যুক্তরাষ্ট্রের ছকে ব্যবসায়ীরাও

ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি) থেকে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এই তহবিল থেকে অর্থায়নের সুবিধা পেতে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব করেছে। এতদিন সেটা তেমন আমলে না নিলেও এবার যুক্তরাষ্ট্র ডিএফসি সুবিধা দিতে এগিয়ে এসেছে। আর এ সহায়তা পেতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে পরিবেশ, মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আজ মঙ্গলবার ঢাকা সফরে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নাগরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া ও সহকারী সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু। এ সফরে তারা আগামী নির্বাচন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি বেসরকারি সেক্টরে শর্তযুক্ত বিনিয়োগ করার প্রস্তাব করতে পারেন। আর এর মধ্য দিয়ে আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে দেশের প্রতিষ্ঠিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছে পেতে চায় বিশ্ব মোড়ল এ দেশটি; যা সরকারকে নতুন করে চাপে ফেলতে পারে।

চার দিনের সফরে মার্কিন এই প্রতিনিধিদলের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। এ সময় তারা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা, গণতন্ত্র সুসংহত করা, মানবাধিকার উন্নয়ন এবং শ্রম অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে পারেন বলে জানা গেছে।

সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও বিদেশি সম্পর্কোন্নয়ন নিয়ে কাজ করা আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কৌশল নিয়েছে। সেটা হলো, তারা বেসরকারি সেক্টরে শর্তযুক্ত বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসবে। বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে দেশের প্রতিষ্ঠিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছে পেতে চায় তারা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিএফসি তহবিল উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেসরকারি খাতে শর্তযুক্ত ঋণ দিয়ে থাকে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারবিষয়ক ইস্যুগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে বেসরকারি সেক্টরের বড় ব্যবসায়ীদের পেতে মূলত শর্তযুক্ত ডিএফসি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই তহবিল জ¦ালানি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কম সুদে, দীর্ঘমেয়াদি ও ক্ষেত্রবিশেষে সুদবিহীন বড় অঙ্কের অর্থায়ন করে থাকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বেসরকারি বাণিজ্যিক সেক্টরে। তবে এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবেশ, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, পরিবেশ ও শ্রম অধিকারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সন্তুষ্টি অর্জন করতে হয়। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার পরিস্থিতি রুগ্্ণ থাকা কোনো দেশে ডিএফসি তহবিল দেয় না। ডিএফসির মূল লক্ষ্যই হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সরকারপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এখানে আমার কোনো কিছু জানা-বোঝার কথা নয়।’

জানা গেছে, দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের যে চ্যালেঞ্জ সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা গ্রহণ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদল সে সম্পর্কেও আলোচনা করবে। টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে কী ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তার একটি রূপরেখাও ওই প্রতিনিধিদলের হাতে তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা গ্রহণ ও দেশের মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে পারে সরকার তেমন একটি পরামর্শও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এ প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে আসতে পারে। আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপির পরস্পরবিরোধী অবস্থান দূর করতে আবারও সংলাপের প্রস্তাব আসবে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিনিধিদলের কাছ থেকে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র ও সরকারের দুই মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও শ্রম অধিকার বিষয়ে এবং আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে মূলত সফরকারী যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদল সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করবে।

সূত্রগুলো জানায়, সরকারও মানবাধিকার, গণতন্ত্র উন্নয়ন ও শ্রম অধিকার আইন নিয়ে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়নের পথে, সেগুলো বিস্তর আকারে প্রতিনিধিদলের কাছে তুলে ধরবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল সফরে আসুক, আলোচনা করুক, তারপর কথা বলব।’ তিনি বলেন, সব ঠিক আছে।

কূটনীতিক কৌশল নিয়ে কাজ করেন সরকারি দলের এমন একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্রমিকদের মানোন্নয়ন, অধিকার সুরক্ষায় ইতিমধ্যে শ্রম আইন সংশোধন করেছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র নিশ্চিতে সরকার কী কী করেছে, তা উদাহরণসহ তুলে ধরা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলকে সন্তুষ্ট করতে ইতিমধ্যে বিস্তারিত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে সরকার মানবাধিকারের ক্ষেত্রে যে বিশ্ব স্বীকৃতি অর্জন করেছে, সেগুলোও সফররত প্রতিনিধিদলকে অবহিত করা হবে।

ডিএফসির ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, ডিএফসির বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক উন্নয়নের মঞ্চে একটি শক্তিশালী এবং আরও প্রতিযোগিতামূলক নেতা করে তোলে। রূপান্তরমূলক প্রকল্পগুলোতে মিত্রদের সঙ্গে অংশীদারত্ব করার এবং রাষ্ট্র-নির্দেশিত উদ্যোগ; যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও খারাপ করে দিতে পারে, সেগুলোতে আর্থিকভাবে উপযুক্ত বিকল্প প্রদান করে আন্তর্জাতিক এ তহবিল।

ডিএফসির বিনিয়োগ প্রভাবশালী বৈশ্বিক উন্নয়ন, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রগতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের জন্য রিটার্ন তৈরিতে ফোকাস করে। ডিএফসির বিনিয়োগ সীমা ৬০ বিলিয়ন ডলার। ডিএফসি উন্নয়নশীল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের সমাধানে অর্থায়নের জন্য বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে। সংস্থাটি শক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে। ডিএফসি উদীয়মান বাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ছোট ব্যবসা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন করে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি সংস্থা ডিএফসি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চমান মেনে চলে এবং পরিবেশ, মানবাধিকার এবং কর্মীদের অধিকারকে সম্মান করে।

ডিএফসি যে বিনিয়োগগুলো সংহত করে তা বিশ্বের কিছু দরিদ্র দেশ এবং সংঘাত দ্বারা প্রভাবিত অঞ্চলসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে কাজ করে। এসব বাজারে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাকে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোতে পা রাখতে সাহায্য করে।