এবারের কোরবানির ঈদে রাজধানীর দিয়াবাড়ি অস্থায়ী পশুর হাটের চরম অব্যবস্থাপনায় একদিকে নাগরিকরা ভোগান্তির শিকার হয়েছে, অন্যদিকে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ হয়েছে। বিশেষ করে মেট্রো স্টেশনের নিচে হাট বসানো এবং এক সপ্তাহ পরও হাটের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার না করায় ওই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
হাটের অব্যবস্থাপনার কারণে ওই এলাকার গাছপালাসহ রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে সমালোচনা সহ্য করতে হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে (ডিএনসিসি)। এমনকি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে গিয়েও এই হাট নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে প্রশাসককে। এক সপ্তাহে মেট্রো স্টেশনের ময়লা পরিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করছে ডিএনসিসি। তবে ইজারাদার এখনো বাঁশ খুলে নেয়নি। হাটের বিভিন্ন জায়গায় এখনো ময়লা স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
ঈদের আগে প্রশাসক হাট পরিদর্শনে গিয়ে ইজারাদারকে জরিমানা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং মেট্রোরেলের নিচে হাট বসানোর সমালোচনাকে এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) দিয়ে বানানো বলে প্রচার করা হয়েছে।
এ নিয়ে গত বুধবার তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে দিয়াবাড়ি এলাকায় পশুর হাট পরিচালনায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সূত্র বলছে, নানা অনিয়ম ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়ার পরও ইজারাদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ডিএনসিসি। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন তোলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে গতকাল এই কমিটি গঠন করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএনসিসি এ বছর ১৬টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা দিয়েছিল। এর মধ্যে উত্তরা দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন বউ-বাজার এলাকার খালি জায়গা ও মেট্রো রেলের পাশে ১৮ নম্বর সেক্টরের সি-ব্লকের খালি মাঠ পর্যন্ত জায়গায় ঈদের দিনসহ পাঁচ দিন হাট বসানোর অনুমতি দেওয়হয়। হাটটি ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা নেন এসএফ করপোরেশনের মালিক শেখ ফরিদ হোসেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। ইজারার একটি শর্ত ছিল ঈদের পরদিন শুক্রবার দুপুর ১২টার পর হাটে বাঁশের খুঁটি বা অস্থায়ী অবকাঠামো থাকলে ডিএনসিসি নিজ তত্ত্বাবধানে অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এ কার্যক্রম পরিচালনায় যাবতীয় খরচ ইজারাদারের জামানত বাবদ রক্ষিত অর্থ থেকে সমন্বয় করা হবে।
কিন্তু কোনো শর্তই মানেননি হাটের ইজারাদার। নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঈদের অন্তত ১৫ দিন আগে হাট বসানো হয়। হাটের বাইরে সড়কে ওঠানো হয় গরু। এমনকি মেট্রোরেলের নিচের সড়ক ও স্টেশনের সামনে গরু বেঁধে রাখতে দেখা যায়। গরুর বর্জ্য যাত্রীদের পায়ে লেগে মেট্রো স্টেশনের ভেতর পর্যন্ত চলে যায়। স্টেশনের নিচে থাকা খালি জায়গার অনেক ঘাসও নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া হাটে আসা ব্যবসায়ী ও খামারিদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের আগে হাটের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি কোরবানির পশু চলে আসায় আশপাশের এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। মেট্রোরেলের নিচ দিয়েও মানুষ চলাচল করতে পারছিল না। পরে হাটে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হাট পরিদর্শন করেন ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ইজারাদারকে বড় জরিমানা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু তার নির্দেশনার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সিটি করপোরেশন। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে মেট্রোরেলের নিচ থেকে গরু সরানো হয়।
এদিকে, ঈদ শেষ হলেও শেষ হয়নি ওই এলাকার বাসিন্দাদের ভোগান্তি। দেখা গেছে, হাটে বাঁশের খুঁটি বা অস্থায়ী অবকাঠামো এখনো পড়ে আছে। জমে আছে বৃষ্টির পানি, স্তূপ হয়ে পড়ে আছে পশুর বর্জ্য। আশপাশের সড়কগুলোতে দুর্গন্ধে নাক চেপে হাঁটতে হচ্ছে পথচারীদের।
উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আশরাফুল আলম মেট্রোরেলে নিয়মিত যাতায়াত করেন। আলাপকালে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের এক সপ্তাহ পরও মেট্রোরেলের নিচের পরিবেশ স্বাভাবিক হয়নি। বিশেষ করে উত্তরা উত্তর এবং উত্তরা সেন্টার স্টেশনের আশপাশে এখনো গন্ধ আছে। পুরো এলাকার বাসিন্দারা দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ।’
খালপাড় এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া আক্তার বলেন, ঈদের পর মানুষ দিয়াবাড়িতে দলে দলে ঘুরতে আসত। কিন্তু এবার দুর্গন্ধে মানুষ এই এলাকার আশপাশে যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা সিটি করপোরেশন বা ইজারাদার বুঝি না। এই এলাকার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ প্রয়োজন।’
ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আরিফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা মেট্রোরেলের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ঈদের পর থেকে টানা কাজ করছে। হাটের ইজারাদার বাঁশের খুঁটি খোলার কাজ শুরু করেছেন। এটি শেষ হলে আমরা হাটও পরিষ্কার করে দেব। পুরো এলাকায় সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আমাদের কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করছে।’
ইজারাদার মো. শেখ ফরিদ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়েও এ প্রসঙ্গে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত মঙ্গলবার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, কোরবানির পশুর হাটের কারণে উত্তরায় মেট্রো রেল এলাকার গাছপালার যে আংশিক ক্ষতি হয়েছিল, নতুন গাছ লাগিয়ে আরও অনেক সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে সবুজায়ন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ও ডিএনসিসিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এআই ছবি দিয়ে উত্তরার মেট্রো রেল নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।’
