ব্ল্যাক মিরর ডিসটোপিয়া ও বাস্তবতা

জীবনে একটা পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম। ওই প্রথম ওই শেষ। সেটা হচ্ছে পাঠশালা ফটোগ্রাফি স্কুলের বেসিক ফটোগ্রাফি কোর্সে। ফটোগ্রাফি নিয়ে আমার একটা আবেগ আছে। কিন্তু কোনো কারণে জিনিসটা নিয়ে সিরিয়াসলি আগানো হয়নি। পড়ালেখা শেষ করে সাংবাদিকতা শুরু করি, প্রথম চাকরি ছিল ঢাকা ট্রিবিউনে। নিজের প্রথম কর্মক্ষেত্র বলেই বলছি না, সম্ভবত সাবধানী পাঠক মাত্রই স্বীকার করবেন, ঢাকা ট্রিবিউনের ফটোগ্রাফি ভালো। সাব এডিটর হিসেবে রাতের দিকে ছবির ক্যাপশন লিখতে খুব ভালো লাগত। কিন্তু খুব তাড়াহুড়া করে কাজটা করতে হতো। একে তো পত্রিকা প্রিন্টে যাওয়ার তাড়া তার ওপর নিজের বাসায় ফেরার তাড়া। কিন্তু এর মধ্যেই ঝটপট কাজ শেষ করার মজাও প্রচুর। তো একদিন বিকেল ৪টার দিকে অফিসে ঢুকে চা বানিয়ে নিজের ডেস্কে বসে পত্রিকা টেনে নিলাম। প্রথম পাতায়ই একটা ছবি দেখে তার ক্যাপশন পড়ে শিউরে উঠলাম। ছবিটা এক জোড়া পায়ের, একটা দশ বছরের মেয়ের পা, যে মেয়েটা নানিবাড়ি বেড়াতে গিয়ে মামার কাছে রেপড হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মরে গেছে।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, ওই ছবির ওই ক্যাপশন আমি নিজেই লিখেছিলাম আগের রাতে। ছবিটা আমার আগেই দেখা, স্টোরিটাও জানা। কিন্তু তারপরও আমার কেন আর দশটা সেক্সুয়াল ভায়োলেন্সের স্টোরি পড়ার মতন রিফ্লেক্স হলো! এর কারণ, আমার ধারণা, কিছু কিছু পেশায় মানুষকে কাজের খাতিরে কিছুটা রোবোটিক হয়ে যেতে হয়। ক্যাপশন লেখার সময় শব্দ গুনে ছবির যথাযথ বর্ণনা দিতে গিয়ে স্টোরিটা হয়তো আর মাথায় সাসটেইন করেনি। সঙ্গে আরও অনেকগুলো ক্যাপশন লিখতে হয়েছে, কারেকশন এসেছে, একটা কর্মযজ্ঞের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু পত্রিকা ছাপার পর কাগজটা যখন হাতে নিচ্ছি, যখন পাঠক হিসেবে একই স্টোরি মাথায় নিচ্ছি, তখন চিন্তা প্রক্রিয়া ঘটনার ভয়াবহতা ঠিকঠাক উপলব্ধি করতে পেরে কেঁপে উঠেছে। ওই ছবির ফটোগ্রাফার কে ছিলেন এখন আর মনে নেই। কিন্তু এই ছবি তুলতে গিয়ে তার কী পরিমাণ কষ্ট হয়েছে তা ভাবতেও ভয় করে। 

প্রযুক্তির দুনিয়ায় মানুষ কী করে অমানুষ হয়ে যায় তাই নিয়ে একটা সিরিজ হয়, ব্ল্যাক মিরর। আমার সিরিজ দেখার ধৈর্য নেই, ব্ল্যাক মিররে প্রতি এপিসোড আলাদা গল্প বলে বলেই এটা দেখতে পারি। ছয় নম্বর সিজনে মেইজি ডে নামের একটা এপিসোডে পাপারাজ্জি ফটোগ্রাফি নিয়ে একটা গল্প আছে। পাপারাজ্জিদের নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রচুর আলোচনা হয় প্রিন্সেস ডায়ানার বিতর্কিত মৃত্যুর পর পর। বলা হয় পাপারাজ্জিদের থেকে পালাতে গিয়েই গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হন প্রিন্সেস ডায়না। আবার আরেক দল লোকের ধারণা হচ্ছে, এই দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছে ব্রিটিশ রয়্যাল ফ্যামিলিকে কলঙ্কমুক্ত করতে। লুকিয়ে সেলিব্রিটিদের ছবি তুলে বিনা অনুমতিতে প্রকাশ করে দিয়ে পাপারাজ্জিরা গালাগাল খায়, মারধরও জোটে কপালে। বেশিরভাগ নারী সেলিব্রিটি বিনা অনুমতিতে তাদের সন্তানদের ছবি প্রকাশ করার জন্যই খাপ্পা থাকেন। কিন্তু তবু এই জিনিস চলে, চলে তার কারণ নিশ্চয়ই ‘পাবলিক খায়’। সে যা-ই হোক, পাপারাজ্জিদের বদৌলতে লিওনার্দো ডি’ক্যাপ্রিওর ভুঁড়ি হয়ে যাওয়া শরীরের বিচ ফটোগ্রাফি দেখেছিলাম। দেখলাম, বডি শেমিং কেবল নারীর বিষয় নয়, বেশি সুন্দর পুরুষদের কপালেও এই জিনিস লেখা থাকে! 

