জুলাই গণহত্যা

দ্রুত বিচারের দাবি বিরোধী দলের, আশ্বস্ত করল সরকার

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৯ এএম

জুলাই গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী জনগুরুত্বপূর্ণ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার সম্পর্কে সাম্প্রতিক আলোচনা’ শীর্ষক বিষয়টি উত্থাপন করেন এনসিপির সদস্য সচিব সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ও রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি জানান বিরোধী দলের সদস্যরা। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের দাবি জানানো হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের সুযোগ পাবেন না। আসার সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। বর্তমানে ৫৯০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং আরও ১২টি মামলার তদন্ত শেষ হয়ে অভিযোগ গঠনের অপেক্ষায় আছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও নির্যাতিত প্রত্যেক মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

আওয়ামী লীগের দলগত বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ দাবিতে বিএনপি শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল। পরবর্তীতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলগত বিচারের আইনি ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে সরকার সংবিধান সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য এখনো পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছে। তিনি তাদের আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান।

জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য মাসিক ভাতাও চালু করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের প্রয়োজনে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে। জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তবে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের স্বার্থে যে যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা আইন অনুযায়ী কার্যকর হবে। সীমান্ত ও পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে তিনি বলেন, সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ছিল ফলাফলের সময়। কিন্তু তার ক্ষেত্র তো সাড়ে ১৬ বছর। এই সময়ে যারা গুম, খুন, পঙ্গু হয়েছেন তাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। জুলাই যোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিচারের ব্যাপারে কোনো গড়িমসি জাতি সহ্য করবে না। বিচার হতেই হবে, তবে সেটা যেন ন্যায়বিচার হয়। মিডিয়াগুলোকে উদ্দেশ করে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন সবাই নয়, তবে বেশিরভাগ মিডিয়া স্বৈরাচারকে ভয়ংকর স্বৈরাচার হতে সাহায্য করেছে। তারা এখন আবার পানি ঘোলা করার জন্য ময়দানে নেমে পড়েছে। সীমান্তে সুড়সুড়ি দেওয়া হয়েছে। সরকার এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের তদন্ত শুরু হয়েছে। জুলাই হত্যাকা-ে জেলায় জেলায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জুলাই চেতনায় বিশ্বাসীদের মধ্যে বিভেদের সুর দেখে দিল্লিতে বসে যারা আত্মসমর্পণের হুংকার দিচ্ছেন, সেই দ-প্রাপ্ত আসামিরা বাংলাদেশে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার হবেন। এটা সরকারের অঙ্গীকার।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দেওয়ার কথা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, নতুন করে কোনো মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া বর্তমান প্রসিউশন এগোতে পারেননি। জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা-নির্যাতনের কথা তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। আওয়ামী লীগ যতই অস্বীকারের চেষ্টা করুক, তারা এটা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবে না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য ও প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, একটি রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিচার নিষ্পত্তির প্রশ্নে ঐকমত্য হতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রশ্নে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির প্রশ্নে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কী হবে এ বিষয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের একটি নীতিগত সমঝোতা রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজন। আলোচনা আরও অংশ নেন জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম ও রোকেয়া বেগম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত