একটা সময় টি-টোয়েন্টিতে দুর্বল দল হিসেবেই পরিচিতি পাওয়া বাংলাদেশের জন্য চলতি বছরটা কাটল অত্যন্ত সফলভাবেই। এ বছর খেলা আটটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির সাতটিতেই জিতেছে বাংলাদেশ, ঘরের মাটিতে সিরিজের সব ম্যাচ জিতেছে বিশ্বকাপজয়ী ইংল্যান্ড আর টি-টোয়েন্টির শীর্ষ র্যাংকিংয়ের তিন বোলারের দল আফগানিস্তানকেও। এ বছর আর কোনো আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি নেই বাংলাদেশের। ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে সাফল্যের সিঁড়িতে পৌঁছে যাওয়ার পেছনে সাকিব প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন পরিবর্তনকে। কোচ, খেলোয়াড়, পরিকল্পনা সবকিছুতেই আনা পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে মাঠের খেলায়, এমনটাই মনে করেন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক।
যে পরিবর্তনের কথা সাকিব বলছেন, তার প্রধান অনুষঙ্গ তিনি নিজেই। মাহমুদউল্লাহর হাত থেকে এশিয়া কাপে ফের অধিনায়কের আসনে সাকিব আল হাসান। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মাত্র দুটি ম্যাচ জেতা বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি পরামর্শক শ্রীধরন শ্রীরামকে দলের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কয়েকজন কর্তাব্যক্তি। কিন্তু বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন চন্দিকা হাথুরুসিংহেকে ফিরিয়ে আনতে। তাতে সমীকরণ থেকে শ্রীরামের মতো মাঝারিমানের কোচের বিদায় ঘটেছে আর হাথুরুসিংহে এসেই তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। বিপিএলের পর সেই আসরে ভালো করা তাওহীদ হৃদয়, শামীম হোসেন পাটোয়ারী, রনি তালুকদারদের দিয়েছেন সুযোগ। তাতেই যেন খুলে গেছে বন্ধ জানালা, সাফল্য এসে ধরা দিয়েছে টানা তিন সিরিজে।
গতকাল রবিবার আফগানিস্তানকে ২-০-তে হারানোর পর, দ্বিতীয় ম্যাচের ম্যাচসেরা আর সিরিজসেরার পুরস্কার নিয়ে সাকিব আসেন সংবাদ সম্মেলনে। টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সংবাদ সম্মেলনও হয়েছে টি-টোয়েন্টির আদলে! ঝটপট সব উত্তর দিয়েছেন, ফসকায়নি নিশানা। দলের বদলে যাওয়া পারফরম্যান্সের নেপথ্য কারণ হিসেবে সাকিব জানান, ‘অবশ্যই অনেক স্বস্তির যদি যে জিনিসগুলো আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সেই জিনিসগুলো কাজে লাগে। যখন দেখি মাঠে পরিকল্পনাগুলো কার্যকর হচ্ছে এবং ফল আসছে তখন এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে।’ পরিবর্তনের পেছনে কিছু নতুন কিছু মানুষেরও অবদান দেখছেন তিনি, ‘তাওহীদ হৃদয়রা কিংবা যারাই আছে, তারা বিশ্বকাপের পর থেকে আছে। বেশিরভাগই বিশ্বকাপ বা এশিয়া কাপ থেকেই আছে। দুই-চারজন আসছে যাচ্ছে, এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। বেস্ট কম্বিনেশনটা খুঁজে পাওয়ার এখনো অনেকটা পথ বাকি। তবে যেভাবে যাচ্ছি তাতে ভালোই হচ্ছে, ভিন্ন ভিন্ন কন্ডিশনে সামনে ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ আসবে। সেসব মাথায় নিয়েই আমাদের কাজ করে যেতে হবে।’
তাসকিন আহমেদ শুরুতেই আফগান টপ অর্ডারকে এলোমেলো করে দিয়েছেন, তবে সাকিবের কাছে তাসকিনের চেয়ে হাসান মাহমুদের বোলিংটাই বেশি কার্যকর মনে হয়েছে, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে হাসান মাহমুদ অনেক ভালো বল করেছে, যদিও আমি আসলে কমবেশি কৃতিত্ব দিতে চাই না। আমরা যে পাঁচ-ছয়জন বোলার আছি, আমাদের কাজটাই হচ্ছে ব্যাটসম্যানদের কাজ সহজ করে দেওয়া। এটাই আমরা সবসময় চেষ্টা করি। এখানে স্পিনার এবং পেসারদের ভালো একটা সমন্বয় হচ্ছে। প্রতিযোগিতাও হচ্ছে, এটা দলের একটা ভালো দিক।’
আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলা আছে এশিয়া কাপে, বিশ্বকাপেরও শুরুটা হবে আফগানিস্তানেরই বিপক্ষে। সাকিব মনে করেন, রশিদ-নবি-মুজিবদের বিপক্ষে পাওয়া এ জয় দুটো আত্মবিশ্বাস বাড়াবে ওয়ানডে ম্যাচেও, ‘বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই তো এখানে, ওয়ানডের খেলোয়াড়রা টি-টোয়েন্টিতে বা টি-টোয়েন্টির খেলোয়াড়রা ওয়ানডেতে। তাই এ আত্মবিশ্বাসটা তারা নিয়েই যেতে পারে। এশিয়া কাপে আমরা তাদের বিপক্ষে খেলব, বিশ্বকাপে আমরা প্রথম ম্যাচে তাদের বিপক্ষে খেলব। এ আত্মবিশ্বাসটা আমরা নিয়ে যেতে পারলে ভালো হবে কারণ বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই এখানকার (টি-টোয়েন্টি দলের)।’
আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজটা জিততে পেরে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে সাকিবের মনে, ‘আফগানিস্তানকে হারাতে পেরে অবশ্যই ভালো লাগছে, কারণ ওদের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে ভালো ফল আমাদের এতদিন ছিল না, আজকের (রবিবার) আগপর্যন্ত। জিততে পারলাম, এরকম কন্ডিশনে বিশেষ করে। এ জয় সামনের দিনে আরও আত্মবিশ্বাস দেবে।’
ব্যাটে-বলে সবদিকেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে অধিনায়ক দলকে জেতালেন সিরিজ, নিজেও পেলেন সেরার পুরস্কার। তাতেই সামনে এলো আরেকটা অনাকাক্সিক্ষত প্রশ্নও। যার নেতৃত্বে দলটা এতটা সাফল্য পাচ্ছে, বিশ্বকাপে তার হাতে নেতৃত্ব না থাকাটাই যে হবে অন্যায়!