বাংলাদেশ এনার্জী রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে এবার পেট্রোবাংলা ও অধীন গ্যাস উত্তোলন, সঞ্চালন এবং বিতরণ কোম্পানির বিতরণ মার্জিন বৃদ্ধি করেছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (২০ জুলাই) বিকেলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করে। যা চলতি মাস থেকেই কার্যকর হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ব এসব কোম্পানি মুনাফায় থাকার পরও কোনোরকম বিচার-বিবেচনা না করেই নির্বাহী আদেশে এই চার্জ বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক ও অন্যায় আখ্যা দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এতে করে মুনাফায় থাকা কোম্পানিগুলোর কর্মীদের আরও বেশি বাড়তি ইনসেনটিভ (বোনাস) নেয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হলো। দিন শেষে এর দায় পড়বে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। যদিও জ্বালানি বিভাগের দাবি- নতুন এই চার্জ নির্ধারণের ফলে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দামের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না।
এর আগে কোন ধরনের গণশুনানী ছাড়াই নির্বাহী আদেশে সরকার চলতি বছর পাঁচ দফায় গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আদেশে, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির সঞ্চালন চার্জ প্রতি ঘনমিটার ৪৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১.০২ টাকা করা হয়েছে। ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মধ্যে তিতাস গ্যাসের ঘনমিটার বিতরণ চার্জ ১৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ পয়সা, বাখরাবাদে ১৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ পয়সা, কর্ণফুলী ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৭ পয়সা, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৬ পয়সা, সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে ১৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৪ পয়সা এবং জালালাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে ১১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৮ পয়সা করা হয়েছে।
একইভাবে মার্জিন বাড়িয়ে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি (বিজিএফসিএল) এবং সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির নতুন মার্জিন প্রতি ঘনমিটারে এক টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এর মার্জিন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ টাকা। জানতে চাইলে বিইআরসির সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিজেদের ব্যর্থতার দায় জনগণের কাঁধে চাপাতেই এগুলো করা হচ্ছে। কমিশনকে বাদ দিয়ে কোনো ধরনের কারণ, যুক্তি ছাড়াই এভাবে মার্জিন বাড়ানো তুঘলকি কাণ্ড। এতে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা আরও বৃদ্ধির পথ সুগম হলো।
তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো প্রতি বছর মুনাফা করছে। তাদের কর্মীরা প্রফিট বোনাস নিচ্ছে। এরপরও কেন তাদের মার্জিন বাড়াতে হবে? এতে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ লাভবান হবে। আর সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হবেন।
গ্যাসের দামের বিষয়ে সর্বশেষ গণশুনানি হয় গত বছরের মার্চে। কোম্পানিগুলো গ্যাসের দামের পাশাপাশি বিতরণ চার্জ বাড়িয়ে দেওয়ার আবেদন করেছিল। ওই শুনানিতে বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে সবগুলো কোম্পানিই মুনাফায় রয়েছে।
শুনানিতে দেখা যায়, কোম্পানিগুলো পরিচালন বহির্ভূত আয় এতে বেশি, তাদের বিতরণ চার্জ আদায় না করলেও মুনাফায় থাকে। অর্থাৎ হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক আমানত, নানা রকম মাশুল দিয়েই মুনাফায় থাকে কোম্পানি।
এ কারণে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিতরণ কোম্পানির কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কিছুটা মাশুল দেওয়ার মতামত দেয় কারিগরি কমিটি। কর্ণফুলীর তখনকার দর ঘনমিটার প্রতি ২৫ পয়সা থেকে কমিয়ে ৯ পয়সা করার সুপারিশ দেওয়া হয়। হিসেব নিকেশ করে অন্যান্য বিতরণ কোম্পানির বিতরণ চার্জ বিলুপ্ত করার সুপারিশ আসে। একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি জিটিসিএল বর্তমান চার্জ ৪২ পয়সা থেকে ৬ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ দেওয়া হয়। পরে জুন মাসে দেওয়া আদেশে ৫ পয়সা বাড়িয়ে ৪৭ পয়সা করা হয়।
২০২২ সালে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে তিতাস গ্যাস প্রতি ঘন মিটারের বিতরণ চার্জ ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬৮ পয়সা করার আবেদন করেছিল। বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, তিতাস বিতরণ চার্জ ছাড়াই মুনাফায় থাকবে। শেষ পর্যন্ত ১৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।
গ্যাসের বিতরণ কোম্পানিগুলো অনেক বছর ধরেই মুনাফা করে চলছে। তাদের মুনাফার কিছুটা নজীর পাওয়া যায় প্রফিট বোনাস প্রদানের হার থেকে। ২০২১-২২ অর্থ বছরে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড তার ৩৮৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যেকটে ১৮ লাখ টাকা করে প্রফিট বোনাস দিয়েছে। অতীতে জিটিসিএল, তিতাস গ্যাস, পিজিসিবি ও অন্যান্য কোম্পানিতে এই প্রফিট বোনাস প্রদানের প্রতিযোগিতা ছিল। অনেক সময় হিসেবে গোজামিল দিয়েও প্রফিট বোনাস দেওয়ার নজীর রয়েছে। কোম্পানিগুলোর প্রফিট বোনাসে কিছুটা লাগাম টানার চেষ্টা করছিলো বিইআরসি।