মরিচ যার অধীন আন্ডাও তার আন্ডারে

বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার অঙ্গীকার অব্যাহত আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। সরকারের শীর্ষমহল সেই চেষ্টার কথা জানান দিচ্ছে অবিরাম। বলছে, এ সংক্রান্ত প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। কিন্তু, নমুনা তা বলছে না। বরং আলামতে মাঝেমধ্যেই চুয়াত্তরের ছায়া মিলছে। চুয়াত্তরের অভাব-দুর্ভিক্ষ, দ্রব্যমূল্যসহ বাজার পরিস্থিতির পেছনে দলীয় লোকদের ভূমিকার পাশাপাশি ছিল বঙ্গবন্ধুর বিরোধী শক্তির কারসাজি। এবার প্রতিপক্ষের জায়গা নেই। দলীয় সিন্ডিকেটই সর্বেসর্বা। যাচ্ছে তাই করে চলছে তারা। কাঁচা মরিচ থেকে শুকনো পেঁয়াজ, চাল-ডাল-তেল সবই তাদের কবজায়। যখন যেটা নিয়ে পারে কাণ্ড ঘটায় তারা। হাহাকার-হুলস্থুলের মধ্যে হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। মানুষ মুখস্থ গালিগালাজ করে সরকারের। স্মরণ করে চুয়াত্তরের কথা।  

চুয়াত্তরের অপশক্তি ও সিন্ডিকেটকে রুখতে হেন চেষ্টা নেই যা না করেছেন বঙ্গবন্ধু। কেবল ডাক-দোহাই, তিরস্কার নয়, এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীও নামিয়েছিলেন তিনি। একে একে ধরা পড়তে থাকে নিজ দলের কিছু হোমড়া-চোমড়া। দলের ভেতরের আপত্তি-অসন্তোষে কিছুদিনের মধ্যে মাঠ থেকে তুলে নিতে হয় সেনাবাহিনীকে। দুষ্টক্ষতরা যা করার করতেই থাকে। তাদের অপকর্মের জের জনপ্রিয় বঙ্গবন্ধুকে ক্রমশ নিয়ে যেতে থাকে অজনপ্রিয়তার দিকে। এবার সময় ও পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রেক্ষাপটও বদলেছে। কিন্তু, পারিপার্শ্বিকতায় বেশ মিল। বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরার কার্যকর জার্নি করার অবস্থা এখন সরকারের নেই। বাজার সামলানো, দল নিয়ন্ত্রণ, আসন্ন নির্বাচন, বৈশ্বিক আবহসহ যাবতীয় সিডর সামলাতেই সরকার ক্লান্ত প্রায়। এসবের অনিবার্যতায় নতুন অর্থবছর শুরু করতে হয়েছে কৃচ্ছ্র সাধনের বার্তা দিয়ে। যদিও সরকারের প্রেসনোটে বলা হয়েছে কেবল বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা। কৃচ্ছ্রসাধনে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেটের আওতায় সব ধরনের বিদেশ ভ্রমণ ও সরকারি দপ্তরে গাড়ি কেনা বন্ধের ঘোষণা দিয়ে রবিবার রাতে জারি করা হয়েছে প্রেসনোটটি। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও ২৫ শতাংশ অর্থ সাশ্রয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে পাঠানো পরিপত্রের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিদেশ সফর কমাতে। পাশাপাশি আগামী এক বছরে মোটরযান, জলযান ও আকাশযান খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এটি নির্দেশনা হিসেবে নতুন নয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও এর আগে একাধিকবার এসব নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশ কাগজে-কলমেই থেকেছে। বাস্তবে কে শোনে কার কথা। পুকুর খনন বা খিচুড়ি রান্না শেখার নামে বিদেশ সফরের মতো মশকারার লাগাম তেমন টানা যায়নি। রোখা যায়নি চুরি, দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচার। সিন্ডিকেট হয়ে ওঠে আরও বেপরোয়া, ড্যামকেয়ার। চাল-ডাল থেকে কোরবানির চামড়া বা বরিশাল-পিরোজপুরের আমড়া সবখানেই তাদের থাবা। গত কদিন পেঁয়াজের পর তাদের আছর পড়ে কাঁচা মরিচেও। কাঁচা মরিচের কেজি হাজার টাকায় নিয়ে ঠেকানোর কারিশমা দেখায় তারা। আবার আমদানি দেখেই তা অর্ধেকে নামিয়ে ফেলার দক্ষতার বায়োস্কোপ প্রদর্শনও হয়েছে। ক’দিন আগে যা হয়েছে পেঁয়াজ নিয়ে। এক আচানক কাণ্ডকীর্তি সিন্ডিকেটের। তারা কাঁচা মরিচের মা-বাপ বদলে দিতে পেরেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খেই হারিয়ে বলে ফেলেছেন, কাঁচা মরিচ তার মন্ত্রণালয়ের নয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এর আগে গণ্ডগোল পেকেছে ডিম-মুরগি নিয়ে। আণ্ডা কার আন্ডারে তা খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বাণিজ্য, কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে।

সিন্ডিকেট কাণ্ডের মধ্যে এক প্রতিমন্ত্রী বলে বসেন, মন্ত্রীরাও সিন্ডিকেট করেন। নাম বললে তার প্রাণনাশের ভয়ের কথাও জানান তিনি। আর বাণিজ্যমন্ত্রী কয়েকদিন বলেছেন, সিন্ডিকেট ভাঙা খুব রিস্কি। এখন বলছেন, ভাঙার চেষ্টা করছেন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সিন্ডিকেটকে রক্ষা করতে গিয়ে নানা অজুহাতসহ এদিক-সেদিক কথা বলে তালগোল পাকানোর আয়োজনও ব্যাপক। যা কখনো চরম হাস্যকর-বিরক্তিকর। কখনো কখনো বিনোদনেরও। বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়লে বলে দেওয়া হয় ফলন কম। আবার আমদানির অনুমতির কথা শুনলে দাম অর্ধেক হয়ে যায়। ব্রয়লার মুরগির দাম ২৭০ টাকা উঠলে খামারিরা জানায়, মুরগির খাবারের উচ্চমূল্য। তাই দাম বেশি। সেই ব্রয়লার মুরগির দাম কেন এখন ১৯০ টাকা? রাতারাতি কি মুরগির খাবারের দাম কমে গেছে? চিনি নিয়ে তো কথামালার তসবিহ জপা চলছেই। একই মিলে তৈরি কেরু মদ লাভ করে, চিনি কেন লোকসান দেয় প্রশ্ন করলে ক্ষেপে যান সংশ্লিষ্টরা। আচানক যত কাণ্ড। লতি বা মরিচের উচ্চ দরের জন্যও রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলার সংকটসহ ইহলৌকিক নানা কারণ টেনে আনায়ও কমতি নেই।

বাজার জনগণের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হলেও মোটেই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। তারা সরকারের অত্যন্ত চেনাজানা। পরাক্রমশালীও। চিনি, গম, ভোজ্য তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী বা পেঁয়াজ-মরিচের কারবারিসহ বাণিজ্যাঙ্গনের বাদবাকিরা কেউই অন্ধকার জগতের বাসিন্দা নন। মন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মহলের অন্তরাত্মায় তাদের ঘরবসতি। তাদের কাজকর্মে বাধা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ কথাটি বুঝেশুনেই বলছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। দেশের বিজনেস সেক্টরের অন্যতম অধিপতি তিনি। ব্যবসায়ীদের হাঁড়ির খবর তার জানা। সিন্ডিকেটের আতিপাতি থেকে চুনোপুঁটির খবর স্বাভাবিকভাবেই তার রাখার কথা। সামনে নির্বাচন। এ সময় সরকার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কতটা হার্ড লাইনে যেতে পারবে সেই প্রশ্ন আছে। কখনো বাজার অর্থনীতি, কখনো মিশ্র অর্থনীতিসহ মার্কেট পলিসির নানান কথা শোনানো হচ্ছে। শুনতে ভালো। তবে, বাস্তব কঠিন।

