মাত্র এক দিন আগে (সোমবার) যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছেলে ইয়াজউদ্দীন আহমদকে দেশটির বন্দুকধারীরা গুলি হত্যা করেছে। সন্তান হারানোর বেদনা কী করে বোঝাবেন তার মা নাসিমা বেগম। স্বজনরা খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে একদানা খাবারও মুখে তোলেননি নাসিমা বেগম। গত মঙ্গলবার রাতে ছেলে খুন হওয়ার খবর শোনার পর থেকে কাঁদতে কাঁদতে দফায় দফায় অচেতন হয়ে যাচ্ছেন। চেতনা ফিরলেই ছেলের ছবি বুকে নিয়ে ফের কাঁদতে শুরু করে দেন। কেউ তাকে থামাতে পারছেন না। গতকাল বুধবার বেলা ৩টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের গণি বেকারি এলাকায় ‘ফেরদৌস টাওয়ার’-এর দশতলার বাসায় গিয়ে শোকাবহ এ দৃশ্য দেখা গেছে।
এর আগে মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইস শহরের কর্মস্থল বিপি গ্যাস স্টেশনে ইয়াজউদ্দীন আহমেদকে গুলি করে হত্যা করে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীরা। তার গ্রামের বাড়ি মিরসরাই উপজেলার ১ নম্বর করেরহাট এলাকায়। তারা দুই ভাই। বাবা প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন। তিনি মিরসরাই কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। মারা যান ২০১৩ সালে।
বাবার মৃত্যুর পর মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় সন্তানের মতো করেই ছোট ভাই ইয়াজকে লালনপালন করেন বড় ভাই বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মানবসম্পদ কর্মকর্তা রিয়াজউদ্দীন আহমেদ। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কর্মস্থল থেকে প্রতিদিন ভিডিও কলে মা এবং আমার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত সে (ইয়াজউদ্দীন)। গত সোমবার বিকেলে মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় তার। আগামী শুক্রবার ফুপাতো ভাই তৌসিফ মোরশেদের বিয়ে। সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসতে না পারলেও ফুপাতো ভাইয়ের বিয়েতে সে কী কন্ট্রিবিউট করবে, সে বিষয়ে মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। এখন তো সব শেষ।’
রিয়াজউদ্দীন বলেন, ‘ছোট ভাই ইয়াজ তখন কিশোর। গণি বেকারি এলাকায় কাজেম আলী হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। বাবার মৃত্যুর পর মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় ইয়াজকে দত্তক নেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী খালা রেহেনা বেগম। ২০১৬ সালে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান খালা। তখন থেকে ছোট ভাই সেখানে পড়াশোনা করছিল। মৃত্যুর আগপর্যন্ত চাকরির পাশাপাশি সেন্ট লুইস শহরের কমিউনিটি কলেজে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা করছিল। পাঁচ বছর আগে সেন্ট লুইস শহরের বিপি গ্যাস স্টেশনে চাকরি নেয়। চাকরির পাশাপাশি সেখানে গাড়ির ব্যবসাও করত। শখ ছিল নতুন নতুন ব্র্যান্ডের গাড়ি চালানো।’
ভগ্নিপতি (খালাতো বোনের জামাই) কাজী নুর উদ্দীন বলেন, ‘২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর থেকে আর দেশ আসেনি ইয়াজ। তার মায়ের স্বপ্ন ছিল কয়েক মাস পর দেশে এলে ধুমধাম করে ছেলের বিয়ের আয়োজন করবেন। ইয়াজের পরিকল্পনা ছিল বড় ভাই ও মাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ারও। এজন্য মা ও ভাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজ প্রায় চূড়ান্তও করে ফেলেছিল। এখন আমাদের সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল।’
সেন্ট লুইসে বসবাসরত খালা রেহেনা বেগমের বরাত দিয়ে বড় ভাই রিয়াজউদ্দীন জানান, গতকাল তার ভাইয়ের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছে দেশটির কর্র্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীদের বিরুদ্ধে মামলা করবে। সেখানকার সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ইয়াজের মরদেহ দেশে আনার চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ গণমাধ্যমকে বলেছে, স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার সকালের দিকে মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইস শহরের হ্যাম্পটন এভের ১১০০ ব্লকের একটি গ্যাস স্টেশনে কাজ করছিলেন ইয়াজউদ্দীন আহমেদ। এ সময় বাইরে দাঁড় করানো তার গাড়ির কাচ ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে একদল সন্ত্রাসী। বাধা দিলে এক বন্দুকধারী ইয়াজকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পরে পুলিশ এসে তাকে হাসপাতলে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে জ্যাটাভিয়ন স্কট নামে ১৯ বছরের এক তরুণকে খুঁজছে পুলিশ।