ছয় এমইপির চিঠি: ইউরোপপ্রবাসী ৩০০ বিশিষ্ট বাংলাদেশির প্রতিবাদ

বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলকে দেওয়া ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ছয় সদস্যের (এমইপি) চিঠির প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইউরোপপ্রবাসী ৩০০ বিশিষ্ট বাংলাদেশি। বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি ইন ইউরোপের ব্যানারে জোসেফ বোরেলকে দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে ছয় এমইপি ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত হয়ে ওইরকম চিঠি দিয়েছেন।

ইইউরিপোর্টার ডটকো ওয়েবসাইটে ৩০ জুন (শুক্রবার) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি ইন ইউরোপের ব্যানারে জোসেফ বোরেলকে দেওয়া চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিখ্যাত বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মাজহারুল ইসলাম রানা, জার্মানপ্রবাসী সাংবাদিক শরাফ আহমেদ, জার্মানপ্রবাসী প্রকৌশলী অনীল দাস ‍গুপ্ত, ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল কালচারাল অ্যাওয়ার্ডজয়ী ও বাংলাদেশের শীর্ষ পুরস্কার বিজয়ী ফ্রান্সপ্রবাসী চিত্রশিল্পী পার্থ প্রতীম মজুমদার, অস্ট্রিয়াপ্রবাসী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. শহীদ হোসেন, ফ্রান্সপ্রবাসী আন্তর্জাতিক শিল্পী অধ্যাপক সোহেলা পারভিন শোভাসহ বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, পর্তুগাল, চেক প্রজাতন্ত্র, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, স্পেন ও সুইডেনপ্রবাসী অন্যান্য বিশিষ্ট বাংলাদেশিরা।

চিঠিতে বিশিষ্ট এই বাংলাদেশিরা বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলকে দেওয়া চিঠিতে ছয় এমইপি বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ ‍সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন। তারা প্রকারান্তরে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষে কাজ করছেন বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। তাদের ভুল ও অসত্য তথ্যের কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এতে ওই বিশিষ্ট বাংলাদেশিরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

ওই বাংলাদেশিরা জোসেফ বোরেলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্য এবং জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর বাংলাদেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতির সূচনা ঘটেছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, জিয়াউর রহমানের সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনামলে সামরিক বাহিনীর এক হাজারের বেশি সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল এবং ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির দুই মেয়াদের শাসনামলে তারা বিরোধী রাজনীতিক, অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাসহ বিরোধীদের নির্যাতন, অপহরণ, হত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।

বিশিষ্ট ওই বাংলাদেশিরা চিঠিতে বলেছেন, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) গঠিত হয়েছিল বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর জোট সরকারের শাসনামলে ২০০৪ সালে। ওই বছরের জুলাই থেকে ২০০৬ সালের অক্টোবরের মধ্যে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের হাজারো নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে ১ হাজার ৫০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচন বয়কটের নামে বিএনপি-জামায়াত জোট ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। সে সময় তাদের সহিংসতা, পেট্রলবোমা ও হাতবোমায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ২০ জন সদস্যসহ প্রায় ২০০ মানুষ নিহত হয়েছে।

২০১৮ সালে এই জোট নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাত্র গুটিকয়েক আসনে বিজয়ী হয়েছিল উল্লেখ করে ওই বিশিষ্ট বাংলাদেশিরা বলেছেন, ছয় এমইপি তাদের চিঠিতে এই নির্বাচনকে ‘মধ্যরাতের নির্বাচন’ বলে অভিহিত করেছেন, যা মূলত একটি গুজব। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে ও বাংলাদেশি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর টিভির সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে, ‘মধ্যরাতের নির্বাচন’-এর দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন।

চিঠিতে বিশিষ্ট বাংলাদেশিরা আরও বলেছেন, ছয় এমইপির উচিত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতির কী অবস্থা হয়েছিল, সে বিষয়ে জানা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সে সময়ই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে।

৩০০ বিশিষ্ট বাংলাদেশি তাদের মাতৃভূমির সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর দীর্ঘদিনের বাণিজ্য, শিক্ষা, গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার জোরালো প্রশংসা করে বলেছেন, ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্র ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী দেশের সক্রিয় সহযোগিতার কারণেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও স্মার্ট দেশে পরিণত হতে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বিশিষ্ট ওই বাংলাদেশিরা চিঠিতে বলেছেন, ছয় এমইপি বাংলাদেশের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ এবং ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু তা মোটেই ভালো কোনো কূটনৈতিক সমাধান নয়। এ ধরনের নীতি কেবলই শান্তিকামী একটি জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কাজেই তারা বিশ্বাস করেন, ছয় এমইপি ভুল ধারণাপ্রসূত যে দাবি জানিয়েছেন, তার কালো ছায়া বাংলাদেশ ও ইউরোপের সব দেশের দৃঢ়তর সহযোগিতার মাধ্যমে কেটে যাবে।