গেজেটের আগেই মেয়াদ শেষ

পরিকল্পিত উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের ৩২৮টি পৌরসভার মধ্যে ২৫৫টির মাস্টারপ্ল্যান (মহাপরিকল্পনা) করেছে সরকার। এসবের মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে প্রণীত ২৫০টি পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ গেজেট প্রকাশের আগেই শেষ হয়ে গেছে। পাঁচটি পৌরসভার গেজেট মেয়াদের মধ্যেই হয়েছে।

মাস্টারপ্ল্যানের গেজেট প্রকাশের পর বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়ে থাকে। এটাই সাধারণ নিয়ম। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে মাস্টারপ্ল্যানের ডকুমেন্টসের গেজেট হওয়ার আগেই নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে সরকারের গচ্চা গেছে প্রায় ৩১ কোটি টাকা।

কোনো অঞ্চল বা শহর সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে মাস্টারপ্ল্যান করতে হয়। অর্থাৎ কতটুকু জায়গায় বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, মার্কেট, স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ, সবুজ অঞ্চল, জলাশয় ও শিল্প-কারাখানার হবে তা নির্ধারিত থাকে মাস্টারপ্ল্যানে। ওই নির্দেশনা অনুসরণ করেই জায়গার উন্নয়ন করা হয়।

এভাবে উন্নয়ন হলে ওই অঞ্চল বা শহরের সৌন্দর্য বাড়ে এবং এর পরিবেশ ও বাসযোগ্যতা বজায় থাকে। শহরবাসীকে যানজট, জলজট, বায়ুদূষণ প্রভৃতি দুর্যোগ-দুর্ভোগের কবলে পড়তে হয় না।

মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সময় সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বা শহরের ভূমির শ্রেণি, উন্নয়নের ধরন, মানুষের জীবনাচরণ ও চাহিদা বিবেচনা করে ‘নির্দিষ্ট’ সময়ের জন্য মাস্টারপ্ল্যান ডকুমেন্টস তৈরি করা হয়।

২৫৫ পৌরসভার জন্য প্রণীত এলজিইডির মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। বেশ আগেই এসবের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের আগে তার আইনগত ভিত্তি দিতে গেজেট প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মাস্টারপ্ল্যানগুলোর গেজেট প্রকাশ হওয়ার আগেই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন মাস্টারপ্ল্যানগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে আবার মাঠপর্যায়ের কাজ করে সংশোধন করতে হবে। এ কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হবে।

জানা গেছে, এলজিইডি ‘জেলা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ২২টি পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে। এসবের জন্য খরচ হয়েছে ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। প্ল্যানগুলো ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে করা হয়েছে। এসবের বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছিল পাঁচ বছর। সাড়ে তিন বছর আগে প্ল্যানগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর ‘উপজেলা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ২১৫টি উপজেলা পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়। এসবের খরচ হয়েছে ১৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। প্ল্যানগুলো ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে করা হয়েছে। এসবের মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে।

জানা গেছে, এলজিইডির ‘দ্বিতীয় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় একটি পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে সরকারের খরচ হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে এ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ হয়েছে। এর মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় আড়াই বছর আগে।

২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ‘ভোলা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণীত হয়েছে। খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। ইতিমধ্যে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের মেয়াদও শেষ হয়েছে।

‘তৃতীয় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ১৬টি পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। খরচ হয়েছে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে এ মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। এসব মাস্টারপ্ল্যানেরও মেয়াদ শেষ হয়েছে।

এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে ব্যর্থতায় জর্জরিত এলজিইডি আবারও ১৪৪টি নন-মিউনিসিপ্যাল উপজেলা শহরের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৮ সালে ১২টি উপজেলা শহরের পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। গত জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হচ্ছে প্রায় ৯২ কোটি টাকা। সম্প্রতি নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ১০০ কোটি টাকা খরচে ৬১টি উপজেলার মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের অনুমোদন পেয়েছে তারা।

সরকারের বিপুল অর্থ খরচে তৈরি হওয়া এসব মাস্টারপ্ল্যানও আলোর মুখ দেখবে কি না সন্দেহ।

এলজিইডি সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ১৮ মে স্থানীয় সরকার বিভাগে উপজেলা ও পৌরসভাগুলোর জন্য মহাপরিকল্পনাসংক্রান্ত একটি সভা হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম।

ওই সভায় এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘পাঁচ থেকে দশ বছর আগে প্রণীত মহাপরিকল্পনা প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় সংশোধন বা হালনাগাদ করা সম্ভব হবে। উপজেলা শহরের (নন-মিউনিসিপ্যাল) মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উপজেলাগুলোর মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কারিগরি প্রস্তাব উন্মুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যমান মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হলে আগে সংশোধন করতে হবে।’ এর মানে আবার নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে এবং আবার এসবের জন্য অর্থ খরচ হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলজিইডি পৌরসভা নিয়ে যেসব মাস্টারপ্ল্যান করেছে সেসবের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নতুন করে এগুলোর গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে তেমন কোনো কাজ হবে না।’ তার অভিমত, ‘মাস্টারপ্ল্যান তৈরি এলজিইডির কাজ নয়। প্রকল্পের সুবিধা নিতে তারা এ কাজ করে থাকে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে অথচ সুফল মিলছে না।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী নিজের সাফল্যের পাল্লা ভারী করতে পৌরসভা মাস্টারপ্ল্যানের গেজেট প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটা করেও কোনো লাভ হবে না। পরিকল্পনাগুলো সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নিতে হবে।’

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন পৌরসভা গঠনের পাঁচ বছরের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যান করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর পুরাতনগুলোর ক্ষেত্রে পৌরসভা আইন হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যান করতে বলা হয়েছে। সে বিবেচনা করেই সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল। এলজিইডির ব্যর্থতায় তা আলোর মুখ দেখল না। যার যে কাজ করার কথা তা অন্যকে দিয়ে করালে এমনই হয়। দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের উচিত এলজিইডিকে দিয়ে আর কোনো মাস্টারপ্ল্যান না করানো। স্থানীয় সরকারের আওতায় একটি পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এ কাজ করা দরকার। বাস্তবায়নকারী সংস্থার হাতে পরিকল্পনার দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। তাহলে ২৫০ পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যানের ব্যর্থতার মতো আরও ব্যর্থতার চিত্র দেখতে হবে।’

এলজিইডির নগর উন্নয়ন ও নগর অবকাঠামো উন্নয়ন বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোল্লা মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যানগুলোর বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সেগুলো সংশোধন করে বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার চাইলে এখন গেজেট করতে পারে। তা সংশোধন করতে অসুবিধা হবে না। এটা নিয়ে একটি সভা হয়েছে। আশা করা যায়, জটিলতার নিরসন ঘটবে।’

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলজিইডির ২৫০ পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যানের গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে এ বিষয়ে একটা সভাও হয়েছে। দ্রত গেজেট প্রকাশ করা হবে।’

মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও মাস্টারপ্ল্যানগুলোর গেজেট প্রকাশের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে মাস্টারপ্ল্যানগুলো কিছুদিন আগে করা হয়েছে।’ এসবের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টির খোঁজ নেব।’