মেইজি ডে দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, এরকম একটা ক্লিশে গল্প নতুন করে আবার কেন বানাল! যারা দেখেননি তাদের সুবিধার জন্য বলি, গল্পটা পুরনো মানুষ নেকড়ের কামড়ে নেকড়ে হয়ে যায়, পূর্ণিমা রাতে শিকার করতে বের হয়। এক সেলিব্রিটি নারীর সঙ্গে হিট অ্যান্ড রান ঘটে, তিনি নেকড়ের কবলে পড়েন। গল্পটা দেখা যায় এক পাপারাজ্জি প্রটাগনিস্টের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে, যিনি প্রথমত পাপারাজ্জিগিরি করতে করতে নৈতিক সংকটে ভোগেন, কিন্তু পেটের দায়ে আবার পুরনো পেশায় ফিরে আসেন। দ্বিতীয়ত, তিনি শুরুতে ওই অভিনেত্রীর প্রতি অত্যন্ত মানবিক আচরণ করলেও শেষে গিয়ে সিস্টেমের সঙ্গে সন্ধি করেন, নেকড়েতে পাল্টে যাওয়া সেলিব্রিটির শেষ পরিণতির ছবি তোলেন যা বিক্রি করে হয়তো তার বাকি জীবন চলে যাবে।

এই এপিসোড দেখে মনে হলো, আমাদের দেশের পাপারাজ্জি ফটোগ্রাফারদের কী অবস্থা! আমরা কি স্টারদের ঠিকুজি-কোষ্ঠী জানতে চাই! তাদের হাঁড়ির খবর ট্যাবলয়েড বের করে ছাপি! না। আমাদের দেশে উল্টোটা ঘটে। আমাদের স্টাররা নিজেরাই সাংবাদিকদের ডেকে দাম্পত্য কলহ মেটান। নিজেরাই এক বছরের কম বয়সী শিশুসন্তানকে টেলিভিশন লাইভে এনে (পড়–ন, এক্সপোজ করে) কান্নাকাটি করে বিবাহের স্বীকৃতি চান। জনতার আদালতে বিচার চেয়ে সালিশ করেন। আমাদের দেশে পাপারাজ্জি ফটোগ্রাফারের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রেগন্যান্ট অবস্থায় ছবি/সেলফি তুলে সময় বুঝে পোস্ট তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেরাই করেন।

আমরা যে সময়ে বাস করছি তাকে কী বলা যায়! আমি জানি না। সব মিলিয়ে যেসব বাস্তবতা আমরা দেখি এর গল্পগুলো যে কোনো ডিসটোপিয়ান ফিকশনকেই হার মানায়, ব্ল্যাক মিরর এই বাস্তবতার সামনে তেমন কিছু না। নিজের ব্যক্তিগত যা কিছু, সে সব কিছু বেচে দেওয়াও হয়তো কিছুই না। কিন্তু শুধু তো নিজের দাম্পত্য সম্পর্ক নয়, নিজের অপরাধের প্রমাণও লোকে রেকর্ড করে রাখছে, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মনে করা যেতে পারে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করার কথা। ভিডিও ক্লিপটির কারণেই এই মামলায় বিচার পাওয়া গেছে, অপরাধীদের শাস্তি বিধান করা গেছে। কিন্তু অপরাধীদের দিক থেকে এই ভিডিও তৈরি করার ব্যাখ্যা কী? আক্রান্ত বা ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানোর জন্য ভিডিও করলে সেটা তো ইন্টারনেট পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা না। ওই মামলার প্রধান আসামি দেলোয়ার এর আগেও ধর্ষণের মতন অপরাধ করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় তার সাজা হয়।

মেইজি ডে এপিসোড যে মানবিকতা হারিয়ে যাওয়ার কথা বলে, নিয়ার ফিউচারে মানুষের মনুষ্যতর আত্মকেন্দ্রিক প্রাণী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখায় তার চেয়ে অনেক বেশিদূর আমরা ইতিমধ্যেই চলে গেছি। ব্ল্যাক মিররকে আর ফ্যান্টাসি মনে হয় না, বাস্তবতার উদাহরণ বলেই ভ্রম হয়। ফটোগ্রাফির মতন অসাধারণ একটা আবিষ্কার ও প্রযুক্তিকে মানুষ যে কুৎসিত জায়গায় নিয়ে গেছে, তা দেখে বলতে ইচ্ছা করে, রিয়ালিটি ইজ আগলিয়ার দ্যান ডিসটোপিয়ান ফ্যান্টাসি।

লেখক : সাহিত্যিক ও লেখক

ummerayhana@gmail.com