকই আপত্তি করেছিলেন।

অবশেষে অরাজনৈতিক অবস্থান থেকে ইউটার্ন করে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী ‘গণ অধিকার পরিষদ’ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে। দলটির ওয়ান ম্যান আর্মি হয়ে উঠেন নুরুল হক নুর। যিনি নিজেকে ‘ভিপি নুর’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাকে নিয়ে অতি উৎসাহ, দলের মধ্যে ওয়ান ম্যান আর্মি হয়ে ওঠা, নিম্নবর্গের স্বর হিসেবে বুদ্ধিজীবীদের কারও কারও অতি উৎসাহ একসময় নুরকেই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের অংশ করে তুলেছে। 

তারুণ্যের রাজনীতিতে আবেগ থাকে, উচ্ছ্বাস থাকে, কিন্তু কপটামি ও স্বেচ্ছাচারিতা কাম্য নয়। স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা এক নয়। নুরের আচরণ স্বেচ্ছাচারী আচরণ। সম্প্রতি নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে ইসরায়েল গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ ওঠে। তার সঙ্গে এক ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তার ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ফ্যাক্ট-চ্যাকার এই ছবিকে সত্য বলে দাবি করেছেন। রাজনীতিতে অভিযোগ উঠতেই পারে। তার রাজনৈতিক জবাবও রয়েছে। কিন্তু নুরুল হক নুর যেভাবে ‘বৈঠক হলে কী হয়েছে’ বলে অহমিকা দেখিয়েছেন, তা ভয়ংকর। ব্যক্তি নুরুল হক নুর কেউ না। নবম গ্রেডের একটি সরকারি চাকরিপ্রার্থী তরুণ মাত্র। হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও জনতার সমর্থন পেয়েছে বলেই সে নুরুল হক নুুর হয়ে উঠতে পেরেছেন। কিন্তু সে সমর্থনের জবাবদিহিতা রয়েছে। নুরুল হক রাজনৈতিক অবস্থান থেকে একটি চেতনা প্রকাশ করেন, কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এটা তার রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে দ্বিচারিতা, এমনকি তার সমর্থকদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি। ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি এ দেশের মানুষের আবেগ রয়েছে। এ দেশের হাজার হাজার মানুষ ইয়াসির আরাফাতের মাথার রুমালকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক মনে করে এবং তা ধারণ করে। ফলে দেশের মানুষের আবেগ ও অনুভূতিকে আঘাত করার অধিকার নুরের নেই। 

নুর মিডিয়াবেষ্টিত হয়ে এখন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাবেষ্টিত হয়ে বাস করেন। কিন্তু তৃণমূলে যারা নুরের দল করেন তারা খেয়ে না খেয়ে দল করেন, ছাত্রলীগের রক্তচক্ষুকে চ্যালেঞ্জ করে তারা টিকে ছিলেন, আছেন। সে তৃণমূলের একটি রাজনৈতিক অনুভূতি আছে, আকাক্সক্ষা আছে। সে আকাক্সক্ষা নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে ধারণ করে সাম্য ও ন্যায়বিচারের সমাজ প্রতিষ্ঠা। সে আকাক্সক্ষায় যাকে দলনেতা বানানো হলো, সেই নুর শুরুর আগেই অন্ধকারে হাত মিলিয়েছেন। কিন্তু দেশের তারুণ্য তো অন্ধকারে পথ চলতে পারে না। শহীদের রক্তেভেজা এ দেশের সবুজ ঘাস। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে আমরা লাল-সবুজ পতাকা অর্জন করেছি। সে স্বাধীনতার মূল্যবোধকে যারা অবমূল্যায়ন করে, দেশের মানুষের আবেগ অনুভূতিকে যারা শ্রদ্ধা করে না তাদের পেছনে আমাদের তারুণ্য চলতে পারে না।

আমাদের সামগ্রিক সমাজ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। মানবিক রাষ্ট্র গঠন হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার পূর্ণ প্রতিফলনে ব্যর্থ হয়েছে সমাজ। তবু আশা আছে। কারণ আমাদের তরুণরা ন্যায়বিচারের জন্য দাঁড়াতে জানে। তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ রয়েছে। কিন্তু কেউ যদি আমাদের সে তারুণ্যকে ভুল ও অন্ধকার পথে পরিচালিত করে সে প্রতারণা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। 

লেখক : কলামিস্ট