সরকার, সরকারি সংস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীসহ চলমান চেইনই মূলত সিন্ডিকেট। তা ভাঙার আওয়াজ ‘দূরের বাদ্য শুনিতে সুন্দর’-এর মতো। আর বাস্তবটা ‘দিল্লি হনুজ দুরস্ত’। তাই সিন্ডিকেট কে, কী, কারা এর স্রষ্টা এসব প্রশ্নের জবাব অনেকটাই আপেক্ষিক। এরপরও বাণিজ্যমন্ত্রীর ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে জড়িত সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা চলছে’শীর্ষক বক্তব্য দেওয়া কম কথা নয়। এদেশে একদিন শ্রেণিসংগ্রাম হয়েছিল। শ্রেণিযুদ্ধ হয়েছিল। ভারতেও হয়েছিল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-এমএলের শ্রেণিযুদ্ধকে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন করেছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মসনদ কেঁপে উঠেছিল। এক ইতিহাস বারবার আসে না সত্য। তবে, ইতিহাসে ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তি হয়। ১৯৪৬-১৯৯১ সালের স্নায়ুযুদ্ধ আবার পৃথিবীতে ফিরে এসেছে এবং সমগ্র বিশ্বে চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেও কিছু উপাদান মেলে। বাংলাদেশের সিন্ডিকেটগুলো এবং এদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের কর্মকাণ্ড ইতিহাসের কালো অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ধরনের পরিস্থিতে তাচ্ছিল্য, রসিকতা, অজুহাত- খিস্তিখিউর বড় জোর বিনোদন জোগায়। পেঁপে বা কুমড়া দিয়ে বেগুনি, সয়াবিন তেলের ছিদ্দত কাটাতে বাদাম তেল, কাঁচা মরিচ শুকিয়ে খাওয়ার রেসিপি বাতলানোতে মানুষ আলোচনার খোরাক পায়। ট্রলের কনটেন্টও পায়। দুর্গতি মোচনের পথ পায় না। তবে, পথ খোঁজার তাগিদ পায়। কাঁঠাল চাষ এবং প্রসেসিংয়ের ব্যবস্থা হলে সেখানেও মাথা ঢোকানোর সক্ষমতা তারা রাখেন। কাঁঠাল ঘিরেও লুটপাট  প্রকল্প নিয়ে কোন ব্যাংকের ওপর সওয়ার হবেন, কাকে ঘিরে তাওয়াফ করবেন তাও জানেন।

রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার পারঙ্গমতা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ভবিষ্যতে আরও অনেক কিছুই করা ও পারার নমুনা তারা দেখাচ্ছে। ঘটনা ঘটিয়ে নিজের আখের নিয়ে তাদের কেটে পড়ার হিম্মত ইতিহাসে আছে দগদগে ঘায়ের সাক্ষী হয়ে। চুয়াত্তরে সফল ওই চক্র পরেও মিলেমিশে শিরনি খেয়েছে। সময়ে সময়ে খোলস ও ধরন পাল্টে খেয়েই চলছে। এ চক্র শুধু পণ্যের সিন্ডিকেট করে না। দেশের অস্তিত্বও খাবলে খেতে পারে। দুনিয়ার তাবৎ উন্নত ও স্বনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো সামনে এগোয় তাদের সিগনেচার প্রোডাক্ট সামনে নিয়ে। আমাদের পাট-চামড়াসহ অনেক গর্ব-ঐতিহ্য খেয়ে সাফা করেছে এই খাদকরাই। খেতে খেতে এরা দল-সরকারসহ আরও অনেক কিছু খেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের সত্তা পর্যন্ত খেয়ে এখন নিয়ন্তাও হয়ে উঠছে কিনা তা সবার আগে ভাবনার তালিকায় নিতে হবে ক্ষমতাসীনদের।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

mostofa71@gmail.com